প্রায় একশোটি হো উপজাতি পরিবারের বসবাস পাঁশকুড়ার হাউর পঞ্চায়েতের আমদান এলাকায়, যাদের অধিকাংশই দিনমজুর। কোভিড পর্বে আর্থিক সঙ্কটের ফলে এই উপজাতির বহু ছেলে-মেয়ে স্কুলছুট হয়ে যায়। সেই পরিস্থিতিতে স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষানুরাগী মানুষ উদ্যোগ নিয়ে হো ভাষার নিজস্ব লিপি ‘বারাং চিতি’ শেখানোর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলেন। বর্তমানে এলাকায় এমন দু’টি কেন্দ্র চলছে, যেখানে বিনামূল্যে মাতৃভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়। ভাষার প্রতি আগ্রহ থেকেই অনেক পড়ুয়া আবার স্কুলে ফিরেছে। উল্লেখ্য, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা থেকে বহু বছর আগে জীবিকার সন্ধানে আসা হো সম্প্রদায়ের মানুষজনই এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
লকডাউনের সময় স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু পড়ুয়ার শিক্ষাজীবন থমকে যায়। আর্থিক অনটন ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কিছু নাবালিকার বিয়েও হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে কুমরপুর হটেশ্বর হাইস্কুলের শিক্ষক রূপেশকুমার সামন্ত উদ্যোগ নিয়ে স্কুলছুটদের ফেরানোর পরিকল্পনা করেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন শিক্ষক গুরুপদ পূর্তি এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী গুরুদাস সিরকা। তাঁরা মনে করেন, হো উপজাতির পড়ুয়াদের মাতৃভাষাকেই যদি শিক্ষার ভিত্তি করা যায়, তবে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। সেই ভাবনা থেকেই স্থানীয় শিক্ষক কার্তিক বার্জ এগিয়ে এসে বারাং চিতি লিপির প্রশিক্ষণ শুরু করেন একটি ক্লাবে। বিনামূল্যে চলতে থাকে এই উদ্যোগ। অল্প সময়ের মধ্যেই তার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। মাতৃভাষার টানে বহু পড়ুয়া আবার স্কুলে ভর্তি হয় এবং নিয়মিত ক্লাস করতে শুরু করে। সেই সঙ্গে নাবালিকা বিয়ের
ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এলাকায়।
Advertisement
প্রায় দু’বছর আগে হাউরের কালিদান এলাকায় স্থানীয় শিক্ষক বীরেন টুবিডের উদ্যোগে হো ভাষার আর একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু হয়। মাতৃভাষায় শেখার সুযোগ পেয়ে সেখানেও হো সম্প্রদায়ের পড়ুয়াদের ভিড় বাড়তে থাকে। বীরেন জানান, তিনি ২০১০ সালে ঝাড়খণ্ডে গিয়ে বারাং চিতি লিপির প্রশিক্ষণ নেন। পরে ২০২১ সালে নিজের এলাকায় সেই জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তাঁর দাবি, মাতৃভাষার মাধ্যমে পড়াশোনার আগ্রহ তৈরি হওয়ায় বহু স্কুলছুট শিশু আবার শিক্ষার মূলস্রোতে ফিরেছে। ভাষা আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে বলেও তিনি মনে করেন। যদিও ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডে বারাং চিতি সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে এখনও তা হয়নি। শিক্ষক রূপেশকুমার সামন্তের মতে, মাতৃভাষায় শিক্ষা সহজবোধ্য, সরকারি স্বীকৃতি মিললে হো ভাষার চর্চা ও প্রসার আরও বাড়বে।
Advertisement
Advertisement



