ক্রিকেট-দর্শনই বদলে গিয়েছে ভারতের টি-২০ বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম নায়ক সঞ্জু স্যামসনের। জাতীয় দলে জায়গা পাওয়া বা হারানোর চাপ, সমালোচনা কিংবা অন্যের প্রত্যাশা— সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে এখন তিনি নিজের শর্তেই ক্রিকেট খেলতে চান। আর সেই মানসিকতার পরিবর্তনই তাঁকে টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের সর্বোচ্চ স্কোরার এবং টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটারের সম্মান এনে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
জিওস্টারের অনুষ্ঠান ‘বিলিভ’-এ নিজের ক্রিকেটজীবনের মোড় ঘোরানো মুহূর্তগুলির কথা বলতে গিয়ে সঞ্জু বলেছেন, ‘এবছর টি-২০ বিশ্বকাপের আগে আমি বুঝেছিলাম, আমাদের দেশে সব সময় একটা ইঁদুর দৌড় চলতে থাকে। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, আমি আর এই দৌড়ে থাকব না। আমি শুধু ক্রিকেটটা উপভোগ করতে চাই’।
এর পরই নিজের মানসিকতার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের কথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন তিনি। বলেন, ‘ঈশ্বরের কৃপায় আমি অনেক কিছু অর্জন করেছি। এখন আমার বয়স ৩১। আরও কয়েক বছর ক্রিকেট খেলতে চাই। তাই ঠিক করেছি, নিজের শর্তেই খেলব। কীভাবে ব্যাট করব বা কী করব, সেটা কেউ আমাকে বলে দেবে না। সঞ্জুর সিদ্ধান্ত নেবে সঞ্জুই’।
বিশ্বকাপের আগে ভারতের টি-২০ দলে ইশান কিষাণেরও পিছনে চলে গিয়েছিলেন সঞ্জু। কিন্তু দল নির্বাচন নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে নিজের খেলায় মন দেন। সেই সিদ্ধান্তই তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে কার্যত ‘ডু অর ডাই’ ম্যাচে অপরাজিত ৯৭ রানের ইনিংস খেলে শুরু করেন প্রত্যাবর্তন। এর পর সেমিফাইনাল থেকে ফাইনাল— টানা বড় ইনিংস খেলে ভারতকে বিশ্বকাপ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন সঞ্জু।
এই সাক্ষাৎকারে বিরাট কোহলির কাছ থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শের কথাও তুলে ধরেছেন সঞ্জু। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিরাট ভাই খুব স্পষ্ট কথা বলেন। ভারতীয় দলের এক শিবিরে আমরা একসঙ্গে জিম করছিলাম। আমি ওঁকে বলেছিলাম, ‘পা-জি, আমাকেও কিছু বলো।’ তখন উনি বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সফল হতে গেলে জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে হবে। কী খেলে শরীর দ্রুত সেরে ওঠে, কী খাওয়া উচিত নয়— সব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। প্রায় দেড় বছর ওঁর পরামর্শ মেনে চলেছিলাম। সেই সময় ফিটনেস ও শৃঙ্খলা সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গিয়েছিল’।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে জোফ্রা আর্চারের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের স্মৃতিও ভাগ করে নিয়েছেন কেরলের এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটার। বলেন, ‘অনেকে আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল, আর্চার আগেও আমাকে বারবার আউট করেছে। কিন্তু আমি জানতাম, এক বছর আগের সঞ্জু আর আজকের সঞ্জু এক নয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের পর নিজের উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। আমার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। আমি জানতাম, দেশের জন্য আমাকে এটা করতেই হবে’।
বিশ্বকাপ ফাইনালে নিজের দায়িত্ব নিয়েও মুখ খুলেছেন তিনি। ‘একটা বিষয় শিখেছি, ফর্মকে সবসময় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কিন্তু ফাইনালে আমি অনুভব করছিলাম, দলের হয়ে রান করার দায়িত্বটা আমার কাঁধেই। নিজেকে বারবার বলছিলাম— ‘সঞ্জু, শেষ পর্যন্ত ক্রিজে থাকতে হবে। দেশের জন্য ম্যাচটা শেষ করে আসতে হবে।’ এই ভাবনাই আমাকে ইনিংস জুড়ে মনোযোগী রেখেছিল’।
সমালোচনা, বাদ পড়া কিংবা নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত— সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে নিজের ক্রিকেট উপভোগ করার যে দর্শন সঞ্জু স্যামসন গ্রহণ করেছেন, সেটাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে এনে দিয়েছে কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। আর তাঁর কথাতেই স্পষ্ট, এখন আর তিনি কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেই। তিনি শুধু নিজের সেরা সংস্করণ হয়ে ওঠার লড়াই চালিয়ে যেতে চান।




