সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হার এখন অতীত। প্রতিবেশী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তৃতীয় স্থান অর্জনের লড়াই এখন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। তা সত্ত্বেও মেসিদের কাছে হার তাড়া করে বেড়াচ্ছে ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেলকে। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে সাংবাদিক বৈঠকে এসেও ইংল্যান্ডের কোচকে সেই ম্যাচের ভুলভ্রান্তি নিয়ে একাধিক প্রশ্নের জবাব দিতে হয়। তিনি অবশ্য সব প্রশ্নেরই জবাব দেন।
বিশ্বকাপের ফাইনাল থেকে মাত্র কয়েক মিনিট দূরে দাঁড়িয়ে ৮৫ মিনিট পর্যন্ত এগিয়ে থেকেও লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার দুরন্ত প্রত্যাবর্তনের সামনে হার মানতে হয়েছে ইংল্যান্ডকে। সেই হারের পর সমালোচনার ঝড় উঠেছে ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ থমাস টুখেলকে ঘিরে। বিশেষ করে ম্যাচের শেষ দিকে তাঁর রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমর্থক থেকে ফুটবল বিশেষজ্ঞ— সকলেই। তবে সেই সমস্ত সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে সমস্ত দায় নিজের কাঁধেই তুলে নিলেন জার্মান কোচ।
ফ্রান্সের বিরুদ্ধে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের আগে সাংবাদিক বৈঠকে টুখেল বলেন, ‘যদি কাউকে দোষী খুঁজতেই হয়, তা হলে আমাকেই দোষ দিন। সমস্ত দায়িত্ব আমিই নিচ্ছি’। তবে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর কোনও আক্ষেপ নেই বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দেন ইংল্যান্ড কোচ। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি জানতে চান, আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও আফসোস আছে কি না, তা হলে বলব— না, একেবারেই নেই। ম্যাচের গতি বদলে যাচ্ছিল বলে আমার মনে হয়েছিল। আমি আমার দলকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি’।
টুখেলের সংযোজন, ‘আমি আমার স্বভাব, অভিজ্ঞতা এবং মানসিকতার উপর ভরসা করে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। উদ্দেশ্য ছিল দলকে সাহায্য করা এবং ম্যাচ জেতা। কিন্তু আমরা ফল পাইনি। তাই এই সিদ্ধান্তগুলির সম্পূর্ণ দায়িত্ব অবশ্যই আমি নিচ্ছি। যদি আমি দলকে সাহায্য করার চেষ্টা না করতাম, তা হলে আফসোস হত’।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইংল্যান্ডের হার নিয়ে মন্তব্য করেছেন। শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘ইংল্যান্ড দলে একজন অসাধারণ ফুটবলার আছে, হ্যারি। ওর সঙ্গে আমি গলফও খেলেছি। দারুণ ছেলে। তবে আমার মনে হয়, ওকে রক্ষণাত্মক ভূমিকায় নামিয়ে ইংল্যান্ড সম্ভবত ভুল করেছে’।
তিনি আবার এও বলেন যে, ‘ফুটবল সম্পর্কে আমি আর কতটাই বা জানি? কিন্তু তারা এগিয়ে যাওয়ার পর নিজেদের সেরা ফুটবলারকেই রক্ষণে নামিয়ে দিল! একটু তো আক্রমণাত্মক খেলতেই হবে, তাই না? তবে কোচিং সম্পর্কে আমি আর কী-ই বা জানি! তবু ব্যাপারটা আমার কাছে অস্বাভাবিক লেগেছে। তবে হ্যারি সত্যিই দারুণ একজন মানুষ’।
ম্যাচের শেষ দিকে কেন অধিনায়ক ও সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হ্যারি কেন এতটা নিচে নেমে খেলছিলেন, সে প্রশ্ন সাংবাদিক বৈঠকেও ওঠে। তার জবাবে টুখেল বলেন, ‘আপনি শেষ ৩০ মিনিটের কথা বলছেন? আমরা কেন নিচু ব্লকে রক্ষণ করেছি? যখন দল নিচু ব্লকে রক্ষণ করে, তখন এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা যথেষ্ট আক্রমণাত্মক ছিলাম না’।
এর পরই নিজের কৌশল ব্যাখ্যা করে টুখেল বলেন, ‘এ জন্যই আমরা পাঁচ জনের রক্ষণভাগে চলে যাই, যাতে মাঠের প্রস্থটা আরও ভালোভাবে সামলানো যায় এবং যারা ক্রস তুলছিল, তাদের কাছাকাছি থাকা যায়। কিন্তু আমরা অতিরিক্ত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলাম। অন্য দিকে আর্জেন্টিনা আরও এক ধাপ এগিয়ে যায় এবং পুরো ছন্দটাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়’।
ইংল্যান্ডের শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে টুখেল বলেন, ‘আমরা হয়তো এটা স্বীকার করতে চাই না, কারণ শুনতে অজুহাতের মতো লাগবে। কিন্তু আজটেকা স্টেডিয়ামের উচ্চতায় ১০ জন নিয়ে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে ম্যাচ এবং মায়ামির প্রচণ্ড গরমে নরওয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচ— আমাদের যতটা ক্লান্ত করেছে, আমরা হয়তো ততটা বুঝতেই পারিনি’।
সেমিফাইনালের সেই যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন টুখেল। তাঁর কথায়, ‘সবচেয়ে বেশি কষ্ট আমাদেরই হচ্ছে। এই ক্ষত আমাদের সঙ্গেই থাকবে। এটা আমাদের যন্ত্রণা, আমার যন্ত্রণা, ফুটবলারদের যন্ত্রণা। খুবই কষ্টের হার। এই হার নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে। সমালোচক, বিশেষজ্ঞ বা পরিবারের সদস্যদের নয়— প্রথমে এই যন্ত্রণা আমাদেরই বহন করতে হবে’।
তিনি বলেন, ‘আমরা এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠব। এটাকে কাজে লাগাব। আমরা প্রত্যাঘাত করব। আর সেই লড়াই শুরু হবে আগামীকাল থেকেই। আগামীকাল জিততে পারলে ৬০ বছরের মধ্যে এটাই হবে ইংল্যান্ডের সেরা বিশ্বকাপ ফলাফল। এটাও একটা দৃষ্টিভঙ্গি’।
বিশ্বকাপের স্বপ্নভঙ্গের হতাশা টুখেলের চোখেমুখে স্পষ্ট। তবু সমালোচনার মুখে পিছিয়ে না গিয়ে সাংবাদিকদের কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। নিজের সিদ্ধান্তের পাশে থেকেও হারের সমস্ত দায় নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া— সেটাই যেন ইংল্যান্ড কোচের সবচেয়ে বড় বার্তা।




