• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 8 September, 2026

‘বিয়ে বৈধ কি না, তা দিয়ে নির্যাতনের বিচার থমকে যাবে না’, নজিরবিহীন পর্যবেক্ষণ হাইকোর্টের

নিম্ন আদালতকে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, মামলার বিচার যেন আদালতের এই পর্যবেক্ষণগুলির দ্বারা কোনওভাবেই প্রভাবিত না হয়। অর্থাৎ, সম্পর্কের নাম কী ছিল বা বিয়ের কাগজ কতটা বৈধ, তার আড়ালে নির্যাতনের অভিযোগ চাপা পড়ে থাকতে পারে না।

‘বিয়ে বৈধ কি না, তা দিয়ে নির্যাতনের বিচার থমকে যাবে না’, নজিরবিহীন পর্যবেক্ষণ হাইকোর্টের

Photo: নজিরবিহীন পর্যবেক্ষণ হাইকোর্টের (AI)

কাগজে-কলমে বিয়ে বৈধ হয়নি। এই যুক্তিতে কোনও মহিলার উপর অত্যাচারের অভিযোগ থেকে অভিযুক্ত পুরুষকে অব্যাহতি দেওয়া যায় না। বিশেষত, যদি প্রমাণ মেলে যে ওই পুরুষই নিজের আগের বিয়ের কথা গোপন করে এক মহিলাকে ‘স্ত্রী’ হিসেবে নিজের সঙ্গে সংসার করতে বাধ্য করেছিলেন। এমনই মানবিক ও তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল কলকাতা হাইকোর্ট।

একটি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত এক ব্যক্তির দায়ের করা মামলা খারিজের আবেদন শুনতে গিয়ে বিচারপতি উদয় কুমার এই পর্যবেক্ষণ করেন। ২০২২ সালে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতারণা, তোলাবাজি এবং নিষ্ঠুরতা-সহ একাধিক অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছিল। সেই মামলারই পরবর্তী পদক্ষেপ বন্ধ করার আবেদন করেছিলেন তিনি।

মামলার বয়ান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ওই মহিলার সঙ্গে অভিযুক্তের পরিচয় হয়। অভিযোগ, অভিযুক্ত নিজেকে অবিবাহিত এবং অনাথ বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর কথায় বিশ্বাস করে মহিলা তাঁর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। পরে অভিযুক্ত তাঁকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে রাজি করান। সেই সঙ্গে ২০২০ সালের জুলাইয়ে তাঁদের বিয়ে হয় বলেও অভিযোগ।

কিন্তু পরবর্তীতে মহিলা জানতে পারেন, অভিযুক্তের আগেই বিয়ে হয়েছিল। সেই বিয়ে তখনও বহাল ছিল। অভিযোগ, সত্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের মে মাসে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

অভিযুক্তের দাবি ছিল, তাঁদের মধ্যে আদৌ বৈধ বিয়ে হয়নি। এমনকী মহিলার আগের বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরে মামলাটি খারিজের আবেদন করা হয়। মহিলার কাছেও কথিত মুসলিম বিয়ের কোনও আনুষ্ঠানিক নথি ছিল না।

কিন্তু তদন্তে উঠে আসা তথ্যকে গুরুত্ব দেয় কলকাতা হাইকোর্ট। তদন্তে এমন প্রমাণ ছিল যে, তাঁরা একই বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করতেন। বাড়ির মালিকও তদন্তকারীদের জানিয়েছিলেন, ওই দু’জন তাঁর বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই থাকতেন।

বিচারপতি উদয় কুমারের তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, শুধু ‘বিয়ে বৈধ হয়নি’ বলে কোনও মহিলাকে নির্যাতনের বিচার থেকে বঞ্চিত করা হলে তা হবে সম্পূর্ণ অন্যায়। আদালত জানিয়েছে, “বর্তমান সময়ে দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যদি একই ছাদের নীচে স্বামী-স্ত্রীর মতো সংসার করেন। সমাজের কাছে নিজেদের দম্পতি হিসেবে পরিচিত দেন। সম্পর্কের মধ্যে বিয়ের অভিপ্রায় থাকে, তা হলে সেই সম্পর্ককে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক বিয়ের কাগজের অভাবে আইনের সুরক্ষা থেকে বাদ দেওয়া যায় না।

আদালতের মতে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারার প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘নিখুঁত বৈধ বিয়ে’-কে একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখার পুরনো, সংকীর্ণ ধারণা আধুনিক আইনি ব্যাখ্যায় আর গ্রহণযোগ্য নয়। সম্পর্কটি যদি ‘বিয়ের প্রকৃতির’ হয় এবং তার সঙ্গে যৌথ বসবাস ও সামাজিকভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হওয়ার মতো প্রমাণ থাকে, তা হলে সেই সম্পর্কেও ৪৯৮এ-র সুরক্ষা প্রযোজ্য হতে পারে। অভিযুক্ত পক্ষের দাবি ছিল, সম্পর্কের প্রকৃতি এবং প্রতারণার অভিযোগ দু’টিই বিতর্কিত বিষয়। তাই সেগুলি বিচারপর্বেই নির্ধারণ করা উচিত। রাজ্যের পক্ষ থেকেও একই যুক্তি তুলে ধরে মামলা খারিজের বিরোধিতা করা হয়।

আরও পড়ুন: ভয় দেখিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে জাল নথি ব্যবহারের অভিযোগ, পুলিশের জালে ১

শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্ট মামলা খারিজের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। নিম্ন আদালতকে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, মামলার বিচার যেন আদালতের এই পর্যবেক্ষণগুলির দ্বারা কোনওভাবেই প্রভাবিত না হয়। অর্থাৎ, সম্পর্কের নাম কী ছিল বা বিয়ের কাগজ কতটা বৈধ, তার আড়ালে নির্যাতনের অভিযোগ চাপা পড়ে থাকতে পারে না। প্রতারণার মাধ্যমে কোনও মহিলাকে সংসারের সম্পর্কে টেনে এনে পরে তাঁকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে, সেই অভিযোগের বিচার হবে বলেই মত আইনজীবী মহলের একাংশের।