• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 9 August, 2026

সেই রাতের পর দু’বছর, আরজি করে রাতের নিরাপত্তা কতটা বদলাল? ঘুরে দেখল দৈনিক স্টেটসম্যান

৯ অগস্ট, ২০২৪। আরজি করের সেই অভিশপ্ত রাত। হাসপাতালের সেমিনার হলে উদ্ধার হয়েছিল তরুণী চিকিৎসকের দেহ। ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে সেই ঘটনার অভিঘাতে শুধু কলকাতা নয়, উত্তাল হয়েছিল গোটা দেশ

সেই রাতের পর দু’বছর, আরজি করে রাতের নিরাপত্তা কতটা বদলাল? ঘুরে দেখল দৈনিক স্টেটসম্যান

Image: SNS

রাত ন’টা। হাসপাতালের করিডরে তখনও ব্যস্ততা। কোথাও রোগীর পরিজনের অপেক্ষা, কোথাও চিকিৎসা কর্মীদের ছুটে চলা। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের সামনে দাঁড়ালে অবশ্য নজর আটকে যায় অন্য জায়গায়। এক জন নন, একাধিক সিআইএসএফ জওয়ান মোতায়েন। তাঁদের মধ্যে যেমন পুরুষ কর্মী রয়েছেন, তেমনই রয়েছেন মহিলা জওয়ানও। ওয়ার্ডের সামনে তাঁদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে—রাতের হাসপাতাল এখন আর আগের মতো নয়। ঠিক দু’বছর আগে, এই রাতের ছবিটাই ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম।

৯ অগস্ট, ২০২৪। আরজি করের সেই অভিশপ্ত রাত। হাসপাতালের সেমিনার হলে উদ্ধার হয়েছিল তরুণী চিকিৎসকের দেহ। ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে সেই ঘটনার অভিঘাতে শুধু কলকাতা নয়, উত্তাল হয়েছিল গোটা দেশ। কর্মরত অবস্থায় হাসপাতালের ভিতরেই এক মহিলা চিকিৎসক কী ভাবে এমন নৃশংসতার শিকার হলেন, উঠেছিল সেই প্রশ্ন। হাসপাতালের ভিতরে মহিলা চিকিৎসকদের নিরাপত্তা কোথায়—প্রশ্ন উঠেছিল তা নিয়েও।

আন্দোলনে নেমেছিলেন জুনিয়র চিকিৎসকেরা। পথে নেমেছিলেন সাধারণ মানুষও। হাসপাতালের নিরাপত্তা, রাতের ডিউটি, কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা—সব কিছুই চলে এসেছিল আলোচনার কেন্দ্রে। সেই ঘটনার দু’বছর পরে ‘অভয়া’র ধর্ষণ ও খুনের মামলা এখনও চলছে। কিন্তু এর মধ্যে বদলেছে অনেক কিছুই।

২০২৬-এর ৮ আগস্ট রাতে আরজি কর ঘুরে দেখল ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’। হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে অন্তত নিরাপত্তার ছবিতে সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের সামনে অপেক্ষা করা এক রোগীর মহিলা পরিজনের কথায়, আগের তুলনায় এখন নিরাপত্তা অনেক বেশি। তাঁর দাবি, আগে হাসপাতালে এত সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী বা পুলিশ মোতায়েন থাকত না। জরুরি সময়ে চিকিৎসক পাওয়াও সবসময় সহজ ছিল না। এখন বিভিন্ন ওয়ার্ডের সামনে সিআইএসএফ জওয়ান থাকছেন। জরুরি পরিস্থিতিতেও চিকিৎসক পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি তাঁর।

একই কথা বলছেন আরও কয়েক জন রোগীর পরিজন। তাঁদের বক্তব্য, শুধু নিরাপত্তাই নয়, চিকিৎসা পরিষেবাতেও পরিবর্তন এসেছে। জরুরি পরিস্থিতিতে রোগী ছটফট করছেন, অথচ চিকিৎসকের দেখা মিলছে না—দু’বছর আগের সেই আতঙ্কের ছবির তুলনায় এখন ২৪ ঘণ্টাই চিকিৎসক পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে দাবি তাঁদের।

হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে কর্মরত মহিলা কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেছে ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’। ইআরএস থেকে ক্যান্টিন, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মীদের বক্তব্যেও একই সুর। ২০২৪-এর ঘটনার পরে রাতের ডিউটি নিয়ে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কমেছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি তাঁদের নিরাপত্তার অনুভূতি বাড়িয়েছে। রাতে কাজ করলেও এখন আগের মতো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয় না বলেই দাবি তাঁদের।

আরজি করের সুপার ডা. তাপস প্রামাণিকের বক্তব্যেও উঠে এসেছে নিরাপত্তার বিষয়টি। তাঁর কথায়, ঘটনার পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে হাসপাতালে সিআইএসএফ মোতায়েন করা হয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে আরজি করে নিরাপত্তার কোনও অভাব নেই। তবে তাঁর মতে, শুধু আরজি কর নয়, শহরের প্রতিটি হাসপাতালেই এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যাতে আর কোনও হাসপাতালের ভিতরে এমন ঘটনা না ঘটে।

তাঁর আরও দাবি, সরকার পরিবর্তনের পরে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী যাতে নিজেদের কাজে গাফিলতি না করে, সে দিকে নজর রাখা হচ্ছে। আগের তুলনায় পুলিশের সক্রিয়তাও বেড়েছে বলে তাঁর মত। কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের পর হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেকটাই সক্রিয় হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

তবু দু’বছর আগের রাতটাকে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ আরজি করের করিডরে রাত ন’টার সেই সিআইএসএফের উপস্থিতি, ওয়ার্ডের সামনে টহল, মহিলা কর্মীদের নিশ্চিন্তে কাজ করার ছবি— সবই যেন সেই ভয়াবহ রাতের বিপরীতে দাঁড়ানো এক নতুন বাস্তবতা।

অভয়ার মৃত্যুর দু’বছর পরে আরজি করে নিরাপত্তার ছবি বদলেছে- এটাই আপাতত সবচেয়ে বড় বার্তা। কিন্তু সেই রাতের শিক্ষা একটাই, নিরাপত্তায় সামান্য ফাঁকও যেন আর কোনও দিন কোনও হাসপাতালের ভিতর আর একজনও ‘অভয়া’র জন্ম না দেয়।