• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 19 July, 2026

দুই কোচের মস্তিষ্কের লড়াই: মেসিকে আটকাতে ফুয়েন্তের আগ্রাসী কৌশল, পাল্টা চাল তৈরি স্কালোনিরও

আর্জেন্টিনা অধিনায়কের এই বার্তায় দলের মধ্যে গড়ে ওঠা একতা ও পারিবারিক বন্ধনের ছবিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মেসির ভাষায়, এই দল একটি ‘পরিবার’।

দুই কোচের মস্তিষ্কের লড়াই: মেসিকে আটকাতে ফুয়েন্তের আগ্রাসী কৌশল, পাল্টা চাল তৈরি স্কালোনিরও

Pic-x

বিশ্বকাপের মহাযুদ্ধে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মুখোমুখি লড়াই ঘিরে সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের দুই ভিন্ন ফুটবল-দর্শনের দ্বৈরথের বাইরেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন একজনই—লিওনেল মেসি। নিউ জার্সির মঞ্চে নিজের বর্ণাঢ্য কেরিয়ারে আর একটি বিশ্বকাপ যোগ করে ইতিহাসকে পূর্ণতা দিতে চান আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।

এমন একজন কিংবদন্তিকে থামিয়ে বিশ্বজয় করতে পারবেন লামিন ইয়ামালরা? এটাই এই মুহূর্তে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে দামী প্রশ্ন এবং ঠিক এই প্রশ্নটাই করা হয়েছিল স্প্যানিশ দলের মহাগুরু লুই দে লা ফুয়েন্তেকে।

এই মহারণের আগে তিনি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হতেই স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—লিওনেল মেসিকে কীভাবে থামাবেন?

স্পেনের কোচ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, অতীতে ব্যবহৃত কৌশল বা মেসিকে একজন নির্দিষ্ট ফুটবলার দিয়ে সারাক্ষণ ছায়াসঙ্গীর মতো পাহারা দেওয়ার পথে তিনি হাঁটবেন না। ম্যাচের আগে অনেক বিশেষজ্ঞ এমন কৌশলের পরামর্শ দিলেও স্প্যানিশ কোচের মতে, একমাত্র মেসিকে আলাদা করে আটকানোর চেষ্টা করাই সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে। তাঁর বিশ্বাস, এত বড় ম্যাচে ব্যক্তিগত মার্কিংয়ের বদলে দলগত পরিকল্পনাই হবে সাফল্যের আসল চাবিকাঠি।

‘মেসিকে একজন ফুটবলার একা থামাতে পারবে না। গোটা দলকে একসঙ্গে পরিশ্রম করতে হবে,’ এক সংবাদসংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন দে লা ফুয়েন্তে। তাঁর বিশ্বাস, দলের সম্মিলিত শক্তি এবং রক্ষণভাগের পারস্পরিক বোঝাপড়াই মেসিকে আটকানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

স্পেনের পরিকল্পনা হল, সবাই মিলে জায়গা সংকুচিত করা এবং মাঠের যে সব অঞ্চলে মেসি সবচেয়ে বেশি কার্যকর, সেখানে দ্রুত চাপ সৃষ্টি করা। মূল লক্ষ্য থাকবে, বল যেন সহজে মেসির পায়ে না পৌঁছায়। পাসের রাস্তা বন্ধ করে আর্জেন্টিনাকে অন্য আক্রমণাত্মক বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করাই স্প্যানিশদের কৌশল।

এই কৌশলই প্রমাণ করে, প্রতিপক্ষের দলগত শক্তি সম্পর্কে স্পেনের কোচিং স্টাফ কতটা গভীরভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন এবং স্পেনের ক্রীড়া দৈনিক মার্কা জানিয়েছে, লিওনেল স্কালোনির দলের সাম্প্রতিক ম্যাচগুলি অত্যন্ত খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন দে লা ফুয়েন্তে।

স্পেনের পরিকল্পনা এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের বিপজ্জনক ফুটবলাররা ফাঁকা জায়গায় স্পেনের ডিফেন্ডারদের বিরুদ্ধে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারেন। স্প্যানিশ কোচের বিশ্বাস, মাঝমাঠে তাঁর দলের খেলোয়াড়দের একশো ভাগ মনোনিবেশ এবং শৃঙ্খলাই ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

স্পেনের এই সতর্কবার্তা নজর এড়ায়নি আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমেরও। তাদের মতে, মাঝমাঠে অত্যন্ত শারীরিক লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ‘টিওয়াইসি স্পোর্টস’-এর দাবি, স্কালোনির কোচিং স্টাফ ইতিমধ্যেই এমন কিছু কৌশল নিয়ে কাজ করছে, যাতে মাঝমাঠে মেসির উপর তৈরি হওয়া অতিরিক্ত চাপ কমানো যায়।

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে তাই শুধু দুই দলের লড়াই নয়, দেখা যাবে দুই কোচের কৌশলেরও টক্কর। সেখানে সামান্য ভুলেরও কোনও জায়গা নেই। স্পেন জানে, রোজারিওর মহাতারকাকে মাত্র এক মুহূর্তের জন্যও ফাঁকা জায়গা দিলে সেটাই বিশ্বকাপ হাতছাড়া হওয়ার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, স্পেনে উয়েফা প্রো কোচিং লাইসেন্স করার সময় স্কালোনির প্রশিক্ষকদের অন্যতম ছিলেন দে লা ফুয়েন্তে। অর্থাৎ, এই ম্যাচে মাঠের বাইরে দেখা যাবে গুরু-শিষ্যের লড়াইও।

সব মিলিয়ে আধুনিক আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণীয় ফাইনালের মঞ্চ প্রস্তুত। একদিকে আর্জেন্টিনার লক্ষ্য বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট ধরে রাখা, অন্যদিকে বল দখলনির্ভর, প্রবল চাপ সৃষ্টি করা নিজেদের স্বভাবসিদ্ধ ফুটবল খেলেই ফের বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে স্পেন।

 

আর্জেন্টিনা অধিনায়কের এই বার্তায় দলের মধ্যে গড়ে ওঠা একতা ও পারিবারিক বন্ধনের ছবিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মেসির ভাষায়, এই দল একটি ‘পরিবার’। একই সঙ্গে তিনি সতীর্থদের উপর থেকে চাপও কমানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর বার্তা, স্পেনের বিরুদ্ধে ফাইনালের ফল যাই হোক না কেন, এই দলের কীর্তি ইতিমধ্যেই অমর হয়ে গিয়েছে।

 

বিশ্ব ফুটবল মহলের বড় অংশের ধারণা, এটাই হতে চলেছে মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। এমনকি এটিই হয়তো তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ারেরও শেষ ম্যাচ হতে পারে। তবে ফাইনালের আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। বরং তিনি বর্তমানেই মনোযোগ দিয়েছেন। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে পেরে তিনি যে ভীষণ গর্বিত, সেটাই তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, সেই জয় ছিল একটি বিশেষ মুহূর্ত।

 

২০২৪ স্পেনের ইউরো জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন যিনি, সেই লামিন ইয়ামালকে নিয়েও প্রশ্নের উত্তর দেন মেসি। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের পাশাপাশি বিশ্বকাপ জেতা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হওয়ার হাতছানি ইয়ামালের সামনে।

 

৩৯ বছর বয়সি মেসি স্প্যানিশ তারকার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “এই মুহূর্তে ও বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন।” বার্সেলোনার তরুণ ফুটবলারকে শুভেচ্ছা জানিয়ে মেসি আরও বলেন, “ওর সাফল্য মানে বার্সেলোনারও সাফল্য। আমি চাই ও আরও এগিয়ে যাক।”

 

তবে ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইয়ামালকে থামানোর পরিকল্পনার কথাও স্পষ্ট করে দেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। বলেন, “আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব, যাতে ও নিজের সেরাটা খেলতে না পারে। তবে স্পেন শুধু ইয়ামালকে নিয়েই নয়, ওদের পুরো দলটাই অসাধারণ।”

 

এরপর মেসি বলেন, “ইয়ামাল অসাধারণ মানের ফুটবলার, বিশ্ব ফুটবলের নতুন তারকা। ওর বয়স মাত্র ১৯ বছর। গোটা কেরিয়ার এখনও ওর সামনে পড়ে রয়েছে। আমি ওর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি। কিন্তু এবার যাতে ও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে না পারে, তার জন্য আমরা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দেব।”

 

সাংবাদিক বৈঠক শেষে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে জড়িয়ে ধরেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, স্পেনে উয়েফা প্রো কোচিং লাইসেন্স করার সময় স্কালোনির প্রশিক্ষকদের অন্যতম ছিলেন দে লা ফুয়েন্তে।

 

এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ফুটবলার রিও ফার্দিনান্দ এবং হলিউড অভিনেতা কেভিন হার্ট। এছাড়াও টেনিস কিংবদন্তি নোভাক জোকোভিচ ও এনবিএ তারকা কেভিন ডুরান্ট, টম ব্র্যাডি- সবাই মিলে ফুটবলারদের নানা প্রশ্ন করেন।

 

বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার মুখে দলগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পুরস্কারের লড়াইয়েও রয়েছেন মেসি। যদিও গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সম্প্রতি কিলিয়ান এমবাপে তাঁকে ছাপিয়ে গিয়েছেন, তবু মেসির সমস্ত মনোযোগ এখন নিজের খেলা উপভোগ করা এবং আর্জেন্টিনাকে আরও একবার ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ এনে দেওয়ার দিকে।