সৈয়দ হাসমত জালাল
শেষ পর্ব
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা যতই বাড়ুক, একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে: ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে এই নির্বাচন কতটা সর্বজনগ্রাহ্য হতে পারে? দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারের ভোটে তারা অংশ নিচ্ছে না। অথচ বাস্তবতা হল, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ কেবল একটি দল নয়— একটি বৃহৎ সামাজিক ও সাংগঠনিক শক্তি।
Advertisement
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে একদিকে যেমন সহজ করেছে, তেমনই অন্যদিকে তৈরি করেছে এক গভীর শূন্যতা। শহর থেকে গ্রাম— আজও দলটির লক্ষ লক্ষ সক্রিয় সমর্থক, সংগঠক ও ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে। প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র ও যুব সংগঠনের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এক দিনে অদৃশ্য হয়ে যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল অংশগ্রহণহীন জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কোথায়?
অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি, আইনের শাসন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বারবারই বলেছেন, এই নির্বাচন ‘স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য’ হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি মানদণ্ড স্থাপন করবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিপুল উপস্থিতিও সেই দাবিকে জোরদার করার কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কিন্তু কূটনৈতিক মহলে একথাও আলোচিত, একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে আয়োজিত ভোট দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।
Advertisement
বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বড় কোনও শক্তিকে দীর্ঘদিন বাদ দিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। অতীতেও দেখা গিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা বা দমনমূলক ব্যবস্থার মধ্যেও দলীয় সমর্থন সামাজিক স্তরে টিকে থাকে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অনেক সমর্থক প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও, ভোট ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের অসন্তোষ চাপা থাকছে না।
এই পরিস্থিতিতে বিএনপির জন্য সুযোগ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনই দায়িত্বও বেড়েছে। একদিকে দলটি মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে চাইছে; অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থক বিশাল জনগোষ্ঠীকে কীভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সেই প্রশ্নের কোনও স্পষ্ট উত্তর এখনও দেয়নি। শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলাই যে আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ, তা মানছেন বহু বিশ্লেষক।
তবে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, এক সাম্প্রতিক জনমত সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, আগে যাঁরা আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন, তাঁদের প্রায় ৪৮.২% এবার বিএনপিকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ‘আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: ফাইন্ডিংস ফ্রম আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক এই মতামত সমীক্ষাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ। বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়।
মনে করা হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকাতেই আওয়ামী লীগ সমর্থকদের এই মনোভাব। বিএনপি এর আগেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় এসেছিল। তাছাড়া, প্রাথমিক পর্যায়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে তারা রাজি ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই এই লীগ সমর্থকদের বিএনপির প্রতি সমর্থন থাকতেই পারে। তবে এই সমীক্ষায় আরও জানা গিয়েছে, যাঁরা আগে আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন, তাঁদের মধ্যে ২৯.৯% এবার জামায়াতকে ভোট দিতে পারেন।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে বিপুল আন্তর্জাতিক নজরদারি, স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি ও সংস্কারের দাবি; অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতি। ভোটের ফল যাই হোক, নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে— এই রাজনৈতিক শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে? গণতন্ত্র কি কেবল নির্বাচনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, না কি সকল প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করেই নতুন সমঝোতার পথে হাঁটবে দেশ?
Advertisement



