কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কেন্দ্রের মোদী সরকার যখন ভারতের সাফল্যের ঢাক পেটাতে ব্যস্ত, তখন রাজধানী দিল্লিতে ট্রাফিক ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা নিয়ে হাঁটে হাঁড়ি ভাঙলেন প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনক। মশকরার সুরে তিনি বলেন, ‘দিল্লির ট্রাফিক শুধরোতে পারল না এআই’। এআই সম্মেলনে দেরিতে পৌঁছনোর পর এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তিনি। কার্যত তাঁর এই মশকরার মাধ্যমে দিল্লির সরকারের যোগাযোগ ব্যবস্থার হাঁড়ির হাল প্রকাশ্যে এলো। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ‘ট্রিপল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
প্রসঙ্গত, সোমবার থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়েছে দিল্লির ভারত মণ্ডপমে। কিন্তু সম্মেলনের প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুষ্ঠান থাকায় অতিথিদের চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। সম্মেলনে ঢোকার জন্য তাঁদের প্রায় দু’-তিন ঘণ্টা রাস্তায় অপেক্ষা করতে হয়। বৃহস্পতিবার বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজের আয়োজন করা হয় ভারত মণ্ডপমে। আর সেই কাজের জন্য দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ভারত মণ্ডপমের কাছে মেট্রো স্টেশনও বন্ধ করে দেওয়া হয়। যার জেরে নাকাল হতে হয় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আমন্ত্রিত ভিভিআইপি রাষ্ট্রনেতারদেরও। এমনকি সভাস্থলের কাছে যাওয়ার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়নি ট্যাক্সি বা অন্য গাড়ি। ফলে বুধবার রাত থেকে দিল্লিতে শুরু হয় চরম অচলাবস্থা। বহু মানুষ দু’তিন ঘণ্টা গাড়িতে আটকে ছিলেন। অনেকে অসুস্থও হয়ে পড়েন। বিদেশি অতিথি, তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে দেশের উদ্যোগপতিদের সম্মেলন থেকে বেরিয়ে রাস্তায় তিন-চার কিলোমিটার হাঁটতে হয়। এভাবে দিল্লি জুড়ে ব্যাপক যানজটের জেরে স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়।
Advertisement
জানা গিয়েছে, যানজটের জেরে রাজধানী দিল্লির সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় থমকে গিয়েছিল বৃহস্পতিবার। ফলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এবং আইনজীবীরা সঠিক সময়ে আদালতে পৌঁছতে পারেননি। এমনকি খোদ প্রধান বিচারপতির এজলাশেই প্রায় ৩০ মিনিট বিলম্বে শুনানি শুরু হয়। একই সমস্যার সম্মুখীন হন ইনফোসিস প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণমূর্তির জামাই তথা প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। তিনি সম্মেলনে পৌঁছেই রসিকতার সঙ্গে সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এআই অনেক কিছুই পারে। কিন্তু দিল্লির ট্রাফিককে শুধরোতে পারে না।’
Advertisement
তবে শুধুমাত্র প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনকই নন। রাজধানীর এই বেহাল ট্রাফিক ব্যবস্থার জেরে নিজের লজ্জাজনক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন একটি মার্কিন সংস্থার সিইও সারা হুকার। তিনিও প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজের আমন্ত্রিত অতিথি। অথচ নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারেননি। ‘অ্যাডাপশন ল্যাবস’-এর এই সিইও বিমানবন্দর থেকে গন্তব্যে পৌঁছনোর পথে যানজটের জেরে প্রায় চার ঘন্টা রাজধানীর রাস্তায় আটকে পড়েন। তিনি যখন পৌঁছন, তখন নৈশভোজ সমাপ্ত হয়ে গিয়েছে। অগত্যা তাঁকে হোটেলে পৌঁছে খাবারের অর্ডার দিতে হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই লজ্জায় মাথানত হয়ে যাচ্ছে দেশবাসীর।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সময়ে এই বিতর্কিত বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে উঠেছে। সরব হয়েছে দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস, তৃণমূল থেকে শুরু করে আম আদমি পার্টির মতো প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি। কারণ কেন্দ্র, রাজ্য, পুরসভা, সর্বত্র বিজেপি। আবার কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দিল্লি পুলিশ। তা সত্ত্বেও কেন রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে রাজনৈতিক মহলে।
রাজনৈতিক দলগুলির প্রশ্ন, দিল্লিতে এখন ‘ট্রিপল ইঞ্জিন’ সরকার চলছে। কেন্দ্র, রাজ্য, পুরসভা, সর্বত্র বিজেপি। দিল্লির পুলিশ অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন। তারপরেও এই অব্যবস্থা কেন? বিষয়টি নিয়ে কটাক্ষ করেছেন কংগ্রেসের মুখপাত্র পবন খেরা। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জমানায় সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠানকে কোলাকুলি করা, ছবি তোলার উৎসবে পরিণত করে ফেলা হয়। এআই সম্মেলন উদ্ভাবন নিয়ে চিন্তাভাবনার আদানপ্রদানের মঞ্চ হয়ে উঠতে পারত। তার বদলে রোবট-কুকুর বা ড্রোনের মতো সস্তার চিনা পণ্যের বাজার হয়ে গেল।’
Advertisement



