আমেরিকার রাজনীতিতে নভেম্বর মাস মানেই সাসপেন্স। কারণ, মিডটার্ম ইলেকশন। আর এ বার সেই মাঝ-মেয়াদি নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশনের (Midterm Elections) আগে যে ছবিটা ফুটে উঠছে, তাতে স্বস্তিতে নেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর রিপাবলিকান পার্টি (Republican Party)। উল্টো দিকে চাঙ্গা মেজাজে ডেমোক্র্যাট পার্টি (Democratic Party), যারা এ বার শুধু নিজেদের ঘাঁটি বাঁচানো নয়, ঢুকে পড়তে চাইছে একেবারে রিপাবলিকানদের গড়েও।
পতনের ইঙ্গিত স্পষ্ট
সাম্প্রতিক জনমত সমীক্ষাগুলি বলছে, ট্রাম্পের অনুমোদনের হার বা অ্যাপ্রুভাল রেটিং (Approval Rating) নেমে দাঁড়িয়েছে মোটামুটি ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশে, আর তাঁকে অপছন্দ করছেন প্রায় ৫৯ শতাংশ ভোটার। নিউজউইকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী জাতীয় স্তরে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার মাইনাস চব্বিশ, এবং প্রতিটি বড় ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যেই তিনি এখন গভীর জলে তলিয়ে গিয়েছেন। এমনকি রিপাবলিকান-অধ্যুষিত রাজ্যগুলিতেও তাঁর জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। কংগ্রেসের জেনেরিক ব্যালট (Generic Ballot) সমীক্ষাতেও একচেটিয়া এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা, ব্যবধান মোটামুটি ছয় পয়েন্টের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে।
লাল রাজ্যে হানা
হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস (House of Representatives) দখল করতে ডেমোক্র্যাটদের দরকার মাত্র তিনটি আসন। সেই লক্ষ্যেই তারা নজর দিয়েছে এমন কিছু রাজ্যে, যেগুলি চিরকাল রিপাবলিকানদের গড় বলে পরিচিত। সেনেটের (Senate) লড়াইয়েও একই ছবি। মেইন আর নর্থ ক্যারোলাইনার পাশাপাশি ওহায়োতেও এ বার সরাসরি লড়াইয়ে নেমেছেন প্রাক্তন সেনেটর শেরড ব্রাউন। আলাস্কায় প্রার্থী হয়েছেন কংগ্রেসওম্যান মেরি পেল্টোলা। ঢেউ যদি সত্যিই বড় হয়, তা হলে আইওয়া কিংবা টেক্সাসের মতো রাজ্যেও লড়াই জমে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রেক্ষাপট বলছে, ডেমোক্র্যাটদের সেরা দুই আক্রমণের জায়গা এই মুহূর্তে মেইন আর নর্থ ক্যারোলাইনা। সেখানে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি হালে পানি পাবে না।
তবে একতরফা লড়াই হচ্ছে, এমনটাও নয়। জর্জিয়ায় সেনেটর জন অসফের আসনটি রিপাবলিকানদের কাছে সোনার হরিণ, কারণ ৬ বছর আগে সামান্য ব্যবধানে জিতেছিলেন তিনি। মিশিগানেও সেনেটর গ্যারি পিটার্সের অবসরের পর আসনটি ছিনিয়ে নেওয়ার আশায় আছেন রিপাবলিকানরা।
পাল্টা রণকৌশলে ট্রাম্প
জনমত যতই প্রতিকূল হোক, ময়দান ছাড়ছে না ট্রাম্পের রিপাবলিকান শিবির। তাদের প্রধান হাতিয়ার এখন পুনর্বিন্যাস বা রিডিস্ট্রিক্টিং (Redistricting)। টেক্সাস, ওহায়ো, ফ্লোরিডার মতো রাজ্যে মেয়াদের মাঝপথেই কংগ্রেসের আসন বিন্যাস নতুন করে সাজিয়ে নিজেদের পক্ষে সুবিধা তৈরির চেষ্টা করেছে তারা। ভার্জিনিয়া আর টেনেসিতে আদালতে যে সাম্প্রতিক জয় তারা পেয়েছে, সেটা কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে রিপাবলিক পার্টিকে। এমনকি প্রচারে গতি আনতে ডালাসে একটি মিডটার্ম কনভেনশনও ডেকেছেন ট্রাম্প নিজে।
কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। নির্বাচনী উৎসাহে বিরাট ফারাক দেখা যাচ্ছে দুই দলের ভোটারদের মধ্যে, ডেমোক্র্যাটরা ভোট দিতে আগ্রহী হওয়ার প্রশ্নে প্রায় দশ পয়েন্ট এগিয়ে। রিপাবলিকান শিবিরের নিজস্ব হিসাব বলছে, তাদের ভোটারদের একটা বড় অংশ ভোটকেন্দ্রেই যাবেন না। কারণ, তাঁরা ভোটে উৎসাহ হারিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট কৌশলী জেমস কার্ভিল অবশ্য রাখঢাক না রেখেই বলে দিয়েছেন, রিপাবলিকানদের জন্য এ বারের নির্বাচন হতে চলেছে সম্পূর্ণ বিপর্যয়, যদিও দলের ভেতরেই এই দাবি নিয়ে দ্বিমত রয়েছে।
শেষ কথা এখনই নয়
এত সব ইঙ্গিত সত্ত্বেও নভেম্বরের ফল নিয়ে ১০০ শতাংশ নিশ্চয়তা দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। রিডিস্ট্রিক্টিং যুদ্ধ এখনও চলছে, একাধিক রাজ্যে মামলা ঝুলে রয়েছে আদালতে। গ্যাসের দাম, মূল্যবৃদ্ধি আর অভিবাসন নীতি নিয়ে ক্ষোভ ভোটের দিন পর্যন্ত কতটা টিকে থাকবে, তার উপরেও নির্ভর করছে অনেক কিছু। তবে এটুকু স্পষ্ট, একদা যে রাজ্যগুলিকে দখল করার কথা ডেমোক্র্যাটরা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না, সেখানেই এখন প্রচারে ঝাঁপাচ্ছে দল। লাল দুর্গের দেওয়ালে চিড় ধরানোর এই লড়াই আমেরিকার রাজনীতিকে ঠেলে দিচ্ছে এক নতুন অনিশ্চয়তার দিকে। দেওয়াল লিখন বলছে, ট্রাম্পের বিদায় আসন্ন।




