প্রায় এগারো বছর পর নতুন বেতন কাঠামোর দোরগোড়ায় বাংলাদেশ। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের (National Pay Commission) সুপারিশ অনুযায়ী সে দেশের সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন বাড়তে পারে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। তবে সব গ্রেডে সমান হারে বাড়বে না এই বেতন, সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন নিচের সারির কর্মীরা। সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা কমিটির শেষ বৈঠকের পরে বিষয়টি একেবারে চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছেছে বলেই খবর।
ঠিক কী প্রস্তাব
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন তেইশ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। বর্তমান কুড়িটি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে সেখানে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সিনিয়র সচিবদের জন্য আলাদা একটি স্তরও তৈরি হচ্ছে বিদ্যমান কুড়িটি গ্রেডের বাইরে। বৈশাখী ভাতা বর্তমান ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাবও রয়েছে সুপারিশে।
বাস্তবায়নের জট কোথায়
কমিশনের পুরো সুপারিশ কার্যকর করতে বছরে বাড়তি প্রায় ১ লক্ষ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন, যা নিয়ে চিন্তিত অর্থ মন্ত্রণালয়। তাই মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত দশ সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি মূল সুপারিশের একাংশ ছেঁটে খরচ প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছে। সোমবারের বৈঠকে ঠিক হয়েছে, আইবাস (iBAS) নামের অনলাইন বেতন নির্ধারণী পদ্ধতিতে জটিলতা এড়াতে মূল বেতন দুই ধাপে না দিয়ে একেবারেই কার্যকর করা হবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে, যদিও কমিশনের সুপারিশ করা হারের চেয়ে তা কিছুটা কম হতে পারে। ভাতা যুক্ত হবে পরের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৭-২৮ সাল থেকে। কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিসভায় উঠবে, তারপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে জারি হবে গেজেট।
পেনশনভোগীদের জন্য কী থাকছে
শুধু কর্মরত কর্মচারী নন, নজর রাখা হয়েছে পেনশনভোগীদের দিকেও। মাসিক পেনশন ২০ হাজার টাকার কম হলে বৃদ্ধি হতে পারে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত, ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে থাকলে ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি হলে ৫৫ শতাংশ। বয়স অনুযায়ী চিকিৎসা ভাতাও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে সুপারিশে, পঁচাত্তরোর্ধ্ব পেনশনভোগীদের জন্য মাসে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
এ পার বাংলার ছবিটা উলটো
ওপার বাংলায় যখন নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের শেষ ধাপে, এ পার বাংলায় গল্পটা তখন সবে শুরুর মুখে। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীরা এখনও ষষ্ঠ বেতন কমিশনের (Sixth Pay Commission) আওতায় বেতন পান, যার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে গত ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫-এই। ভোটের আগে বিজেপির প্রতিশ্রুতি ছিল, সরকার গঠনের ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন এবং ছয় মাসের মধ্যে অষ্টম বেতন কমিশন গঠন করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মন্ত্রিসভা সেই প্রতিশ্রুতি রেখে গত ১৮ মে আনুষ্ঠানিকভাবে সপ্তম রাজ্য বেতন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।
ফারাক কোথায়
দুই বাংলার সরকারি কর্মচারীরাই প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষায় ছিলেন নতুন বেতন কাঠামোর জন্য, কিন্তু দুই জায়গায় প্রক্রিয়ার গতি একরকম নয়। বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার আসার পর বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে, নির্দিষ্ট শতাংশ ও সময়সীমা নিয়ে এখন কেবল মন্ত্রিসভার সিলমোহরের অপেক্ষা। পশ্চিমবঙ্গে উলটো দিকে, রাজ্যে সরকার বদলের পর সবে কমিশন গঠিত হয়েছে, বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত হার এবং রূপায়ণের সময়সীমা নিয়ে বিস্তারিত সুপারিশ এখনও আসেনি। দুই ক্ষেত্রেই অবশ্য একটি বিষয় মিলে যাচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমিত করতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনই হয়ে উঠেছে বেতন কাঠামো সংস্কারের আসল অনুঘটক।




