যে কোনও দিন বিকেলে বা সন্ধ্যার দিকে ধর্মতলার গ্র্যান্ড হোটেলের উল্টোদিকে ময়দান মার্কেটে চলে যান। শুনতে পাবেন অদ্ভুত কিছু ডাক- ‘নিয়ে যান…নিয়ে যান…নিয়ে যান, ব্রাজিল…ব্রাজিল…ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা…আর্জেন্টিনা…আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল…জার্মানি…ইংল্যান্ড…যা চাইবেন নিয়ে যান…আড়াইশো…পাঁচশো…হাজার’। যাঁরা এইসব হাঁকছেন, তাঁদের ঘিরে গিজগিজ করছে তরুণদের দল। রয়েছে তরুণীরাও।
হঠাৎ করে কেউ এসে পড়লে ঘাবড়ে যেতে পারেন, এই ভেবে, এরা কি সব দেশগুলোকে নিলামে বিক্রি করে দিচ্ছে? কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে, এদিক ওদিক তাকিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলেই বুঝতে পারবেন, ফুটপাথের দেওয়ালে, ওপরে হ্যাঙ্গার থেকে ঝুলছে রঙবেরঙের টি-শার্ট বা জার্সি। বিশ্বকাপে যে দলগুলি খেলছে, তাদের বেশিরভাগের জার্সিই পেয়ে যাবেন এই বাজারে।
ফুটপাথে সার দিয়ে একের পর দোকান। যাতে রীতিমতো হট কেকের মতো বিক্রি হচ্ছে এই জার্সি। শুধু কি জার্সি, রয়েছে একাধিক দেশের পতাকাও। অবশ্যই বিশ্বকাপে খেলছে যে সমস্ত দেশ, তাদের পতাকা। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকাই বেশি। কারণ, এই দুই দেশের সমর্থকই যে কলকাতায় বেশি।
কলকাতায় বা দেশের যে কোনও প্রান্তে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল মুখোমুখি হলে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালি যেমন দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়, তেমনই চার বছর অন্তর ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধে যখন দুই লাতিন দেশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা মাঠে নামে, তখনও শুরু হয়ে যায় বাঙালির গৃহযুদ্ধ। একপক্ষ যেখানে সবুজ-হলুদ বাহিনীর সমর্থক, সেখানে অপর পক্ষ গলা ফাটায় আকাশি-সাদা জার্সির সাফল্যের জন্য। এটাই কলকাতা, এটাই কলকাতার ফুটবল এবং সে জন্যই বিখ্যাত সেই গান আজও সুপার হিট- সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল।
একঝাঁক রঙবেরঙের জার্সি দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যেতেই পারে। কিশোর-তরুণের দল আকৃষ্ট হয় এই নানা রঙের পসরা দেখেই। তবে বেশিরভাগেরই পছন্দ সাদা-আকাশি ডোরাকাটা দশ নম্বর জার্সিটি। কারণ, ওই জার্সি পরেই যে মাঠে নামেন ফুটবল দুনিয়ার সেরা তারকা লিওনেল মেসি। এক বিক্রেতা বলেন, ‘আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির চাহিদাই বেশি। বিশেষ করে মেসির জার্সি। অনেকে আবার পর্তুগালের জার্সিও চাইছে। বিশেষ করে রোনাল্ডোর সাত নম্বর জার্সি’।
ফুটপাথের দোকানগুলির পিছনে বিধান মার্কেটের মধ্যে যদি ঢুকে পড়েন, তা হলে দেখবেন আরও রঙের মেলা, বহু দেশের জার্সির পসরা। হয়তো খুঁজলে তিউনিশিয়া বা ইকুয়েডরের জার্সিও পেয়ে যাবেন সেখানে। দোকানে দোকানে বোঝাই করা জার্সি। কলকাতা বা মফস্বলে তৈরি হওয়া আড়াইশো টাকার জার্সি থেকে শুরু করে চিন, থাইল্যান্ড থেকে আসা দেড়-দু’হাজার টাকা দামের জার্সি— আপনার বাজেট অনুযায়ী সবই পেয়ে যাবেন এই বাজারে। ফুটবল বিশ্বকাপের সময় বাজার বেশ সরগরম থাকে।
বিশ্বকাপ নিয়ে এমন উন্মাদনা আর কোনও দেশে দেখা যায় কি? বিশ্বকাপে যারা কখনও খেলেনি, কখনও খেলেনা, আগামী পঞ্চাশ বছরেও খেলার সম্ভাবনা কম, সেই দেশে এমন উন্মাদনা, এত সমর্থন। এ বড়ই বিস্ময়কর।




