লড়াইয়ের ময়দানে একের পর এক সাফল্য। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হারিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি। সেই নীরজ যাদবের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ ভারতীয় ক্রীড়ামহল। তিন বারের এশিয়ান প্যারা গেমসের সোনাজয়ী এই অ্যাথলিটের বয়স হয়েছিল ৪২ বছর। মঙ্গলবার তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ভারতীয় প্যারা অ্যাথলেটিক্স দলের প্রধান কোচ এস সত্যনারায়ণ নীরজের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেন, ‘এই খবর শুনে আমি স্তম্ভিত। আমি ওঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। নীরজ এশিয়ান গেমসে চ্যাম্পিয়ন ছিল, অসাধারণ অ্যাথলিট ছিল। আমাদের সকলের কাছেই এটা বিরাট ক্ষতি’।
পুলিশের অনুমান আত্মহত্যা!
নীরজ যাদবকে মঙ্গলবার রাতে দিল্লির মৌজপুর মেট্রো স্টেশনের কাছে তাঁর এসইউভি গাড়ির পাশে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন তিনি। ৪২ বছরের এই প্যারা অ্যাথলিট সম্প্রতি নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত প্যারা এশিয়ান গেমসে যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। ডোপিং সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার কারণে তিনি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে নীরজকে তাঁর কালো স্করপিও গাড়ির পাশে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান এক বান্ধবী। ২০২৫-এর ডিসেম্বর থেকে ওই বান্ধবীর সঙ্গে পরিচয় ছিল নীরজের। সোনিপত থেকে একসঙ্গে যাত্রা করার পর তিনি ওই মহিলাকে মৌজপুরে নামিয়ে দিয়েছিলেন।
দিল্লি পুলিশের এক পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, ‘মঙ্গলবার ওই মহিলা নীরজের সঙ্গে দেখা করতে সোনিপতে গিয়েছিলেন। তাঁকে জানিয়েছিলেন, এর পর থেকে আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হবে না। এর পরে নীরজ নিজের স্করপিও-এন গাড়িতে করে তাঁকে দিল্লির মৌজপুরে নামিয়ে দেন। রাত প্রায় ৯টা নাগাদ নীরজ ফোনের উত্তর না দেওয়ায় ওই মহিলা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি তখন মৌজপুর মেট্রো স্টেশনের এক নম্বর গেটের কাছে পৌঁছে দেখেন, নীরজ রাস্তার ধারে তাঁর গাড়ির পাশে পড়ে রয়েছেন। এর পরে চিকিৎসার জন্য তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন’।
শৈশবের প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সাফল্য
উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা নীরজের মাত্র সাত বছর বয়সে পোলিও-পরবর্তী পক্ষাঘাত ধরা পড়ে। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর খেলাধুলোর স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। প্রথমে হুইলচেয়ার টেনিস খেলতেন তিনি। ২০০৫ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সেই খেলায় যুক্ত থাকার পরে প্যারা অ্যাথলেটিক্সে যোগ দেন।
এফ৫৫ বিভাগে জ্যাভলিন থ্রো, ডিসকাস থ্রো এবং শট পাটে অংশ নিতেন নীরজ। ২০১৮ সালে জাকার্তা এশিয়ান প্যারা গেমসে পুরুষদের এফ৫৫ জ্যাভলিন থ্রোয়ে সোনা জিতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন। সেই প্রতিযোগিতায় ২৯.৮৪ মিটার দূরে জ্যাভলিন ছুড়ে এশীয় রেকর্ডও গড়েছিলেন তিনি।
এর পরে ২০২৩-এ হাংঝৌ এশিয়ান প্যারা গেমসে জ্যাভলিন এবং ডিসকাস থ্রো— দু’টি বিভাগেই সোনা জেতেন নীরজ। সব মিলিয়ে এশিয়ান প্যারা গেমসে তাঁর সোনার সংখ্যা দাঁড়ায় তিন।
ডোপিংয়ের কারণে প্রতিযোগিতার বাইরে
নীরজের কেরিয়ারে বড় ধাক্কা আসে ২০২৩ সালে। বেঙ্গালুরুতে প্রতিযোগিতার বাইরে নেওয়া নমুনায় নিষিদ্ধ অ্যানাবলিক স্টেরয়েড স্ট্যানজোলল পাওয়া যাওয়ার পরে তাঁর বিরুদ্ধে অ্যান্টি-ডোপিং বিধি ভাঙার অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালে তাঁকে সাময়িক ভাবে নির্বাসিত করা হয়। সেই নিষেধাজ্ঞার কারণে চলতি মাসে জাপানের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান প্যারা গেমসেও অংশ নিতে পারেননি তিনি।
সম্প্রতি এই নিষেধাজ্ঞার কারণে নীরজ মানসিক চাপে ছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। তবে তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সেই পরিস্থিতির কোনও সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। মৃত্যুর কারণ ও পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত চলছে।
ভারতীয় প্যারা অ্যাথলেটিক্সের অন্যতম সফল মুখ ছিলেন নীরজ। শৈশবের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য পাওয়ার যে নজির তিনি তৈরি করেছিলেন, তা দীর্ঘ দিন মনে রাখবে ক্রীড়ামহল।




