পশ্চিম এশিয়ায় ফের বাড়ছে উত্তেজনা। এই পরিস্থিতিতে সংঘাতের সমাধানে কূটনীতি ও আলোচনার উপরেই জোর দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সোমবার কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও-র শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন তিনি। ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা-ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর এই প্রথম মুখোমুখি বৈঠক হল দুই রাষ্ট্রনেতার। সাংহাই এসসিও শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে হবে আলাপ-আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে। সংঘাত বন্ধ করে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে কোনও উদ্যোগকে ভারত সমর্থন করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। এছাড়াও ওই অঞ্চলে অবাধ নৌ-চলাচল এবং বাণিজ্যপথ সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন মোদী।
বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ পথ এই প্রণালী দিয়ে অসামরিক ও পণ্যবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। দীর্ঘ দিন ধরে হরমুজকে ঘিরে অস্থিরতার জেরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তা ভারতের কাছেও উদ্বেগের।
দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেন মোদী ও পেজেশকিয়ান। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত ও ইরানের যৌথ সহযোগিতা আরও জোরদার করতে ও সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার উপর উভয় পক্ষই গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
ঘটনাচক্রে, দুই রাষ্ট্রনেতার বৈঠকের আগেই পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। আমেরিকার দাবি, হরমুজ প্রণালীর কাছে লারাক দ্বীপে ইরান সমুদ্রপথে মাইন বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সেই কারণে ইরানের দু’টি রকেট লঞ্চার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের পাল্টা দাবি, জর্ডনে থাকা কিং হুসেন ও আল-আজরাক এলাকায় দু’টি মার্কিন সেনাঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তাদের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি। এই হামলার নাম দেওয়া হয়েছে ‘আগ্রাসনের শাস্তি’।
এই পরিস্থিতিতে বিশকেকে যাওয়ার আগে পেজেশকিয়ান জানিয়েছিলেন, ইরান যুদ্ধ চায় না। তবে কোনও হামলার জবাব শক্তি ও দৃঢ়তার সঙ্গে দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিতিশীলতা কোনও দেশের জন্যই লাভজনক নয়। অর্থনৈতিক উন্নতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে এই অঞ্চলের দেশগুলির ঐক্য প্রয়োজন।
ভারত অবশ্য শুরু থেকেই সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে সওয়াল করে এসেছে। চলতি বছরের মার্চে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময়ও মোদী জানিয়েছিলেন, সমস্ত সমস্যার সমাধান আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমেই হওয়া উচিত। ইরানে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং জ্বালানি ও পণ্যের নির্বিঘ্ন চলাচলের বিষয়টিকেও ভারতের অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সোমবার মোদী ও পুতিনের মধ্যে আলাদা করে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়। সূত্রের খবর, বৈঠকে জ্বালানি সরবরাহ-সহ দু’দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসসিও-র ২৬তম শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে মোদী ও পুতিন দু’জনেই বিশকেকে রয়েছেন। ভারত-রাশিয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্কের পাশাপাশি জ্বালানি, বাণিজ্য ও অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়েও দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। তবে বৈঠকে ঠিক কোন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত বা সমঝোতা হয়েছে, তা এখনও সরকারিভাবে জানানো হয়নি।
এদিন এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ানের সঙ্গেও বৈঠক করেন মোদী। প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, ওষুধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি-সহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়েও মতবিনিময় করেন দুই নেতা।
আরও পড়ুন: গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে ভয়াবহ হড়পা বান, নিখোঁজ অন্তত ১৫, উদ্ধার ৬২
এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও মোদীর বৈঠকের কথা রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সংঘাতের আবহে একই দিনে ইরান, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কূটনৈতিক তৎপরতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এবার এসসিও গঠনের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে এই সম্মেলন। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে শীর্ষ সম্মেলন।




