• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 9 July, 2026

‘সন্ত্রাসের ঘাঁটিতে ভারতের আঘাতের প্রতিধ্বনি শুনেছে গোটা বিশ্ব’, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মোদীর ‘অপারেশন সিঁদুর’

অস্ট্রেলিয়া সফরে মেলবোর্নে প্রবাসী ভারতীয়দের সামনে অপারেশন সিঁদুরের প্রসঙ্গ তুললেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। একই সফরে ইউরেনিয়াম রপ্তানি চুক্তি, মহাকাশ স্টেশন ঘোষণার মতো গরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিশদে।

‘সন্ত্রাসের ঘাঁটিতে ভারতের আঘাতের প্রতিধ্বনি শুনেছে গোটা বিশ্ব’, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মোদীর ‘অপারেশন সিঁদুর’

মেলবোর্নে মোদী (ANI)

অস্ট্রেলিয়ার (Australia) মাটিতে দাঁড়িয়ে ফের অপারেশন সিঁদুরের (Operation Sindoor) প্রসঙ্গ টানলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিন দিনের অস্ট্রেলিয়া সফরে বৃহস্পতিবার মেলবোর্নে প্রবাসী ভারতীয়দের একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি বলেন, সন্ত্রাসের ঘাঁটিতে ভারতের সেই আঘাতের প্রতিধ্বনি গোটা বিশ্বে শোনা গিয়েছিল। প্রায় ৩০ হাজার প্রবাসী ভারতীয়ের ভিড়ে ঠাসা স্টেডিয়ামে মোদীর পাশেই হাজির ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ (Anthony Albanese)। এদিন অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একটি পরমাণু চুক্তিও সই করেন তিনি।

মেলবোর্নে হাউসফুল শো

মেলবোর্নের এই সংবর্ধনা সভায় প্রধানমন্ত্রী মোদী গত ১২ বছরে তৃতীয়বার অস্ট্রেলিয়া সফরে এসে বলেন, ভারতীয় প্রবাসীরাই দুই দেশের সম্পর্ককে এত মজবুত করে তুলেছেন। তিনি রসিকতা করে বলেন, ঘরে অস্ট্রেলিয়ান দুধ থাকলেও তা থেকে তৈরি চায়ে থাকে সম্পূর্ণ ভারতীয় স্বাদ। মেলবোর্নের আশপাশের এলাকাকে কেউ লিটল ইন্ডিয়া, কেউ মিনি ইন্ডিয়া বলে ডাকেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যালবানিজ নিজে মোদীকে অস্ট্রেলিয়ার সত্যিকারের বন্ধু বলে অভিহিত করেন। বলেন, এই সংবর্ধনা আসলে দুই গণতান্ত্রিক দেশের বন্ধুত্বেরই উদযাপন।

অপারেশন সিঁদুরের প্রসঙ্গ কেন

ভাষণের মাঝে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অপারেশন সিঁদুরের সময় সন্ত্রাসী শিবিরে যে আঘাত হানা হয়েছিল, তার প্রতিধ্বনি গোটা দুনিয়ায় শোনা গিয়েছিল। অপারেশন সিঁদুর নিয়ে দেশবাসীর গর্বিত হওয়া উচিত কি না, তা প্রবাসীদের কাছেই জানতে চান তিনি। এরপরই তিনি বলেন, ভারত এখানেই থেমে থাকতে চায় না, বরং জিপ থেকে জাহাজ, প্রতিরক্ষা উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে দেশে। অর্থাৎ সামরিক সাফল্যের প্রসঙ্গ টেনে আনার পরপরই তিনি সেটিকে দেশীয় উৎপাদন ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার বার্তার সঙ্গে জুড়ে দেন, যা তাঁর ভাষণের একটি তাৎপর্যপূর্ণ কৌশল বলেই মনে করছে তথ্যাভিজ্ঞ মহল।

আরও পড়ুন: ‘আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে সব সংঘাতের সমাধান সম্ভব’, পশ্চিম এশিয়ায় শান্তির বার্তা মোদীর

এক সফরে ইউরেনিয়াম থেকে মহাকাশ

শুধু বক্তৃতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই সফর। মেলবোর্নে অ্যালবানিজের সঙ্গে বৈঠকের পর মোদী জানান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে পরমাণু শক্তি ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে, যার মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারতে ইউরেনিয়াম রফতানির পথ খুলে যাবে। ২০১৫ সালের ভারত-অস্ট্রেলিয়া পরমাণু সহযোগিতা চুক্তির আওতায় সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ কাজে এই ইউরেনিয়াম ব্যবহৃত হবে বলে জানানো হয়েছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এই চুক্তি ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া দুই দেশ একটি ক্রিটিক্যাল মিনারেলস করিডর (Critical Minerals Corridor), একটি সামগ্রিক আর্থিক সহযোগিতা চুক্তি বা সিইসিএ (CECA), এবং কোকোস কিলিং দ্বীপে (Cocos Keeling Islands) ভারতের গগনযান (Gaganyaan) প্রকল্পের জন্য একটি অস্থায়ী স্পেস ট্র্যাকিং টার্মিনাল তৈরির বিষয়েও সহমত হয়েছে। মেলবোর্নের ভাষণে মোদী এদিন ঘোষণা করেন, ভারত নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন তৈরির পথে এগোচ্ছে।

বার্তার কৌশল

লক্ষ করার মতো বিষয়, প্রবাসী ভারতীয়দের সামনে সামরিক সাফল্য, প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বিনিয়োগের আহ্বান, এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে গেঁথে দেওয়া হয়েছে ভাষণে। একদিকে অপারেশন সিঁদুরের প্রসঙ্গে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দেওয়া, অন্যদিকে সিইও ফোরামে বিনিয়োগের আহ্বান এবং ইউরেনিয়াম চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, একই সফরে এই তিন স্তরের বার্তা দেওয়াটা স্পষ্টতই সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। ভারতের বিশ্ব দরবারে গুরুত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি দেশে ফিরে এই সাফল্যগুলিকে প্রচারের অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহারের সম্ভাবনা থেকে যায়।

বাংলার সঙ্গে যোগ কোথায়

এই ইউরেনিয়াম চুক্তির খবর পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে একটি পুরনো প্রসঙ্গ ফের সামনে আনে। ২০০৬ সালে তৎকালীন বাম সরকারের আমলে পূর্ব মেদিনীপুরের হরিপুরে (Haripur) ছয়টি বড় পরমাণু চুল্লি বসানোর প্রস্তাব উঠেছিল, কিন্তু কৃষিজমি ও জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় স্থানীয় মানুষ এবং রাজনৈতিক দলগুলির তীব্র বিরোধিতার মুখে ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় পরমাণু শক্তি দফতর ফের প্রাথমিক অনুমোদন দিলেও প্রকল্পের কাজ আর এগোয়নি। রাজ্যে এখন বিজেপি সরকার ক্ষমতায়, এই পরিস্থিতিতে দেশের পরমাণু বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের নতুন উদ্যম হরিপুরের মতো থমকে থাকা প্রকল্পগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে ফের প্রশ্ন তুলতে পারে, যদিও এই মুহূর্তে হরিপুর পুনরুজ্জীবনের কোনও সরকারি ঘোষণা মেলেনি।