প্রবীর সরকার
বাঙালির ইওরোপ ভ্রমণ সুইডেন পর্যন্ত গড়ায় কমই। টেমস নদীর তীরে খানিক হাঁটাহাঁটি, আইফেল টাওয়ারে দোল খাওয়া আর ভ্যাটিকান সিটি হলেই মনে হয় যেন অনেক হয়েছে। আর যদি সুইস আল্পসের ছোঁয়া মেলে তো পায় কে! এমনকি যে রবীন্দ্রনাথ
Advertisement
১৯১৩-তে নোবেল পেলেন, সে পুরস্কার আনতে তিনিও সুইডেনে গেলেন না। পুরস্কার এল কলকাতায়। সেই সুইডেনে যাওয়া হলো অবশেষে। কলকাতা-দিল্লি-জুরিখ, মাঝে হেলসিংকি ছুঁয়ে গোথেনবার্গ। সুইডেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, পুত্র ও পুত্রবধূর কর্মস্থল। সুইডেনেনের মতো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশে সন্ধ্যা নামে দেরিতে, ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে দশটাতেও আকাশে আলোর রেখা। সুইডেনে দেখার জায়গার শেষ নেই। কিন্তু সত্যি বলতে কি, এদেশে আসার আগে ‘ভাসা’ মিউজিয়ামের কথা জানতাম না। কথা ছিল স্টকহোমে যাব নোবেল মিউজিয়াম দেখতে কিন্তু একটা জাহাজকে নিয়ে গোটা একটা সংগ্রহশালা! বিস্ময় জাগায় বৈকি। গোথেনবার্গ থেকে স্টকহোম প্রায় ৬০০ কিলোমিটার। দ্রুতগামী ট্রেনে সাড়ে তিন ঘণ্টার দৌড়। এখানে ট্রাম চলে মেট্রো রেলের গতিতে। বাস, ট্রেন, ট্রাম, সবেতেই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। ট্রেনের প্রতি কামরার দু’দিকে ডিসপ্লে বোর্ডে পরবর্তী গন্তব্য, সময় ইত্যাদি ভেসে উঠছে সুইডিস ভাষায়। দুই দিকে স্বচ্ছ কাঁচের বড় বড় জানালা। বসার ব্যবস্থা বিমানের চেয়েও উন্নত। বাইরে সবুজ বন, দূরে অনুচ্চ পাহাড়, মাঝে মাঝে চাষের খেত, বুনো ফুল। সুরম্য লেক, কখনও রাজপথে দ্রুতগামী গাড়ি। লোকালয় প্রায় দেখা যায় না। অনেক দূরে দূরে পল্লীর ইশারা, রম্য গৃহশৈলী। ‘ভাসা’ মিউজিয়ামের চারতলা সমান উঁচু এবং ছোট স্টেডিয়ামের মতো অতিকায় ঘরের মধ্যে ৪০০ বছরের পুরানো জাহাজের সামনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল টাইটানিকের কথা। উত্তর আটলাণ্টিকের ৩৮০০ মিটার গভীরে নিথর টাইটানিক আজও নানা আবেগে গোটা দুনিয়াকে টানে, সেই ১৯১২ সাল থেকে। সে কেবল জেমস ক্যামেরনের সিনেমার জন্য নয়, তার অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথের লেখাতেও এসেছে টাইটানিকের প্রসঙ্গ। অথচ ৩৩৩ বছর বাল্টিক সাগরের শিয়রে সল্টসিয়ন উপসাগরের হিমশীতল ঘুমন্তপুরীতে কাটিয়ে উঠে আসা ‘ভাসা’ জাহাজের খবর আজকের সর্বগ্রাসী সমাজমাধ্যমের কাছেও তা অনেক দূরের! টাইটানিকের মতো এখানেও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, এখানেও প্রথম যাত্রাই শেষ যাত্রা! তবু টাইটানিক যা পারে নি, সেটা পেরেছে ‘ভাসা’, শেষ পর্যন্ত সে উঠে এসেছিল সমুদ্রগর্ভ থেকে।
Advertisement
স্টকহোমের নোবেল মিউজিয়াম থেকে পায়ে চলা দূরত্বে ‘ভাসা’ মিউজিয়াম। জায়গাটা পুরানো স্টকহোমের অংশ, স্থানীয় নাম ‘গামলা স্টান’। অতিকায় ভাসা মিউজিয়ামের একমাত্র দ্রষ্টব্য হলো গুস্তাভ সাম্রাজ্যের অহংকার আর বেদনার সাক্ষী ‘ভাসা’ নামক যুদ্ধ জাহাজ। সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যাণ্ড, ডেনমার্ক ও আইসল্যাণ্ড-এই পাঁচটিকে বলে নর্ডিক দেশ। এছাড়া ফ্যারো এবং অ্যালাণ্ড দ্বীপপুঞ্জকেও ঠাঁই দেওয়া হয় তালিকায়। বস্তুত সুইডেনই বৃহত্তম Nordic দেশ, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশের তালিকাতেও তার স্থান আছে। তাই আশেপাশের দেশে আপন শক্তি প্রদর্শন করা এবং সুযোগ পেলে রাজ্য বিস্তার করার চেষ্টা করেছে অনেকদিন আগে থেকে। ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ায় গুস্তাভ ভাসা ছিলেন সুইডেনের রাজা। আধুনিক সুইডিশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় তাঁকে। তাঁর সময় থেকেই শুরু হয়েছিল উত্তর ইউরোপে সুইডেনের আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াস। তাঁর প্রপৌত্র গুস্তাভ অ্যাডলফ, জাহাজের কাহিনি তাঁকে নিয়েই। ১৬২৬ সালে গুস্তাভ অ্যাডলফের রাজকীয় নির্দেশে সুইডেনে শুরু হয় এক শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের কাজ। প্রায় ৪০০ শ্রমিক ও প্রযুক্তিবিদের ২ বছরের চেষ্টায় তৈরি হলো সেকালের সবচেয়ে বড় এবং সর্বাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ। রাজবংশের নামে তার নাম দেওয়া হলো ‘ভাসা’। দৈর্ঘ্য ৬৯ মিটার, প্রস্থ ১১.৮ মিটার এবং উচ্চতা ৫২ মিটার। তখন পালতোলা জাহাজের যুগ, অনেকগুলি পাল ছিল জাহাজে।
স্টকহোমে সেডারস্ট্রোম নদীর তীরে নৌবাহিনীর শিপইয়ার্ড ‘Skeppsgarden’-এ তৈরি হয়েছিল ‘ভাসা’। ১০ আগস্ট ১৬২৮, Vasa তার প্রথম যাত্রা শুরু করে স্টকহোম বন্দর থেকে। গন্তব্য বাল্টিক সাগর। কিন্তু যাত্রার শুরুতেই বিপর্যয়, জলে নামার পরে মাত্র ১৩০০ মিটার যেতে পেরেছিল জাহাজটি, তারপরেই হাওয়ায় দুলে ওঠে ‘ভাসা’। ঝড় নয়, তবু একদিকে কাত হয়ে পড়ে জাহাজ, কামানের মুখ রাখা জনালা দিয়ে জল ঢুকে যায় জাহাজে। ভারসাম্য হারিয়ে ‘ভাসা’ ডুবে যায় জলের প্রায় ৩৩ মিটার গভীরে। তখনও স্টকহোম বন্দরের সীমা পুরোপুরি অতিক্রম করেনি জাহাজ। ভাসা যখন ডুবে যায় তখন নানা স্তরের নাবিক ও যাত্রী মিলিয়ে সংখ্যা ছিল প্রায় ২৫০ জন। তার মধ্যে মৃত্যু হয়েছিল ৩০ জনের। তাঁদের কয়েকজনের কঙ্কাল সংরক্ষিত আছে মিউজিয়ামে।
সুইডেনের রাজকীয় গরিমার উপরে এ আঘাত ৪০০ বছর আগের। হাল ছাড়েনি, হার মানেনি বিজ্ঞানী আর অভিযাত্রীর দল। একদিকে শুরু হয় বিপর্যয়ের কারণ খোঁজা, অন্য দিকে জাহাজটিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। যেখানে ভাসার সলিল সমাধি হয়েছিল সে স্থানটি টাইটানিকের মতো গভীর সমুদ্র নয়। সেডারস্ট্রোম নদী যেখানে লেক ম্যালারেন এবং বাল্টিক সাগরের গায়ে গায়ে সল্টসিয়ন উপসাগরে মিলিত হয়েছে, সেই সমুদ্র-শিয়রে জলের গভীরতা মাত্র ৩৩ মিটার। কিন্তু জায়গাটি দুর্গম আর কাদা-পাঁকে মাখামাখি। সেই কাদার মধ্যে মুখ গুঁজে অক্ষত অবস্থায় পড়ে ছিল সে কালের তক্ষণ শিল্পের সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত ‘ভাসা’। এটি ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে সজ্জিত যুদ্ধজাহাজ। দুই ডেকে বসানো হয়েছিল ৬৪টি কামান। প্রচুর কাঠের খোদাই, রঙিন মূর্তি, অস্ত্র আর অলঙ্কারে ভরা ছিল জাহাজটি। সুইডেনের সামরিক শক্তির পাশাপাশি সৌন্দর্য আর ঐশ্বর্যের প্রদর্শনও ছিল গুস্তাভ অ্যাডলফের উদ্দেশ্য।খবর শুনে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল গোটা ইউরোপ, কেউ বা স্বস্তির নিঃশ্বাসও ফেলেছিল নিশ্চয়। তবে অল্পদিন পরেই শুরু হয়েছিল উদ্ধারের কাজ।
বছর দু’য়েকের মধ্যেই ইয়ান বুলমার নামে ইংরেজ প্রযুক্তিবিদ জাহাজের কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং জাহাজের কাঠের মেরুদণ্ডটি (‘কিল’) চিহ্নিত করেছিলেন। এরপর ১৬৩০ থেকে ১৬৬০ এর মধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযান হয়। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি কামান তুলে এনেছিলেন অভিযাত্রীরা। এরপর দীর্ঘ নীরবতা, যেন চিরতরেই সমুদ্রে হারিয়ে গেল ভাসা। আবার চেষ্টা শুরু হয় ২০০ বছর পরে। ১৮৪৪ এ ফাহনেহজেলম (Fahnehjelm) নামক এক বিজ্ঞানী আবার চেষ্টা করেন। তবে সবচেয়ে কার্যকরী চেষ্টা শুরু হয় ১৯৫৪ থেকে। আন্দার্জ ফ্রানজেন (Anders Franzen) নামের এক সুইডিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ (যিনি মেরিন ইঞ্জিনিয়ারও) লাগাতার চেষ্টা করে ১৯৫৬ সালে জাহাজের সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, যেহেতু বাল্টিক সাগরের জলে লবনের ভাগ কম এবং জীবাণুর মাত্রাও কম, তাই পরিবেশের আনুকূল্যে জাহাজ হয়তো বিনষ্ট হয়নি। অনেক চেষ্টায় তিনি জাহাজের কাঠের কিছু নমুনা তুলে আনতে সক্ষম হন। এবং তখন থেকেই বিশ্বাস করা শুরু হয় যে জাহাজটিকে পুনরুদ্ধার করা যাবে। ১৯৫৭-৫৯ সালে জাহাজের নীচ দিয়ে সুড়ঙ্গ করে জড়িয়ে দেওয়া হয় স্টিলের কেবল। তারপর ১৯৫৯ সালে থেকে দু’বছরের চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত ১৯৬১ সালের ২৪শে এপ্রিল তারিখে ‘ভাসা’কে সম্পূর্ণ রূপে উদ্ধার করা সম্ভব হলো। তখনও এর সুদৃশ্য কাঠের কারুকার্য প্রায় ৯৫ ভাগ অক্ষত ছিল। এরপর কয়েক বছর ধরে চলে জাহাজটিকে শুকনো করা এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে স্থায়িত্ব দেবার কাজ। ১৯৮৮ থেকে মিউজিয়ামে স্থান পায় ‘ভাসা’।
স্টকহোমে যত মানুষ নোবেল মিউজিয়াম দেখতে যান, ভাসা মিউজিয়ামের দর্শক সংখ্যা তার চেয়ে কম নয়। তাদের কৌতূহল মেটায় দর্শক বান্ধব ‘অডিও গাইড’। কিন্তু কেন ডুবে গিয়েছিল সেকালের সর্বাধুনিক এবং সুসজ্জিত যুদ্ধ জাহাজটি? টাইটানিক ডুবেছিল ডুবো পাহাড়ের ধাক্কায়। কিন্তু ভাসা যখন জলের মধ্যে কাত হয়ে হেলে পড়ে তখন স্টকহোম বন্দর থেকে তার দূরত্ব মাত্র ১,৩০০ মিটার। সামন্য হালকা বাতাসেই দুলে ওঠে ৬৪টি কামানবাহী জাহাজটি।
কামানের জানালা (gun ports) খোলা ছিল, তাই জলে ঢুকে ভারসাম্য নষ্ট হয়। প্রযুক্তিবিদরা অনেক মাথা ঘামিয়েছেন ভাসার ডুবে যাওয়া নিয়ে। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত ভারি হয়েছিল জাহাজটি, হয়তো ৬৪ টি অতিকায় কামানের জন্য। তাছাড়া নকশার ত্রুটিও তাঁদের চোখে পড়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্য ছিল এর ভরকেন্দ্রের (Center of gravity) স্থানচ্যুতি। জাহাজ কাত হয়ে হেলে পড়ার এটাই প্রধান কারণ। সেদিন বিপর্যয় ঠেকানো যায় নি, কিন্তু ‘ভাসা’কে হারিয়েও যেতে দেয়নি সুইডিশরা। ১৬২৮ থেকে ১৯৬১ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৩৩ বছরের সলিল সমাধি থেকে তুলে এনেছে রাজা গুস্তভের স্বপ্নের জাহাজকে। বিশ্বের ইতিহাসে এমন অত্যাশ্চার্য পুনরুদ্ধারের ঘটনা আর একটিও নেই!
Advertisement



