• facebook
  • twitter
Thursday, 1 January, 2026

শ্রীচৈতন্য ও বাংলা নাটক

চৈতন্য-প্রবর্তিত এই সামাজিক সাম্যের আদর্শ যাত্রাকে কেবল ভক্তিমূলক লীলায় আবদ্ধ না রেখে, সামাজিক বার্তা বহন করার একটি শক্তিশালী লোকমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

সুকান্ত পাল

বাঙালির জীবনে নাটকের প্রভাব যথেষ্ট। বলা হয়, বাংলার নাটক বাঙালি জীবনের সঙ্গে যতটা ঘনিষ্ঠ যুগ রচনা করেছে বাংলা সাহিত্যের আর কোনও বিষয় এতখানি ঘনিষ্ঠ যোগ স্থাপন করতে পারেনি। কোনও জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। আমরা যখন সংস্কৃতির কোনও বিষয় নিয়ে বর্তমান আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়ে তখন সেখানে গান, কবিতা, ছবি, থেকে শুরু করে যাত্রা, নাটক, মূকাভিনয়, সিনেমা সবই এসে পড়ে। যাত্রাপালা, নাটক কোনও দেশেই হঠাৎ করে জন্ম নেয়নি। অন্যান্য আর পাঁচটা শিল্পকলার মতোই বাংলা যাত্রা ও নাটক বিবর্তনের সিঁড়ি বেয়েই অগ্রসর হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে অভিনয় কেবল প্রমোদকলাই নয়, তা এক ধরনের জীবনের প্রস্তুতি।

Advertisement

বাংলায় এই জীবনের প্রস্তুতির পথের নির্দেশ দিয়েছিলেন শ্রী চৈতন্য। গবেষক নির্মল বন্দ্যোপাধ্যায় তার গবেষণা গ্রন্থ ‘উনিশ শতকের বাংলা : সাধারণ রঙ্গালয়: ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ, সমাজ জীবন’ এ লেখেন, ‘ষোড়শ শতকের শুরুতে শ্রীচৈতনের নেতৃত্বে নবদ্বীপে এক ধরনের নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে যাতে শহরের সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণের পরিচয় পাওয়া যায়।’ এই ভাষ্য থেকে একটা সুনির্দিষ্ট পরিষ্কার ধারণা তৈরি হয় এই যে, নাগরিক সংস্কৃতির মধ্যেই নাটকের যাত্রা শুরু। এখানে একটি কথা বলে নেওয়া ভালো তা হল যাত্রা ও নাটকের সৃষ্টির উৎস মুখে দাঁড়িয়ে আছে ধর্ম ও তার অনুষ্ঠান। গবেষক স্বরূপ বোস বলেন,’ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রয়োজন মিটিয়ে নাটকে যিনি দ্বিতীয় চরিত্রটি আমদানি করেছেন, নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি নমস্য। পাশ্চাত্যে এই নমস্য ব্যক্তি হলেন ইস্কাইলাস। পরে সফোক্লিস। বাংলা নাটকের আদিতে দেখতে পাই একইভাবে কৃষ্ণ রাধার উপস্থিতি। কিন্তু মুখ্য ভূমিকা দূতীর’।

Advertisement

এই বাংলায় যাত্রা ও নাটক অভিনয়ের মূল উৎস ও প্রেরণদাতা ছিলেন শ্রীচৈতন্য। তিনি নিজে যেমন ভক্তদের নিয়ে অভিনয় করেছেন তেমনি তাঁর প্রচলিত বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে বাংলায় কৃষ্ণ যাত্রা ব্যাপক প্রচলন হয়। পরবর্তীকালে তো তাঁর জীবন লীলাকে কেন্দ্র করে যাত্রা ও নাটকের প্রধান বিষয়বস্তু গড়ে ওঠে। তিনি অভিনয় কলাকে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন। তাই তো তাঁকে ‘নটবর গৌরকিশোর’ ‘গৌর নটরাজ’ বলা হয়।

কারণ তিনি অনুভব করেছিলেন যে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই তাঁর ভক্তি ধর্মের তাৎপর্য সফলভাবে সকলের সামনে প্রতিপাদিত হয়ে উঠবে। চৈতন্যদেব নিজেও অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁর অনুগামীদের উৎসাহ দানের জন্যই শুধু নয়; এক গভীর আন্তরিক বিশ্বাস ও প্রেমাবেগ থেকে। শান্তিপুরের গঙ্গাতীরে ‘দানলীলা’ নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি রাধিকার ভূমিকায়। অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছিলেন অদ্বৈত আচার্য। রাধিকার বেশে তিনি প্রায়ই নাট্যাভিনয় ও কীর্তন করেছেন। চৈতন্যচরিতামৃতের মধ্যলীলায় দেখি শ্রীচৈতন্য পুরীতেও যাত্রাভিনয় করেছিলেন। সেখানে রাজা প্রতাপ রুদ্রের সহায়তায় তিনি কয়েকবার অভিনয় করেছিলেন। এই পুরীতেই এক বিজয়া দশমীতে চৈতন্যদেব সদলবলে ‘রাবণ বধ’ যাত্রা পালায় অভিনয় করেছিলেন। এবং তিনি স্বয়ং হনুমানের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। চৈতন্যদেবের এহেন নাট্যলীলায় অনুপ্রাণিত হয়ে রূপ গোস্বামী লিখে ফেলেছিলেন ‘বিদগ্ধ মাধব’ এবং ‘ললিত মাধব’ নাটক।

বাংলা নাটকের পরম্পরায় চৈতন্যদেবের অবদান ঐতিহাসিক, দার্শনিক এবং আঙ্গিকগত দিক থেকে ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি ধর্মীয় প্রচারের উদ্দেশ্যে লোকনাট্যের আঙ্গিককে ব্যবহার করেছিলেন। একটা প্রশ্ন এখানে এসে যায়– তা হল, শুধুমাত্র ধর্মীয় প্রচার? নাকি পরবর্তীকালে আরেক যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ নাটককে বলেছিলেন লোকশিক্ষার মাধ্যম তারও কি একেবারে প্রাথমিক ইঙ্গিত এখানে পাই না?

এই প্রশ্নের উত্তরে দেখি যে, চৈতন্যদেব অভিনয়কে আনুষ্ঠানিক উৎসবের গৌণতা থেকে মুক্ত করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প রূপে প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে যাত্রাপালা নামে পরিচিত হয়। তাঁর মাধ্যমেই নাট্যকলায় পৃষ্ঠপোষকতায রাজদরবার থেকে গণমানুষের স্তরের স্থানান্তরিত হয়।

এখানে একটি কথা অবশ্যই আমাদের স্মরণ করতে হবে তা হলো চৈতন্যদেব তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অনুভব করেছিলেন যে শুধুমাত্র তত্ত্বজ্ঞান নয়, মানুষকে সংগঠিত করতে হবে সাধারণের অনুকরণযোগ্য পথে। এই কারণেই তিনি তাঁর বিখ্যাত হরিনাম সংকীর্তনের প্রবর্তন করেছিলেন। এই নাম গান ছিল এক ধরনের গণবাণী। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক পারমিতা ভৌমিক যথার্থই বলেন, ‘মানুষের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাও এই নাম সংকীর্তননের মুক্তি পেল। দেশপ্রেম জাতীয়তাবাদের প্লাবন বইল। একদিকে মুসলমান শাসকের অবিচার অত্যাচার অন্যদিকে উচ্চ বর্ণের বিদ্বেষ নিম্ন বর্ণের প্রতি, জাতপাতের সংস্কার প্রভৃতির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ সংগ্রামী জনমানস গঠনে, চৈতন্যদেব হরিনাম সংকীর্তনের ছত্রছায়ায় এনে দাঁড় করালেন মানুষকে। বন্দেমাতরম মন্ত্র আর তিনরঙা পতাকার তলায় সংগঠিত রাজনৈতিক জনতার চেতনার সঙ্গে সাযুজ্য রয়েছে এ গণচৈতন্য উদ্বোধনের । একেই বলবো চৈতন্য রেনেশাঁস ।’

এই নাম সংকীর্তনের মধ্য দিয়েই এলো অপূর্ব চৈতন্য নৃত্যের ভঙ্গিমা। গ্রাম ও নগরের পথে পথে সেই অপূর্ব ভঙ্গিমায় উদ্বাহু হয়ে নৃত্যের তালে তালে আপনভাবে ভিতর থেকে প্রকাশ হল নৃত্যকলার মাধ্যমে এক সূক্ষ অভিনয়ের পদযাত্রা। এ যাত্রা সংস্কৃতির ভিন্ন শাখার (অভিনয়) অভিমুখী। পরবর্তীকালে এই নৃত্য এবং অভিনয় পরস্পর সম্পর্কিত হয়ে গেল। লোচন দাস ঠাকুরের চৈতন্য মঙ্গলে চৈতন্য দেবের অভিনয়ের কথা উল্লেখ আছে। সেখানে পায়ে নূপুর পরে নাটকের মধ্যেই তিনি ভাবাবেশে নৃত্য করছেন দেখা যায়।

শ্রীচৈতন্যদেবের উদার ধর্মনীতি ও সাম্যবাদী প্রচেষ্টা বাংলার সমাজ ও সাহিত্যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মহাপ্রভু প্রচার করেছিলেন যে, তাঁর মহাধর্মে জাতি-কুলের বিচার বড় নয়; ‘হরিভক্তিতে নাহি জাত কুলাদি বিচার’ ।

এই উদার মানবধর্মের আদর্শ যাত্রাপালার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বিষয়বস্তুর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। শ্রীচৈতন্যদেবের উদার ধর্মনীতি ও সাম্যবাদী প্রচেষ্টা বাংলার সমাজ ও সাহিত্যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মহাপ্রভু প্রচার করেছিলেন যে, তাঁর মহাধর্মে জাতি-কুলের বিচার বড় নয়; ‘হরিভক্তিতে নাহি জাত কুলাদি বিচার’।

এই উদার মানবধর্মের আদর্শ যাত্রাপালার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বিষয়বস্তুর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বৈষ্ণব ধর্ম সমাজের প্রান্তিক মানুষকে (বাউল, বোষ্টম, বৈরাগী) আত্মমর্যাদা বোধে উদ্দীপিত করেছিল। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প রাধারানীতে এর প্রতিফলন দেখা যায়, যেখানে জাত বৈষ্ণব না হয়েও এক কুলহারা বারাঙ্গনার সন্তান গৌরদাস কৃষ্ণযাত্রা পালায় রাধার ভূমিকায় অভিনয় করে। যাত্রাদলের অধিকারীর মন্তব্যে এই আদর্শের প্রতিফলন ঘটে: ‘সেই পুণ্যে ওর পাপ ধুয়ে মুছে যাবে বলেই আশা করি’ ।

এই সামাজিক স্বীকৃতি যাত্রাপালার ক্ষেত্রকে আরও প্রশস্ত করে। চৈতন্য-প্রবর্তিত এই সামাজিক সাম্যের আদর্শ যাত্রাকে কেবল ভক্তিমূলক লীলায় আবদ্ধ না রেখে, সামাজিক বার্তা বহন করার একটি শক্তিশালী লোকমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই আধ্যাত্মিক অনুমোদন পরবর্তীকালে যাত্রাপালাকে সামাজিক পালা (যেমন ব্রজেন্দ্র কুমার দে-র আকালের দেশ বা নিষিদ্ধ ফল) রচনার ভিত্তি তৈরি করে ।

উনিশ শতকের নবজাগরণের যুগে এবং তার পরবর্তী আধুনিক সাহিত্যেও শ্রীচৈতন্যের প্রভাব গভীরভাবে লক্ষ করা যায়। ভক্তিরসের তাত্ত্বিক কাঠামো আধুনিক নাট্যকার ও সাহিত্যিকদের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

উনিশ শতকের পেশাদার মঞ্চে ভক্তিভাবের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষের অবদান অনস্বীকার্য। গিরিশচন্দ্র পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, এবং সামাজিক নাটকের পাশাপাশি আধ্যাত্মচেতনা ও ভক্তিভাবের প্রভাবযুক্ত নাটক রচনা করেছিলেন। তাঁর রচিত অন্যতম উল্লেখযোগ্য ভক্তিপ্রধান নাটক হলো বিল্বমঙ্গল । এই নাটকগুলি আধুনিক মঞ্চে ভক্তিরসের আবেদনকে পুনরুজ্জীবিত করে, যা মূলত চৈতন্য প্রবর্তিত ভক্তিবাদের আধুনিক নাট্যিক প্রয়োগ ছিল।

আধুনিক সাহিত্যে বৈষ্ণব তত্ত্বের প্রভাব কেবল প্রত্যক্ষ কাহিনিতে নয়, বরং আঙ্গিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণেও নিহিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সানন্দে শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত কীর্তনকে গ্রহণ করেন এবং তাকে সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপ্তি দেন। তিনি কখনও চরিত্রের মনঃবিশ্লেষণে, কখনও পরিস্থিতি পরিস্ফুটনে, আবার কখনও প্রাকৃতিক পরিবেশ রচনায় কীর্তনের ব্যবহার করেন। উদাহরণস্বরূপ, চোখের বালি উপন্যাসে মহেন্দ্রের মনের প্রসন্নতা বোঝাতে বৈষ্ণব ভিক্ষুকের খোল করতাল বাজিয়ে কীর্তন গানের উল্লেখ রয়েছে। মেঘ ও রৌদ্র গল্পে শশিভূষণের মানসিক চরিত্র বিশ্লেষণে বৈষ্ণব ভিখারির গানের (যেমন ‘এসো এসো ফিরে এসো – নাথ হে, ফিরে এসো…’) সার্থক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়, যা কাহিনির কঠিন বাস্তবতার শেষে ভাবোল্লাস যোগ করে। এই ব্যবহারের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, চৈতন্য-প্রবর্তিত ভক্তিরসের তীব্র আবেগ (যেমন বিরহ বা মাধুর্য) আধুনিক যুগে এসে কেবল ধর্মীয় কাঠামো থেকে মুক্ত হয়ে মানবিক সম্পর্কের গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিকে যাত্রা করেছে।
চৈতন্যদেবের উদার আদর্শ নাট্যকলার মাধ্যমে সমাজে প্রান্তিক মানুষদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ করে দেয়।

সামাজিক বিপ্লবের পথনির্দেশের সূচনা করে। এই মানবিক আবেদনটাই পরবর্তীকালে যাত্রাপালার ভিত্তি তৈরি করে দেয়। আধুনিক যুগে তারই প্রবর্তিত ভাব ও আদর্শ, বিশ্বাস ও আবেগ গুলি রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের মতো লেখকদের হাতে কেবল ধর্মীয় পটভূমিতে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবিক সম্পর্কের বিভিন্ন সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হয় এবং পরবর্তীকালে নাট্য সাহিত্য একটা অত্যন্ত শক্তিশালী ও মূল্যবান সাহিত্যের শাখায় পরিণত হয় । এদিক থেকে দেখতে গেলে চৈতন্যদেব বাংলার নাট্যকলার ইতিহাসে এক মহান পথপ্রদর্শক ও সংযোগকারী প্রতিভা। তিনি লোকায়ত আঙ্গিককে উচ্চতর দার্শনিক ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করে একটি গণমুখী এবং স্থায়ী নাট্যধারার জন্ম দেন, যার উত্তরাধিকার আজও বাংলার মঞ্চ ও সাহিত্যকে প্রভাবিত করে চলেছে।

Advertisement