• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 7 September, 2026

জার্মানিতে বড় ভোটে বিজয়ী অতি-ডানপন্থীরা, ফিরছে হিটলারের নাৎসিবাদের ভয়ঙ্কর ইতিহাস?

স্যাক্সনি-আনহাল্টে ঐতিহাসিক জয় পেল এএফডি (AfD)। ৮৩ আসনের বিধানসভায় ৩৯টি আসন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে মাত্র তিন কদম দূরে। প্রশ্ন উঠছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে কি তবে সত্যিই ফিরে আসছে নাৎসিবাদ, অন্যরূপে। অতি-ডানপন্থী রাজনীতির পুরনো ছায়ায় ঘুরছে প্রশ্ন।

জার্মানিতে বড় ভোটে বিজয়ী অতি-ডানপন্থীরা, ফিরছে হিটলারের নাৎসিবাদের ভয়ঙ্কর ইতিহাস?

৪৩.৮ শতাংশ ভোট পেল AfD, জার্মানিতে কি নাৎসিরা ফিরল (AI নির্মাণ)

৬ সেপ্টেম্বর রাত। জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টে ভোটবাক্স খুলতেই স্পষ্ট হয়ে গেল ছবিটা। অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি (Alternative für Deutschland) পেয়েছে ৪৩.৮ শতাংশ ভোট। পাঁচ বছর আগে এই দলের ভোট ছিল ২০.৮ শতাংশ। এক ধাক্কায় তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেল।

শাসক দল মধ্যপন্থী ক্রিশ্চান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নের (CDU) রক্তক্ষরণ হয়েছে সবচেয়ে বেশি। তাদের ভোট নেমে এসেছে ১৭.২ শতাংশে। ৮৩ আসনের রাজ্য বিধানসভায় এএফডির আসন সংখ্যা ৩৯। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ৪২। অর্থাৎ মাত্র তিন আসন কম।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির কোনও অতি-ডানপন্থী দলের এমন রাজ্যস্তরের জয় নজিরবিহীন। প্রশ্ন উঠছে স্বাভাবিক ভাবেই, তবে কি নাৎসি-অতীতের ছায়া ফিরছে জার্মানিতে।

সহজ উত্তরে বলা যায়, না। কিন্তু বিপদটাকে হালকা করে দেখারও উপায় নেই।

এএফডি কি নতুন নাৎসি পার্টি

প্রথমেই একটা সীমারেখা টানা দরকার।

এএফডির জন্ম ২০১৩ সালে, ইউরোপীয় মুদ্রা ইউরো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতির সমালোচক হিসেবে। ২০১৪ সালের পর থেকে দলটি ধীরে ধীরে ডানপন্থী মতবাদের দিকে সরে যায়, তারপর আরও উগ্র জাতীয়তাবাদী ও অভিবাসন-বিরোধী অবস্থানে পৌঁছয়। জার্মানির নাগরিক শিক্ষা সংক্রান্ত সরকারি সংস্থাও দলটির এই ক্রমশ কট্টর ডানপন্থী যাত্রা নথিবদ্ধ করেছে।

তবে এএফডিকে সরাসরি হিটলারের ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি বা এনএসডিএপি (NSDAP)-র সঙ্গে গুলিয়ে ফেলাটা ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সাযুজ্যপূর্ণ নয়। এনএসডিএপি ছিল প্রকাশ্যে স্বৈরাচারী, ইহুদি-বিদ্বেষী এবং গণতন্ত্র-বিরোধী একটি আন্দোলন, যার লক্ষ্যই ছিল ওয়াইমার প্রজাতন্ত্রকে ভেঙে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই তারা জার্মানির গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে ফেলেছিল।

কিন্তু আজকের জার্মানি সেই ১৯৩৩ সালের জার্মানি নয়। জার্মান ইতিহাসবিদদের একাংশের মতেই, এএফডিকে হিটলারের পার্টির সঙ্গে সরাসরি এক করে ফেললে বরং আজকের নতুন বিপদটাকেই ঠিকমতো বোঝা যাবে না। তুলনা হয়তো টানা যায়, কিন্তু আজকের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা।

তাই নাৎসিদের প্রত্যাবর্তনের কথাটা খবরের শিরোনাম হতে পারে সতর্কতা হিসেবে, ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে নয়।

তা হলে এত ভয় কীসের

কারণ এএফডিকে নিছক একটি রক্ষণশীল দল বলেই থেমে থাকা যাচ্ছে না।

স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নিজস্ব সংবিধান সুরক্ষা সংস্থা ২০২৩ সালেই  এএফডিকে নিশ্চিত ডানপন্থী চরমপন্থী প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সংস্থাটির বক্তব্য ছিল, এই দলের প্রচারে মানবিক অধিকার, মর্যাদা এবং গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

২০২৫ সালে জার্মানির কেন্দ্রীয় সংবিধান সুরক্ষা সংস্থাও এএফডিকে একই তকমা দিয়েছিল। আইনি লড়াইয়ের জেরে সেই কেন্দ্রীয় মূল্যায়নের স্বতঃসিদ্ধ উল্লেখ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। কিন্তু স্যাক্সনি-আনহাল্টের রাজ্য শাখার ক্ষেত্রে চরমপন্থী তকমা এখনও বহাল।

অর্থাৎ এএফডি অতি-ডানপন্থী, এই কথাটা কোনও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ছুড়ে দেওয়া তকমা নয়। জার্মানির নিজস্ব সাংবিধানিক নিরাপত্তা কাঠামোই দলটিকে এই জায়গায় রেখেছে।

দল ক্ষমতায় এলে ঠিক কী বদলাবে

এএফডির ইশতেহারের কেন্দ্রে রয়েছে অভিবাসন এবং পুনর্প্রত্যাবাসন। ক্ষমতায় এলে বহিরাগতদের দ্রুত নির্বাসনের জন্য রাজ্যস্তরে বিশেষ ব্যবস্থা তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা। বিদেশি শ্রমিকের উপর নির্ভরতা কমিয়ে জার্মান পরিবারের সন্তানধারণে উৎসাহ দেওয়ার নীতিও রয়েছে ইশতেহারে।

শিক্ষা ও সংস্কৃতিতেও বড় বদলের প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। শরণার্থী শিশুদের আলাদা শ্রেণিতে পড়ানো, প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারার স্কুল থেকে সরিয়ে দেওয়া, স্কুলে রামধনু পতাকা নিষিদ্ধ করা, জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাসের পাঠ্যক্রম বদলানো, এমন নানা প্রস্তাব রয়েছে তাদের কর্মসূচিতে।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও নিশানায় পড়েছে, ডেসাউয়ের বিখ্যাত বাউহাউস (Bauhaus) স্থাপত্য আন্দোলন। দলের দাবি, রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিচয় বাউহাউসের বদলে আরও ঐতিহ্যবাহী জার্মান সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হোক। ১৯৩৩ সালে নাৎসিরাও বাউহাউস বন্ধ করে দিয়েছিল, ইতিহাসের এই সাদৃশ্য অস্বস্তিকর ঠিকই, কিন্তু তার মানেই এএফডি আজকের নাৎসি পার্টি হয়ে যায় না।

ভোটাররা পক্ষে কেন

জার্মানরা রাতারাতি উগ্র হয়ে গিয়েছেন, এমন সরল উত্তরে বাস্তবতাকে ছোট করে দেখা হবে।

ভোটের আগে সমীক্ষায় বারবার উঠে এসেছিল তিনটি বিষয়, অভিবাসন, শিক্ষা এবং অর্থনীতি। রাজ্য প্রশাসনের কাজেও মানুষ যথেষ্ট অসন্তুষ্ট ছিলেন। জুলাই-আগস্টেই এএফডির সমর্থন পৌঁছে গিয়েছিল ৪১-৪২ শতাংশে। অর্থাৎ ভোটের দিনের ফল কোনও আকস্মিক বিস্ফোরণ নয়, মাসের পর মাস ধরে তৈরি হওয়া প্রবণতার পরিণতি।

তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অর্থনৈতিক অস্বস্তি। পরপর দু’বছর সংকোচনের পরে ২০২৫ সালে জার্মান অর্থনীতি বেড়েছে সামান্যই। বিনিয়োগ দুর্বল, রপ্তানিতে চাপ, শিল্পক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা। অর্থনীতি একেবারে ভেঙে পড়েনি ঠিকই, কিন্তু মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়েছে গভীর ভাবে।

আর ঠিক এই জায়গাতেই কাজ করে জনপ্রিয় কট্টরবাদী রাজনীতির ভাষা। বার্লিন কথা শুনছে না, পুরনো দলগুলো ব্যর্থ, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে, এই সরাসরি বার্তা জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে ভোটারের কাছে অনেক সহজে পৌঁছয়।

পূর্ব জার্মানির পুরনো ক্ষত

স্যাক্সনি-আনহাল্ট ছিল পূর্ব জার্মানির অংশ। বার্লিন প্রাচীর ভাঙার প্রায় চার দশক পরেও আয়, সম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে পূর্ব জার্মানির বহু অঞ্চলে অসন্তোষ রয়ে গিয়েছে।

তার সঙ্গে রয়েছে রাশিয়া নিয়ে আলাদা মনোভাব। পূর্ব জার্মানির বহু মানুষের স্মৃতিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরবর্তী রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পশ্চিম জার্মানির তুলনায় অন্য রকম। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং রাশিয়ার উপর জার্মানির কঠোর অবস্থান নিয়েও তাই এখানে ভিন্ন সুর শোনা যায়। এএফডি সেই পুরনো ক্ষোভকেই রাজনৈতিক ভাষা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ভারতের কাছেও এমন বিষয় অপরিচিত নয়। কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গ থেকে বহু পড়ুয়া এবং তথ্যপ্রযুক্তি পেশাদার প্রতি বছর পড়াশোনা বা চাকরির জন্য জার্মানি যান। রাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভিবাসন-নীতির কড়াকড়ি তাই তাঁদের ভিসা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার উপরেও প্রভাব ফেলতে পারে।

৪৩.৮ শতাংশ ভোট

এএফডি সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও সরকার গঠনের রাস্তা এখনও কঠিন। সিডিইউ, সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, গ্রিনস এবং লেফট, প্রায় সব দলই আফডির সঙ্গে জোট না করার কথা জানিয়ে দিয়েছে। জার্মান রাজনীতিতে এই নীতি পরিচিত ফায়ারওয়াল বা ব্রান্ডমাউয়ার (Brandmauer) নামে।

তবে ৪৩.৮ শতাংশ ভোট পাওয়ার অর্থ, এই ফায়ারওয়াল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক চাপের মুখে। এএফডির জাতীয় নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই সিডিইউয়ের দিকে হাত বাড়িয়েছে, যুক্তি দিচ্ছে ভোটারদের এত বড় রায়ের পরে সহযোগিতার রাস্তা খোঁজাই উচিত। আগামী কয়েক সপ্তাহ তাই জার্মান রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে চলেছে।

ইতিহাসের প্রশ্ন

নাৎসিদের উত্থানের সময় জার্মানিতে ছিল গভীর অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার পতন। হিটলারকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে মূলধারার রাজনীতির যে আত্মবিশ্বাস ছিল, তা শেষ পর্যন্ত মারাত্মক ভুল প্রমাণিত হয়েছিল।

আজকের জার্মানিতে সেই পরিস্থিতি নেই। রয়েছে শক্তিশালী সাংবিধানিক আদালত, স্বাধীন নাগরিক সমাজ এবং নাৎসি অতীত সম্পর্কে গভীর ঐতিহাসিক সচেতনতা।তবু বিপদের জায়গাটা অন্যত্র। গণতন্ত্র শুধু ভোটের বাক্স নয়। সংখ্যালঘুর অধিকার, আইনের শাসন, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, সব মিলিয়েই তৈরি হয় গণতন্ত্র।

এএফডির ৪৩.৮ শতাংশ ভোটকে হিটলার ফের ফিরে এসেছেন বলে দাগিয়ে দিলে ইতিহাসের অপমান হয়। আবার এই দলকে নিছক আর পাঁচটা রক্ষণশীল দলের মতো বললেও বাস্তবতা অস্বীকার করা হয়। সত্যিটা সম্ভবত এই দুইয়ের মাঝখানেই, এবং সেটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর।

জার্মানির সামনে তাই আসল প্রশ্নটা হিটলার ফিরছেন কিনা নয়। প্রশ্নটা এই যে, অতি-ডানপন্থা যখন রাষ্ট্রক্ষমতার এত কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে, তখন জার্মান গণতন্ত্র তাকে কতটা প্রতিরোধ করবে!

স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলে সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। তবে আর একটা ভয়ঙ্কর লড়াইয়ের শুরুটা হয়ে গিয়েছে।