সব প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই দিলেন ব্যাট হাতে। ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা, অবসর নিয়ে গুঞ্জন, নির্বাচকদের পরিকল্পনা— সব কিছুর মাঝেই লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠে দুরন্ত শতরান করলেন রোহিত শর্মা। কিন্তু অধিনায়কের লড়াকু ইনিংসও ভারতের সিরিজ বাঁচাতে পারল না। রুদ্ধশ্বাস তৃতীয় একদিনের ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ২৭ রানে হেরে ১-২ ব্যবধানে সিরিজ খোয়াল শুভমন গিলের দল।
৩৮৮ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই আগ্রাসী মেজাজে ছিলেন রোহিত। শুভমন গিলকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম উইকেটে ১৪৭ রানের পার্টনারশিপ গড়ে ভারতের জয়ের ভিত তৈরি করেন তিনি। ১১০ বলে ১৩৮ রানের অনবদ্য ইনিংসে ছিল ১৭টি চার ও পাঁচটি ছক্কা। এ ছাড়া শুভমন করেন ৭৭ এবং বিরাট কোহলি ৭৪ রান। কিন্তু এত কিছুর পরেও ভারত ৫০ ওভারে ৩৬০/৭-এর বেশি তুলতে পারেনি।
এই নিয়ে আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডে তিনটি সিরিজের সবকটিতেই হেরে দেশে ফিরছে ভারতীয় দল। আয়ারল্যান্ডে দুই ম্যাচের সিরিজ ০-২-এ হারে তারা। ইংল্যান্ডে এসে পাঁচ ম্যাচের টি-২০ সিরিজও ০-৪-এ খোয়াতে হয় তাদের (প্রথম ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে গিয়েছিল) ও শেষে ওয়ান ডে সিরিজও ১-২-এ হার। অর্থাৎ, দশটির মধ্যে মাত্র একটিতে জিততে পেরেছে ভারত। এই পারফরম্যান্স নিয়ে ২০২৭ ওয়ান ডে বিশ্বকাপে তারা কত দূর এগোতে পারবে, এখন এই নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
দল জিততে না পারলেও রবিবারের সেঞ্চুরি রোহিতের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। গত কয়েক দিন ধরেই তাঁর ওয়ান ডে ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা চলছিল। এমনকী, এটিই তাঁর শেষ একদিনের ম্যাচ হতে পারে বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সেই চাপের মধ্যেই লর্ডসে নিজের ৩৪তম ওয়ান ডে সেঞ্চুরি করেন রোহিত।
উল্লেখযোগ্যভাবে, লর্ডসে কোনও ভারতীয় ব্যাটারের এটিই প্রথম ওডিআই শতরান। সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেও গ্যালারির উল্লাস বা হাততালিতেও বিশেষ সাড়া দেননি রোহিত। যেন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল দলকে জেতানো।
এই ম্যাচের আগে রোহিতের অবসর নিয়ে জল্পনা প্রসঙ্গে অধিনায়ক শুভমন গিল বলেন, ‘আমাদের মধ্যে এ নিয়ে কোনও কথাই হয়নি। ও আমাদের কিছুই জানায়নি। এমন কোনও বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনও আলোচনা হয়নি। যা কিছু হচ্ছে, সবই সংবাদমাধ্যমে’।
এর আগে টস জিতে ব্যাট করে ইংল্যান্ড তোলে ৩৮৭/৩। ভারতের বোলারদের উপর শুরু থেকেই চড়াও হন ওপেনার বেন ডাকেট। ১৩৫ বলে ১৪২ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে লর্ডসে একদিনের ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের নতুন রেকর্ড গড়েন তিনি। জ্যাকব বেথেল করেন ৯১। পরে জো রুট অপরাজিত ৭৪ এবং জস বাটলারের মাত্র ১৩ বলে অপরাজিত ৪১ রানের ঝোড়ো ইনিংসে শেষ পাঁচ ওভারে ৮২ রান তোলে ইংল্যান্ড, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
ভারতের রানতাড়ায় রোহিত-শুভমনের জুটি ভাঙার পর ম্যাচে ফেরে ইংল্যান্ড। জ্যাকব বেথেল রোহিতকে ফিরিয়ে বড় ধাক্কা দেন। এর পর স্যাম কারানের দুরন্ত স্পেলে ভারতের আশা প্রায় শেষ হয়ে যায়। চার উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডকে জয় এনে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত কোহলির লড়াইও ব্যবধান কমাতে পারেনি।
ম্যাচ শেষে ভারত অধিনায়ক শুভমন গিলও স্বীকার করেন, ইংল্যান্ডের ইনিংসের শেষ দিকে অতিরিক্ত রান দিয়ে ফেলাই পরাজয়ের অন্যতম কারণ। তাঁর কথায়, শেষ কয়েক ওভারে বোলাররা রান আটকে রাখতে পারলে ম্যাচের ফল অন্য রকমও হতে পারত।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুভমন গিল বলেন, ‘আমার মনে হয়, ৪৫ ওভার পর্যন্ত আমরা ম্যাচে ভাল ভাবেই খেলছিলাম। কিন্তু শেষ তিন ওভারে আমরা অনেক বেশি রান দিয়ে ফেলি। আমার মনে হয়, ওই তিন ওভারেই প্রায় ৬০ রান দিয়ে বসি। সেখানেই ম্যাচটা আমাদের নাগালের বাইরে চলে যায়।
রান তাড়া নিয়ে আমরা আশাবাদী ছিলাম। আমাদের বিশ্বাস ছিল, ৪০ ওভার পর্যন্ত যদি হাতে উইকেট থাকে, তা হলে আমরা ম্যাচে থাকব। তবে একই সঙ্গে আমরা খুব বেশি পিছিয়েও পড়তে চাইনি। তাই পাওয়ারপ্লের পর আমরা নিয়মিত রান তুলতে শুরু করি এবং রানরেট ছয় থেকে সাড়ে ছয়ের মধ্যে রাখার চেষ্টা করি। যদি ওই গতিতে এগোনো যায় এবং শেষ ১০ ওভারে ১০০-১১০ রান তুলতে হয়, তা হলে কী হতে পারে, আগে থেকে বলা যায় না’।
রোহিতের ইনিংসের প্রশংসা করেন গিল। বলেন, ‘আমার মনে হয়, রোহিত ভাই যেভাবে বোলারদের মোকাবিলা করেছে, সেটা ছিল অসাধারণ। ও পুরো সময়টাই খুব শান্ত ছিল। বেশির ভাগ সময় আমি নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে ছিলাম এবং ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, ও একেবারেই চাপ নিচ্ছে না। পাওয়ারপ্লেতে আমরা আলোচনা করছিলাম, আক্রমণাত্মক শট খেলব কি না। কিন্তু আমরা বুঝতে পারছিলাম, নতুন বলে বড় শট খেলা মোটেও সহজ নয়। তারপর যেভাবে ও বোলারদের সামলাল এবং পরে ইনিংসের গতি বাড়াল, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ৬০-৭০ রানের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। সব মিলিয়ে ওর ব্যাটিংয়ে দারুণ স্থিরতা ছিল’।
সিরিজ থেকে ভারত কী ইতিবাচক দিক পেল, সেই প্রশ্নের উত্তরে গিল বলেন, ‘হ্যাঁ, আমার মনে হয় এই সিরিজে প্রায় প্রত্যেক ব্যাটারই রান পেয়েছে। তবে করে এই ম্যাচে আমরা ভাল বোলিং করতে পারিনি, বিশেষ করে পাওয়ারপ্লেতে। পাওয়ারপ্লের পর ইংল্যান্ডের দুই ওপেনার যেভাবে ব্যাট করেছে, তা সত্যিই অসাধারণ। ডেথ ওভারেও ওরা অনেক রান তুলে ফেলে, ফলে ম্যাচটা আমাদের হাতের বাইরে চলে যায়। তবে সব মিলিয়ে সিরিজ থেকে অনেক ইতিবাচক দিকও রয়েছে। দলের প্রায় সবাই রান করেছে, আবার বোলাররাও উইকেট পেয়েছে। এটাই আমাদের কাছে বড় প্রাপ্তি’।




