মহাকাশ থেকে ধেয়ে আসা একটা উল্কা আসলে ভিনগ্রহী প্রাণীর ছদ্মবেশী মহাকাশযান, এমন তত্ত্ব একবার দিয়েছিলেন যে বিজ্ঞানী, তাঁর হাতেই এখন দেওয়া হচ্ছে আমেরিকার সবচেয়ে স্পর্শকাতর এক নিরাপত্তা প্রশ্নের ভার। হার্ভার্ডের (Harvard) মহাজাগতিক পদার্থবিদ ড. অভি লোয়েব (Avi Loeb) এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) খতিয়ে দেখবেন দেশের আকাশে ঘুরে বেড়ানো রহস্যময় বস্তু (UFO)আসলে কী। UFO সংক্রান্ত বিষয়কে এখন সরকারি ভাষায় বলা হচ্ছে, আনআইডেন্টিফায়েড অ্যানোম্যালাস ফেনোমেনা বা ইউএপি (UAP)।আর সেই তদন্তের গোটা বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বভার এখন বিকর্তিত এই ড. লেয়েবের কাঁধে।
কে এই অভি লোয়েব, কেন এত বিতর্ক
লোয়েব ইজরায়েলি-মার্কিন বংশোদ্ভূত অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট। তিনি দীর্ঘদিন হার্ভার্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ছিলেন। তাঁর পরিচিতি মূলত ব্ল্যাক হোল নিয়ে গবেষণার জন্য, কিন্তু আলোচনায় এসেছেন এলিয়েন নিয়ে সাহসী দাবির জন্য। ২০১৪ সালে পাপুয়া নিউ গিনির (Papua New Guinea) কাছে সমুদ্রে পড়া একটি উল্কা নিয়ে তিনি এমনকি অভিযানও চালিয়েছিলেন। প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশ থেকে তুলে আনা ধাতব গোলকগুলিকে ভিনগ্রহী প্রযুক্তির অংশ বলে দাবি করেছিলেন তিনি। যদিও অন্য বিজ্ঞানীদের বড় অংশের মত, সেগুলি আদতে আগ্নেয়শিলা বা পোড়া কয়লা ছাড়া কিছু নয়।
হোয়াইট হাউস, পেন্টাগনের এএআরও (AARO) দপ্তর, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ওডিএনআই (ODNI) এবং এফবিআই (FBI) মিলিত ভাবে লোয়েবকে দায়িত্ব দিয়েছে ইউএপি সায়েন্স অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল (UAP Science Advisory Council) নামের এই নতুন প্যানেল গঠনের, উদ্দেশ্য ট্রাম্প প্রশাসনের ইউএপি-স্বচ্ছতা নীতিকে বৈজ্ঞানিক মান্যতা দেওয়া। লোয়েব নিজে অবশ্য প্রথমেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি এটা ধরে নিয়েই কাজ শুরু করছেন যে, বেশিরভাগ ইউএপি আসলে মানুষেরই তৈরি প্রযুক্তি এবং বিষয়টাকে জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হচ্ছে।
প্যানেলে কারা, রেকর্ড কী বলছে
শুরুতে সংখ্যাটা ছিল কম, পরে ধাপে ধাপে বেড়ে দাঁড়ায় ১১ জনে, অথচ কোনও মার্কিন সরকারি সংস্থা আজও আনুষ্ঠানিক ভাবে এই কাউন্সিলের অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। তালিকায় আছেন নৌসেনার অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল টিমোথি গ্যালোডেট (Timothy Gallaudet), যিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন এলিয়েন-নিয়ন্ত্রিত যান পৃথিবীতে এসেছে বলে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, এমনকি ভেঙে পড়া যান উদ্ধারের দাবিও করেছেন তিনি অতীতে। আছেন বিলিয়নেয়ার উদ্যোগপতি বেন ল্যাম (Ben Lamm), যিনি ডোডো পাখি বা ডায়ার উলফের মতো বিলুপ্ত প্রাণী পুনরুজ্জীবনের সংস্থা চালান এবং আগে উপগ্রহ দিয়ে ইউএফও খোঁজার চেষ্টাও করেছেন। এ ছাড়া আছেন পরিসংখ্যানবিদ লিবার্টি ভিটার্ট কাপিটো, স্ট্যানফোর্ডের অণুজীববিজ্ঞানী গ্যারি নোলান, নৃতত্ত্ববিদ পিটার স্কাফিশ, এবং সন্দেহবাদী গবেষক মাইকেল শেরমার, যিনি নিজে পেশাগত ভাবে অতিপ্রাকৃত দাবির খুঁটিনাটি যাচাই করার জন্য পরিচিত।
তবে সমালোচকদের চোখ এড়ায়নি একটা পরিসংখ্যান। এগারো সদস্যের মধ্যে অন্তত পাঁচ জনের বিশেষত্ব মনস্তত্ত্ব, নৃতত্ত্ব বা জনসংযোগে, বস্তু বিশ্লেষণে নয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে কাউন্সিলের আসল লক্ষ্য কি বস্তুর রহস্যভেদ, নাকি জনমত নির্মাণ বা বিনর্মাণ। পেন্টাগনের প্রাক্তন ইউএপি তদন্তকারী পদার্থবিদ শন কার্কপ্যাট্রিক (Sean Kirkpatrick) সরাসরি বলেছেন, বিজ্ঞানী মহলে লোয়েবের গ্রহণযোগ্যতা কম এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতাও সীমিত, দলের গঠন দেখেই স্পষ্ট হোয়াইট হাউসের ঝোঁক প্রথাগত বিজ্ঞানের চেয়ে চমকপ্রদ তত্ত্বের দিকে বেশি।
পেন্টাগনের নথিতে নতুন কী মিলল
চলতি বছরে এই নিয়ে তিন দফায় ইউএফও সংক্রান্ত নথি প্রকাশ্যে এনেছে পেন্টাগন। সর্বশেষ প্রতিবেদনটি ৫ জুন স্বাক্ষর করেন এএআরও-র অধিকর্তা জন কসলোস্কি। যাতে উল্লেখ আছে ২০২৩ সালের অক্টোবরে দু’দিন ধরে আকাশে একটি কমলা রঙের বড় গোলক থেকে ছোট ছোট লাল গোলক বেরিয়ে আসার ঘটনার কথা। আর রিপোর্ট এটাও বলছে যে, এমন প্রায় চল্লিশ শতাংশ ঘটনার এখনও কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি। এই নথি ফাঁসের পরেই ওডিএনআই-এর তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে একটি পৃথক ইউএপি গভর্ন্যান্স বোর্ডও, যেটি জুন মাসেই প্রথম বৈঠকে বসেছে এবং লোয়েবের দলের পাশাপাশি আরও কয়েকটি উপদেষ্টা গোষ্ঠীর সহায়তা পাচ্ছে। কংগ্রেসের একাংশ, বিশেষত কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্য এ বিষয়ে আরও বেশি স্বচ্ছতার দাবি তুলছেন। যদিও পেন্টাগনের নিজস্ব তদন্তকারী দপ্তর এখনও পর্যন্ত এলিয়েন-অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ পায়নি বলেই জানিয়েছে।
লোয়েব নিজে অবশ্য আশাবাদী। তাঁর কথায়, ট্রাম্পের নির্দেশের পর সরকারি মহলে দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে, এখন সন্দেহের বদলে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। আর সরকার সত্যিই যা জানে তা লুকিয়ে রাখছে বলে যে সন্দেহ বহুদিন ধরে বহমান, তা একসময় মুছে যাবে বলে তাঁর আশা।
জনমত ও সাধারণ মানুষের আগ্রহ
সম্প্রতি একটি সিবিএস নিউজ/ইউগভ (CBS News/YouGov) সমীক্ষা বলছে, প্রতি দশজনের মধ্যে আটজন আমেরিকান মনে করেন সরকার ভিনগ্রহী প্রাণী নিয়ে যা জানায়, তার চেয়ে ঢের বেশি জানে। ৬৩ শতাংশ মনে করেন, অন্য গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আছে। আর প্রতি পাঁচজনের একজনেরও বেশি মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস, এলিয়েনরা ইতিমধ্যেই পৃথিবীতে এসে পড়েছে। এমন বিপুল জনআগ্রহকেই কাজে লাগাতে চাইছে ওয়াশিংটন, বিজ্ঞান হোক বা চমক, ফলাফল যাই আসুক না কেন।
বাঙালির এলিয়েন-যোগ, স্পিলবার্গের ঋণ সত্যজিতের কাছে
এই গোটা বিতর্কের সঙ্গে বাঙালির যোগ কিন্তু নেহাত কম নয়। ১৯৬২ সালে সন্দেশ পত্রিকার জন্য সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন জ্ঞান-কল্পকাহিনি ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’, যেখানে প্রথমবার ভিনগ্রহী চরিত্রকে ভয়ঙ্কর নয়, বরং সরল ও কৌতুকপ্রিয় বন্ধু হিসেবে দেখানো হয়েছিল। সেই গল্প থেকেই ১৯৬৭ সালে রায় নিজে তৈরি করেছিলেন ‘দ্য এলিয়েন’ চিত্রনাট্য, যা কলম্বিয়া পিকচার্স প্রায় তৈরি করতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত বাতিল করে দেয়। বছর পনেরো পর স্টিভেন স্পিলবার্গ (Steven Spielberg) তৈরি করেন ‘ই.টি.’ (E.T. the Extra-Terrestrial), আর সেই মিল নজর এড়ায়নি খোদ সত্যজিতেরও। তিনি প্রকাশ্যেই দাবি করেছিলেন, তাঁর চিত্রনাট্যের কপি বহু বছর আমেরিকা জুড়ে ঘোরাফেরা না করলে E.T-র মতো ছবি তৈরিই সম্ভব হত না। যদিও স্পিলবার্গ সবসময় সে অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। পাশাপাশি কাকতালীয় হলেও সত্যি, পেন্টাগনের তিন নম্বর নথি-প্রকাশের দিনেই স্পিলবার্গ প্রকাশ্যে এনেছেন তাঁর নতুন তথ্যচিত্র ‘ডিসক্লোজার ডে’ (Disclosure Day)। ভিনগ্রহী নিয়ে হলিউড আর বাংলার এই সম্পর্ক যেন প্রমাণ করে, এলিয়েন-কৌতূহল কোনও নতুন আমদানি নয়, বাঙালির কল্পনায় তার শিকড় অনেক পুরনো।এখন ট্রাম্পের এলিয়েন-কমিটি কোন চমক দেয় সেটাই দেখার।




