• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 8 October, 2026

কবিতার ক্যানভাসে মেরিলিন মনরো থেকে ট্রয়ের হেলেন: সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কারসন

আলেকজান্ডার সোলঝেনিৎসিন, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে কিংবা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতো কিংবদন্তিদের পাশে এবার নিজের নাম খোদাই করে নিলেন ৭৬ বছর বয়সি এই লেখিকা।

কবিতার ক্যানভাসে মেরিলিন মনরো থেকে ট্রয়ের হেলেন: সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কারসন

Anne Carson, Canadian author, wins Nobel Prize for literature (Image: X/@NobelPrize)

ধ্রুপদী সাহিত্যের শিকড় আর সমকালীন আধুনিক মনস্তত্ত্বকে এক সুতোয় বেঁধে সাহিত্যের সীমানার বিনির্মাণ করেছেন তিনি। তাঁর ব্যতিক্রমী কলমে প্রাচীন গ্রিক পুরাণের চরিত্ররা কথা বলে আজকের সময়ের জটিল ভাষায়। সেই অনন্য সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার (Nobel Prize in Literature) জিতে নিলেন কানাডার বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন (Anne Carson)। বৃহস্পতিবার সুইডিশ অ্যাকাডেমির (Swedish Academy) তরফে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা হয়। পুরস্কারের অর্থমূল্য হিসেবে তিনি পাবেন এক কোটি ২০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায়  ১১ কোটি ৫৮ লক্ষ টাকা।

সুইডিশ অ্যাকাডেমির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রাচীন ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে এক কৌতুকপূর্ণ অথচ গভীর সংলাপ রচনার মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যে নতুন আঙ্গিক ও রূপ নির্মাণের সাহসী অবদানের জন্যই তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হল।

কেন অনন্য অ্যান কারসন?

 বিশ্ব সাহিত্যের আঙিনায় অ্যান কারসন কেবল এক জন কবি নন, তিনি সাহিত্যের চেনা ব্যাকরণ ভাঙার এক নির্ভীক শিল্পী। ১৯৫০ সালে কানাডার অন্টারিওতে জন্ম নেওয়া কারসন পেশাগত জীবনে এক জন ধ্রুপদী বিদ্যার গবেষক ও অধ্যাপক (classicist)। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, বিশেষ করে ইউরিপিদিস ও স্যাফোর লেখার অনুবাদে তাঁর দখল প্রশ্নাতীত। কিন্তু প্রাচীন পাঠ্যকে তিনি নিছক অনুবাদের খাঁচায় বন্দি রাখেননি, বরং টেনে এনেছেন বর্তমানের আলো-আঁধারিতে।

তাঁর সৃষ্টির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল লেখার ধরন বা গোত্র বা ধারার সীমারেখা মুছে দেওয়া (genre-defying)। কারসনের লেখায় একই সঙ্গে মিশে যায় পদ্য, গদ্য, নাটকের সংলাপ, দার্শনিক প্রবন্ধ এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’ (Autobiography of Red)-এর কথাই ধরা যাক। গ্রিক মিথের লাল ডানাওয়ালা দানব গেরিয়নের কাহিনিকে তিনি রূপ দিয়েছিলেন এক আধুনিক যুবকের আত্মআবিষ্কারের কাব্যোপন্যাসে (verse novel)। পৌরাণিক আখ্যান যে ভাবে সমকালীন অস্তিত্বের যন্ত্রণার রূপক হয়ে উঠেছিল, তা গোটা বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।

একই ভাবে ২০১৯ সালের ‘নর্মা জিন বেকার অফ ট্রয়’ (Norma Jeane Baker of Troy) নাট্য-আলেখ্যে তিনি হলিউড তারকা মেরিলিন মনরো এবং ট্রয়ের হেলেনের জীবনগাথাকে এক বিন্দুতে মিলিয়ে দেন। খ্যাতি, যৌবন, কামনা এবং নারীজীবনের ট্র্যাজেডি নিয়ে এমন চমকপ্রদ নিরীক্ষা আধুনিক সাহিত্যে বিরল।

নোবেল অ্যাকাডেমির মূল্যায়ন

সাহিত্যে নোবেল নিয়ে বিতর্ক ও চর্চা নতুন নয়। পদক কখনও গিয়ে পড়ে বব ডিলানের মতো পপ সঙ্গীতের কোনও গীতিকারের ঝুলিতে, কখনও বা হান কাঙের মতো এমন লেখকের হাতে যাঁর সঙ্গে মূলধারার পাঠকের পরিচয় ক্ষীণ। তবে অ্যান কারসনের ক্ষেত্রে বোদ্ধারা একমত যে, তিনি অ্যাকাডেমির মানদণ্ডকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলেন।

নোবেল কমিটির পর্যবেক্ষকদের মতে, কবিতা যে নিছক ছন্দবদ্ধ পঙ্‌ক্তিমালা নয়, তা যে মহাকাব্যিক গদ্য এবং আধুনিক মনস্তত্ত্বের ধারক হতে পারে, কারসনের কাজ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তিনি একাধারে অপেরার লিব্রেটো (opera libretti) লিখেছেন, সাহিত্য সমালোচনা করেছেন, আবার নাটকের রূপান্তর ঘটিয়েছেন। শব্দের পরিমিতিবোধ এবং বৌদ্ধিক গভীরতাই তাঁকে আধুনিক সাহিত্যের এক অন্যতম বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর করে তুলেছে।

এবং অ্যালিস মুনরো

 কানাডার সাহিত্য ইতিহাসে কারসনের এই জয় এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। এর আগে ২০১৩ সালে কানাডার ছোটগল্পকার অ্যালিস মুনরো সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন। দীর্ঘ ১৩ বছর পর ফের এক কানাডীয় লেখকের হাতে উঠল এই বিশ্বসেরা সম্মান।

আলেকজান্ডার সোলঝেনিৎসিন, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে কিংবা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতো কিংবদন্তিদের পাশে এবার নিজের নাম খোদাই করে নিলেন ৭৬ বছর বয়সি এই লেখিকা। প্রথাগত রোম্যান্টিসিজমকে দূরে সরিয়ে সাহিত্যের প্রচলিত সংজ্ঞাকে যিনি প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন, তাঁর এই নোবেল প্রাপ্তি আসলে সাহিত্যের সৃজনশীল স্বাধীনতারই এক পরম স্বীকৃতি।