উজ্জ্বল সামন্ত
বিরিঞ্চিবর্ধন তালুকদারের একমাত্র নাতি অমল। অমল বাবা-মার সঙ্গে শহরে থাকে। পুজোর ছুটি বা পরীক্ষা শেষে বছরে এক-দুইবার গ্রামে দাদুর বাড়ি ছাতনায় আসে। ঘন জঙ্গলে ঘেরা ছাতনা গ্রাম। চারিদিকে সবুজ। সূর্যের আলো নিভলেই ঝিঝিঁ পোকা, শেয়ালের ডাক শোনা যায়। গ্রামে এখনো ইলেকট্রিসিটি পৌঁছয়নি। গ্রাম্য কাঁচা রাস্তায় মাঝে মধ্যে খাল ডোবা আছে। যানবাহন বলতে গরুর গাড়িই ভরসা। হঠাৎ ঠাকুমার অসুস্থতার খবর, টেলিগ্রাম আসে। অমলের বাবা ব্যবসাসূত্রে প্রায়ই বাইরে থাকেন। তাই অগত্যা নাতি বেরিয়ে পড়ে খোঁজ নিতে। স্টেশনে ট্রেন ধরে প্রবল বর্ষায় ছাতনা পৌঁছতে পৌঁছতে রাত্রি আটটা বেজে যায়। স্টেশনে নেমে অনেক খোঁজ করে, একটাও গরুর গাড়ি নেই। পূর্ণিমার রাত্রি। এখনো ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। অগত্যা হাঁটতে থাকে মেঠো পথ ধরে। যেভাবেই হোক পৌঁছতে হবে। গাঁয়ের মেঠো আলপথে একটু অসুবিধা হয় চলতে। টর্চটাও জ্বলছে না বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছে। কিছুটা পথ পেরিয়ে দেখে গাঁয়ের মাঝমাঠে আগুন জ্বলছে
Advertisement
দাউ-দাউ করে, দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই সময় আগুন জ্বলছে কেন? থেমে যায়। কিন্তু কী করবে, খানিকটা পথ পেরোতেই ঘন জঙ্গলটা। কেউ কোথাও নেই। হঠাৎ অমল লক্ষ্য করে একটা উদ্ভট পোড়া পোড়া গন্ধ। কি বিশ্রী! হাত দিয়ে নাক চেপে ধরে চলতে থাকে। কিছুদূর যাওয়ার পর চাঁদের হালকা আলোয় দেখে, হাত কুড়ি দূরে কে যেন দাঁড়িয়ে, পরনে রয়েছে সাদা শাড়ির মত কিছু। কে ওখানে? জিজ্ঞেস করতেও কোনও উত্তর আসে না। অমল আবার জিজ্ঞেস করে, কে ওখানে? নাকি সুরে মহিলা কন্ঠে উত্তর দেয়, আজ্ঞে এই যে আমি! অমলের গলা যেন শুকিয়ে আসে, বুকটা ধড়ফড় করে। অমল কালবিলম্ব না করে আবার চলতে শুরু করে। মাঝে মাঝে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে ছবিটা অস্পষ্ট হয়ে যায়। ব্যাঙ ডাকছে। একটা দমকা হাওয়া বয়ে যায়। খানিকটা যাওয়ার পর ধপাস করে শব্দ শুনতে পায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে বুঝতে চেষ্টা করে। অমলের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। কী হচ্ছে এসব! না, সকালের ট্রেনটা ধরে এলেই ভালো হতো, এইসব ভাবছে। আবার পথ চলতে শুরু করলো। কিছু পরে আবার লক্ষ্য করে, গাছের ডালে কী যেন একটা সাদা মতো জিনিস উড়ছে। নিজেকে আর সামলাতে পারে না, অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা। ‘রাম-রাম’ বলতে বলতে দৌড়তে থাকে। সেই সময় একটি লণ্ঠনের আলো দেখতে পায়। কে যেন সাড়া দেয়, অমল? গলার স্বরটা যেন চেনা। অমল উত্তর দেয়, হ্যাঁ। আরো কাছে আসতেই দেখে তার দাদু হ্যারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে বাড়ির সামনেই। অমল যেন প্রাণ ফিরে পায়। দাদু জিজ্ঞেস করে, কী হলো? এমন দৌড়চ্ছিলে কেন? অমল দাদুকে বলে, আগে ঘরে চলো সব বলছি। বাড়ি ফিরে জল চায়। বাতাসা ও কাঁসার গ্লাসে এক গ্লাস জল দেয় দাদু। অমল ঢকঢক করে জল পান করে। একটু ধাতস্থ হয়ে দাদুকে বলে, আজ নির্ঘাত বেঁচে গেলাম। তেনারা হয়তো আজকে তোমার নাতির ঘাড় মটকে দিত। দাদু জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে খুলে বলো। অমল আগাগোড়া ঘটনা দাদুকে জানায়। দাদু হো-হো করে হাসতে থাকে। অমল একটু রেগে যায়। দাদু বলে, দাদুভাই ভূত-প্রেত কিচ্ছু না, তোমার মনের ভুল। যে আলোটা দেখেছো, সেটা গ্রামের শ্মশানে চিতা জ্বলছিল, আর ওই পোড়া গন্ধটা শ্মশানে দগ্ধ চিতার। কিন্তু সাদা শাড়ি পরে যে পিছনে ছিল। নাকি সুরে কথা বলছিল। ওহ্, ওটা হয়তো পঞ্চুর মা। এখানে তো সবার টয়লেট নেই, হয়তো পায়খানা করতে গিয়েছিল ওখানে। আর সাদা শাড়ি পরে কে উড়ছিল? তখন দাদু বলে, কেউ ছিল না। কোনো গাছের ডালে, মরার ঢাকা— হয়তো কোনো সাদা শাড়ি বা চাদর হাওয়ায় উড়ে গাছের গায়ে লেগে হাওয়ায় দুলছিল। ধপাস শব্দটা! ওটা কীসের?
Advertisement
দাদু, বর্ষাকালের শেষ, দমকা হাওয়ায় পাকা তাল হয়তো তালগাছ থেকে পড়েছিল। তুই তো তাল বাগানের ভেতর দিয়েই আসছিলি। অমল একটু সাদাসিধে ভীতু প্রকৃতির ছেলে। দাদুর কাছে সব কথা শুনে এবার মনে মনে হাসতে থাকে। দাদু বলেন, ওসব ভূত-প্রেত বলে কিছু আছে নাকি! সব মনের ভুল। রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পর অমল শুতে যায়। চিমনির আলো টিমটিম করে জ্বলছে। টেবিলের উপর রেখে দেয়। বাইরে এখনো ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। দরজাটা ভিজিয়ে অমল শুয়ে পড়ে। রাত গভীর হলে, একটা ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়। বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েছে, সেই সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। অমল দরজা বন্ধ করতে যায়। বাইরে দেখে, কেউ যেন উঠোনে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে। এত রাত্রে কে হবে? মনের উৎসাহ নিবারণের জন্য ও বাইরে বেরিয়ে আসে।
অমলকে দেখেই কে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। অমল ভয় পায়, ভাবে দাদুকে ডাকবে! বয়স্ক মানুষ, ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো। এত রাত্রে ডাকা ঠিক হবে কি? এইসব ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরে আসে। রাতে কিছুতেই ভালো ঘুম হলো না। পরদিন সকালে প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়ল গ্রাম ঘুরতে। কিছুদূর যাওয়ার পর কবরস্থান পড়ে। ওদিকটা আগে কোনোদিন যায়নি। দুপুরে ভাতঘুম দেয়। সন্ধ্যায় আবার বেরিয়ে পড়ে এদিক-ওদিক। হঠাৎ বন্ধু রহিমের বাড়ির পথে যায়। লন্ঠনের মৃদু আলোয় পথেই রহিমকে দেখতে পেল। রহিম ভালো আছো? অমলকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, কী বন্ধু কেমন আছো? অমল উত্তর দিল, ভালোই, তোমার খবর কী? দু-চার কথা হওয়ার পর অমল বলল, ভাই অনেক দেরি হয়ে গেল, দাদু চিন্তা করবে। আজ তা হলে আসি।
বাড়ি এসে হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসে। ঠাকুমা আজ সুস্থ হয়ে উঠেছে। নাতির পছন্দের রান্নাবান্না হয়েছে। তিনজনে মিলে রাত্রে খাবার খাচ্ছে, গল্পও চলছে। অমলের দাদু তার গিন্নিকে বলে, শুনছো গিন্নি! উনি বলেন কী? গতকাল ভোরে রহিম গলায় দড়ি দিয়েছে, বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে। অমল বলছে, দাদু তুমি ভুল খবর বলছো। এই তো আজকের সন্ধ্যার সময় ওর সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করে এলাম। অমল তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি। আজ দুপুরেই ওকে কবর দিয়েছে। আমার বন্ধু আইনুল তো গিয়েছিল মাটি দিতে। অমলের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, ও দাদুকে জাপটে ধরে, বলছো কী দাদু! তাহলে আমি কার সঙ্গে গল্প করে এলাম?
তুই নিশ্চয়ই ভুল করছিস কিছু অমল। আচ্ছা কাল সকালে তুই আমার সঙ্গে রহিমের বাড়ি যাবি। নিজেই জেনে আসবি সত্যিটা কী। কিন্তু দাদু, আজকে তো সন্ধ্যার সময় আমি ওর বাড়ির পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম। ও বাইরে দাওয়ায় বসেছিল। আমাকে দেখে এগিয়ে এলো। কখনো হতে পারে না। মরা মানুষ জ্যান্ত হয় নাকি। অমল তুই নেশা-টেশা করেছিস? দাদু-নাতির খানিক বাদ-বিবাদ হয়। খাওয়া শেষে অমল বলে, কাল সকাল পর্যন্ত আমার ধৈর্য সইবে না দাদু। এখনই চলো। দাদু আর নাতি হ্যারিকেন নিয়ে পৌঁছে যায় রহিমের বাড়ি। হাঁক দেয়। রহিমের বউ ফাতেমা বেরিয়ে আসে কাঁদতে কাঁদতে। কাকে খুঁজছেন চাচা, রহিম! ও তো আর বেঁচে নেই। আমার সঙ্গে ঝগড়া করে আল্লাহর কাছে চলে গিয়েছে চিরদিনের মতো। এ কথা শুনে অমলের মাথা ঝিমঝিম করে, ভয়ে হাত পা কাঁপতে থাকে, মুহূর্তেই জ্ঞান হারায়। দাদু চিৎকার করতে থাকে। গ্রামের দু-তিনজন দৌড়ে আসে, চোখে মুখে জল ছিটায়। গরুর গাড়ি ডেকে বৈদ্যকে খবর দেয়।
Advertisement



