সৈয়দ হাসমত জালাল
ভারত যখন বিশ্বমঞ্চে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই–এর সম্ভাবনা, নৈতিক ব্যবহার ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে সক্রিয় আলোচনায় অংশ নিচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের ভেতরে এআই-নির্মিত রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও সরিয়ে দেওয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল কংগ্রেসের অভিযোগ, তাদের তৈরি একাধিক এআই-ভিত্তিক ব্যঙ্গ ভিডিও সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম থেকে মুছে ফেলা হয়েছে এবং তা নাকি সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিছক দলীয় বাকবিতণ্ডা নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের প্রয়োগ এবং গণতান্ত্রিক সহনশীলতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
Advertisement
কংগ্রেসের সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেত্রী সুপ্রিয়া শ্রীনেতের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ছয় সপ্তাহে ইউটিউব, মেটা (ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম) এবং এক্স প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্তত নয়টি ভিডিও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ভিডিওতেই স্পষ্টভাবে জানানো ছিল যে সেগুলি ‘AI-generated’— অর্থাৎ দর্শকদের বিভ্রান্ত করার কোনও প্রচেষ্টা ছিল না। বিষয়বস্তু ছিল সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, সীমান্ত পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি কিংবা শিল্পপতিদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়ে ব্যঙ্গ ও রাজনৈতিক সমালোচনা। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এখনও বিশদ ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসেনি, অভিযোগ উঠেছে যে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯এ এবং ৭৯(৩)(বি) ধারার উল্লেখ করে, এমনকি মানহানি ও উসকানির আশঙ্কা দেখিয়ে এই কনটেন্ট সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
Advertisement
এই প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্নটি হল— আইন কি রাজনৈতিক ব্যঙ্গ বা সমালোচনাকে স্তব্ধ করার উপায় হয়ে উঠতে পারে? তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯এ ধারা সরকারকে বিশেষ পরিস্থিতিতে অনলাইন কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা দেয়, যদি তা দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যেসব ভিডিওতে স্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে যে সেগুলি এআই-নির্মিত এবং যা মূলত রাজনৈতিক ব্যঙ্গ— সেগুলিকে কি একই মানদণ্ডে বিচার করা যায়? গণতন্ত্রে শাসক ও সরকারের সমালোচনা অপরাধ নয়; বরং তা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারেরই
ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর কেবল প্রযুক্তির আলোচ্য বিষয় নয়; এটি রাজনীতি, সংস্কৃতি, সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক জীবনের গভীরে প্রবেশ করেছে। বিশেষত রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, যা বহুদিন ধরেই গণতন্ত্রের একটি প্রাণবন্ত উপাদান— এখন নতুন প্রযুক্তির সহায়তায় নতুন রূপ পাচ্ছে। ফলে প্রশ্নও নতুনভাবে সামনে আসছে: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ব্যঙ্গ কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ, নাকি তা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র?
এই বিতর্ককে বোঝার জন্য প্রথমে ব্যঙ্গের ঐতিহাসিক ভূমিকা মনে করা দরকার। ক্ষমতার সমালোচনা, অতিরঞ্জন, রূপক ও কৌতুকের মাধ্যমে শাসক বা নীতির সমালোচনা— এসবই ব্যঙ্গের কাজ। প্রাচীন গ্রিস থেকে আধুনিক সংবাদপত্রের কার্টুন— সব ক্ষেত্রেই ব্যঙ্গ ক্ষমতার প্রতি এক ধরনের নৈতিক নজরদারি। গণতন্ত্রে বিরোধিতা ও সমালোচনা স্বাভাবিক; ব্যঙ্গ সেই সমালোচনাকে জনগ্রাহ্য ও স্মরণীয় করে তোলে।
কিন্তু প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যঙ্গের রূপ বদলেছে। আজ এআই (AI) ব্যবহার করে তৈরি করা যায় এমন ভিডিও বা চিত্র, যা বাস্তবের মতোই দেখায়। এখানে মূল সমস্যাটি প্রযুক্তির ক্ষমতা নয়, বরং তার সম্ভাব্য অপব্যবহার। ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার, কারও ভাবমূর্তি নষ্ট করা বা জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা— এসব বাস্তব ও গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। তাই রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব রয়েছে নাগরিকদের বিভ্রান্তি ও প্রতারণা থেকে রক্ষা করা।
কিন্তু এখানেই সূক্ষ্ম সীমারেখা। সব এআই-নির্মিত কনটেন্ট কি বিভ্রান্তিকর? যদি কোনও ভিডিও বা চিত্র স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে তা কৃত্রিমভাবে নির্মিত এবং ব্যঙ্গাত্মক উদ্দেশ্যে তৈরি, তাহলে তাকে ডিপফেকের সঙ্গে এক সারিতে ফেলা যায় কি? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে কৌতুক, ব্যঙ্গ বা সমালোচনা অপরাধ নয়। বরং এটি জনপরিসরের প্রাণশক্তির লক্ষণ।
ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অবশ্যই ১৯(২) অনুচ্ছেদে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে— রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা মানহানির প্রশ্নে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা হতে হবে যুক্তিসঙ্গত ও অনুপাতগত। গণতন্ত্রে আইন কখনও এমনভাবে প্রয়োগ করা যায় না যাতে তা সমালোচনাকে দমন করার অস্ত্র হয়ে ওঠে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, তা হলো স্বচ্ছতা। যদি কোনও কনটেন্ট অপসারণ করা হয়, তবে তার কারণ, প্রক্রিয়া এবং আপিলের সুযোগ সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য থাকা জরুরি। নইলে নাগরিকদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়। প্রযুক্তি-নিয়ন্ত্রণের নামে যদি অস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে তা মতপ্রকাশের ক্ষেত্রকে সংকুচিত করতে পারে।
গণতন্ত্রের শক্তি কেবল নির্বাচন নয়; বরং একটি মুক্ত ও প্রাণবন্ত জনপরিসর। সেখানে সরকার, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ— সবাই মতপ্রকাশের অধিকার ভোগ করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। ছোট দল, স্বতন্ত্র কর্মী বা তরুণ সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীরা এখন স্বল্প খরচে সৃজনশীল কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন। এই প্রযুক্তিগত গণতন্ত্রীকরণ ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভাঙতে সাহায্য করে।
তবে এর বিপদও কম নয়। ভুয়ো খবর দ্রুত ছড়ায়, আবেগ উস্কে দেওয়া সহজ হয়, এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হতে পারে। ফলে একদিকে যেমন নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, অন্যদিকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই ভারসাম্য রক্ষাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও একই বিতর্ক চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এআই ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো গড়ে তুলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা জোরদার। প্রতিটি গণতান্ত্রিক সমাজই চেষ্টা করছে প্রযুক্তির ঝুঁকি কমিয়ে তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে। ভারতের ক্ষেত্রেও একটি সুস্পষ্ট, ন্যায়সঙ্গত ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ নীতি প্রয়োজন।
বিশেষত রাজনৈতিক ব্যঙ্গের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উচিত সহনশীলতা প্রদর্শন করা। কারণ ব্যঙ্গ দমন করলে তা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়; কিন্তু সহ্য করলে জনপরিসরে যুক্তির লড়াই সম্ভব হয়। সমালোচনার জবাব সেন্সর নয়, পাল্টা যুক্তি ও তথ্য। গণতান্ত্রিক আত্মবিশ্বাসের পরিচয় এখানেই।
আরও একটি দিক ভুললে চলবে না, তা প্রযুক্তি সম্পর্কে নাগরিকদের শিক্ষিত করা। মানুষ যদি জানেন কীভাবে এআই কনটেন্ট তৈরি হয়, কীভাবে ডিপফেক চেনা যায়, তবে বিভ্রান্তির ঝুঁকি কমে। শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; প্রয়োজন সচেতনতা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা।
শেষ পর্যন্ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে কোনও নৈতিক সত্তা নয়। এটি একটি হাতিয়ার, যার ব্যবহার নির্ভর করে মানুষের ওপর। গণতন্ত্রও ঠিক তেমনই— এটি কেবল একটি কাঠামো নয়, একটি সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতির মূল উপাদান সহনশীলতা, স্বচ্ছতা এবং যুক্তিবাদ।
প্রযুক্তির যুগে গণতন্ত্রের পরীক্ষা আরও কঠিন। কারণ তথ্যের গতি দ্রুত, এর প্রভাবও দূরবিস্তৃত। তবু মূল প্রশ্ন একই থাকে– রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের সমালোচনার অধিকারকে সম্মান করবে? নাকি নিরাপত্তার যুক্তিতে নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দেবে?
একটি পরিণত গণতন্ত্র জানে, সমালোচনা তাকে দুর্বল করে না; বরং শক্তিশালী করে। ব্যঙ্গ কখনও অস্বস্তিকর হতে পারে, কখনও অতিরঞ্জিতও। কিন্তু সেটিকে স্থান দেওয়ার মধ্যেই গণতান্ত্রিক আত্মবিশ্বাসের পরিচয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই ব্যঙ্গকে নতুন রূপ দিয়েছে— এখন প্রয়োজন সেই নতুন রূপকে বোঝা, যুক্তিসঙ্গত নিয়মে বেঁধে রাখা এবং সর্বোপরি মতপ্রকাশের মৌলিক স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত রাখা।
কারণ প্রযুক্তি বদলায়, প্ল্যাটফর্ম বদলায়, কিন্তু গণতন্ত্রের আসল ভিত্তি— স্বাধীন চিন্তা ও প্রকাশের অধিকার— অপরিবর্তিত থাকে। সেই ভিত্তি অটুট থাকলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও গণতন্ত্র তার সহনশীলতা ও শক্তি বজায় রাখতে পারবে।
Advertisement



