পাওনা ছিল ৭৮ লক্ষ টাকা। অনেকবার চেয়েও মিলছিল না বকেয়া। শেষে ফিল্মি কায়দায় অপহরণ করে টাকা উদ্ধারের ছক কষা হল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না তাতেও। টাকা আদায় দূরের কথা আপাতত শ্রীঘরই ঠিকানা অভিযুক্তদের।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক দুঃসাহসিক ও চাঞ্চল্যকর অপহরণের ঘটনা দেখল সল্টলেক সেক্টর ফাইভ। আরডিবি ভবনের সামনে থেকে তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী অঙ্কন সাহাকে বেধড়ক মারধর করে গায়ের জোরে গাড়িতে তুলে নিয়ে চম্পট দেয় একদল দুষ্কৃতী। তদন্তে নেমে সিসিটিভি ফুটেজ এবং মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নদিয়ার হরিণঘাটা থেকে অপহৃত যুবককে উদ্ধার করল বিধাননগর কমিশনারেটের পুলিশ। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে সাদা রঙের স্করপিও গাড়ি।
জানা গিয়েছে, অপহৃত যুবক পেশায় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী। সন্ধ্যায় কাজ শেষে সেক্টর ফাইভের ব্যস্ততম আরডিবি ভবনের সামনে পার্ক করা নিজের মোটরবাইকটি স্টার্ট দেওয়ার তোড়জোড় করছিলেন অঙ্কন। সেই মুহূর্তে আচমকা সাদা রঙের স্করপিও গাড়ি এসে তাঁর ঠিক সামনে দাঁড়ায়।
গাড়ি থেকে কয়েকজন যুবক নেমেই ঘিরে ধরে তাঁকে। অভিযোগ, কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু এলোপাথাড়ি মারধর। প্রতিরোধের চেষ্টা করলে জোর জবরদস্তি অঙ্কনকে গাড়ির ভিতরে তুলে দ্রুত এলাকা ছাড়ে দুষ্কৃতীরা। সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে সল্টলেকের মতো এলাকায় চোখের সামনে এমন ‘রোমহর্ষক’ অপহরণের ঘটনায় চারপাশে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
খবর পাওয়া মাত্রই ইলেকট্রনিক্স কমপ্লেক্স থানার পুলিশ এবং বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের নেতৃত্বাধীন পুলিশ বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পুলিশ আধিকারিকরা এলাকাটি ঘিরে ফেলে আরডিবি ভবন ও সংলগ্ন রাজপথের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। সিসিটিভি ক্যামেরার ছবি বিশ্লেষণ করে খুব কম সময়ের মধ্যেই দুষ্কৃতীদের ব্যবহৃত সাদা স্করপিও গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর শনাক্ত করতে সক্ষম হন তদন্তকারীরা।
গাড়ির নম্বর মেলার পর পুলিশি তৎপরতা আরও বাড়ে। রেজিস্ট্রেশনের সূত্র ধরে তড়িঘড়ি গাড়ির মালিকের সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশ ওই গাড়ির চালকের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে। চালকের ফোন নম্বর পেয়ে সেটিকে ট্র্যাকিংয়ে বসানো হয়। মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ট্রেস করতেই দেখা যায়, গাড়িটি জাতীয় সড়ক ধরে দ্রুত নদিয়া জেলার হরিণঘাটার দিকে এগোচ্ছে।
বিধাননগর পুলিশের তরফে তৎক্ষণাৎ নদিয়ার হরিণঘাটা থানার পুলিশকে সতর্ক করা হয়। অপহৃতের অবস্থান সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য জানানো হয়। হরিণঘাটা থানার পুলিশ দ্রুত জাতীয় সড়কে নাকা তল্লাশি বসিয়ে ফাঁদ পাতে। স্করপিও গাড়িটি হরিণঘাটা পৌঁছতেই সেটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে পুলিশ। গাড়িতেই ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী অঙ্কন সাহা। তাঁর সঙ্গে গাড়িতে থাকা বাকি ৬ অভিযুক্তকেই আটক করা হয়। অপহৃত যুবক ও আটক ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, এই কাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে বিপুল অঙ্কের আর্থিক দেনা-পাওনা সংক্রান্ত বিবাদ।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী অঙ্কন সাহার কাছে অভিযুক্তদের প্রায় ৭৮ লক্ষ টাকা পাওনা ছিল। অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সেই পাওনা টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছিল না। বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও টাকা না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযুক্তরা সল্টলেক থেকে তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে টাকা আদায়ের ছক কষেছিল। এই আর্থিক লেনদেনের নেপথ্যে অন্য কোনও সাইবার অপরাধ বা প্রতারণার যোগ রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।




