আর মাত্র ৩৭ দিন বাকি। তারপরেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো (Durga Puja)। নীল আকাশে পেঁজা তুলো মেঘ ভেসে বেরালেই মন উদাস হয়ে যায়। আর শিউলির সুবাস জানান দিয়ে যায় ‘শরৎ এসেছে গলির আকাশে’। দুর্গাপুজো (Durga Puja) মানেই জাত-ধর্ম নির্বিশেষ সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের এক হয়ে ওঠা।
তবে এবছর রাজ্যে পালাবদল হয়ে গিয়েছে। এসেছে নতুন সরকার (Suvendu Adhikari)। বেশ কিছু দিন ধরেই রাজ্যে আলোচনার কেন্দ্রেবিন্দুতে দুর্গাপুজো (Durga Puja)। মধ্যপ্রদেশের ‘বাগেশ্বর বাবা’ তথা ধীরেন্দ্র কুমার শাস্ত্রী সেই আলোচনায় ধুয়ো দিয়ে গিয়েছেন। দুর্গাপুজোয় (Durga Puja) আমিষ না নিরামিষ খাওয়া হবে তা নিয়ে এখন রাজ্য-রাজনীতি সরগরম।
তার উপর সরকারি বিজ্ঞাপনে (Suvendu Adhikari) মা দুর্গার ১১ হাত নিয়ে আলোচনা আরও তুঙ্গে উঠেছে। যদিও এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী (Suvendu Adhikari)। ২ থেকে শুরু করে ৩২ পর্যন্ত বিভিন্ন সংখ্যক হাতের দুর্গার (Durga Puja) এ পর্যন্ত সন্ধান মিলেছে। যদিও হাতের সংখ্যা সব সময়েই জোড়সংখ্যক। ৩, ৫,৭ ও ১১ হাতের দুর্গার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: দশ হাতে অস্ত্র, অথচ অসুর চিনতে এত ভয়!
পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, দুই মেদিনীপুর এবং পূর্ব বর্ধমানে বেশ কিছু প্রাচীন বনেদি পরিবারে এখনও ১২ থেকে ১৮ হাতের দুর্গার পুজো (Durga Puja) হয়ে থাকে। শাক্ত শাস্ত্র ও প্রাচীন পারিবারিক রীতি মেনেই এই পুজো হয়ে থাকে।
পশ্চিম মেদিনীপুরের কনাসোলের ঝাড়েশ্বরনাথ মন্দিরে প্লাস্টারের তৈরি দুর্গামূর্তি (Durga Puja) রয়েছে। তাতে ১৮টি হাত দেখা যায়। একই ভাবে পূর্ব মেদিনীপুরে মাংলইয়ের রাধা দামোদর মন্দিরে রয়েছে টেরাকোটায় তৈরি ১৮ হাতের দুর্গামূর্তি।
বাঁকুড়ার আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, এগুলি সাম্প্রতিক সময়ের তৈরি মূর্তি নয়। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের শিল্পের নির্দশন হিসেবে মন্দিরের দেওয়ালে এই মূর্তিগুলি খোদাই থাকত। মল্ল ও ভান রাজাদের আমলে নির্মিত শিবমন্দিরগুলির সঙ্গে এই শিল্পরীতির যোগ রয়েছে।
বাঁকুড়ার জয়পুর,পাটপুর ও ওন্দায় বেশ কয়েকটি প্রাক্তন জমিদার পরিবার এখনও পূর্বপুরুষদের রীতি মেনে দুর্গাপুজো (Durga Puja) করে থাকে। ছাতনা রাজপরিবারের প্রাক্তন জমিদার-সহ কয়েকটি পরিবারে ১৬ ও ১৮ হাতের দুর্গার আরাধনা করা হয়।
কেশপুরের কাছে কনাসোলের মূর্তিটি ‘অষ্টাদশভুজা মহালক্ষ্মী চণ্ডী’ নামে পূজিত হন। খিলানযুক্ত মন্দিরে অধিষ্ঠিত দেবীকে লাল মালা ও ছৌ মুখোশ দিয়ে সাজানো হয়। তাঁর দুই পাশে রয়েছে কঙ্কালসদৃশ দুই সহচর, যাঁরা দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়।
অন্যদিকে, পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুর এলাকার মাংলইয়ের মন্দিরে টেরাকোটার তৈরি দুর্গামূর্তিকে দেখা যায় সিংহের পিঠে এবং মহিষাসুরমর্দিনীরূপে (Durga Puja) । গবেষক কৌশিক সেনগুপ্তের দাবি, বাংলার মন্দিরগুলি নিয়ে গবেষণার সময় এই তথ্য নথিভুক্ত করেছেন গবেষকেরা।
আরও পড়ুন: ‘অরুণ’ আলোয় অজানা উত্তম
আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, মার্কণ্ডেয় ও কালিকা পুরাণে দুর্গার দ্বাদশভুজা, ষোড়শভুজা এবং অষ্টাদশভুজা রূপের উল্লেখ রয়েছে। ১৮ হাতের রূপটি ‘মহালক্ষ্মী’ বা ‘রাজরাজেশ্বরী’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর হাতে থাকে ত্রিশূল, খড়্গ, চক্র, শঙ্খ, ধনুক-বাণ, বজ্র-সহ বিভিন্ন অস্ত্র।পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় বাংলার বাঁকুড়া, বর্ধমান ও মেদিনীপুর অঞ্চলে তন্ত্রসাধনার প্রবল প্রভাবের কারণে এই বহু-হাতের চণ্ডীর আরাধনা দীর্ঘদিন ধরে টিকে রয়েছে বলে গবেষকদের মত।
চন্দ্রকোনা, ছাতনা, ওন্দা ও কাটোয়ার কয়েকটি বনেদি পরিবারের পুরোহিতরাও জানিয়েছেন, তাঁদের পারিবারিক শাস্ত্রে রাজরূপে ১৬ বা ১৮ হাতের দুর্গার পুজোর বিধান রয়েছে। তাঁদের মতে, অষ্টাদশ শতকের পর বারোয়ারি পুজোর প্রসারের সঙ্গে দশভুজা দুর্গার (Durga Puja) জনপ্রিয়তা বাড়ে। তবে রাঢ় বাংলায় পুরনো বহু-হাতের চণ্ডী আরাধনার ঐতিহ্য এখনও বজায় রয়েছে।
বর্তমানে বাঁকুড়া শহরের লালবাজার, মাচানতলা ও কেরানিটোলা, পূর্ব মেদিনীপুরের খড়্গপুর এবং পূর্ব বর্ধমানের আলমগঞ্জ ও কাটোয়াতেও কয়েকটি আধুনিক পুজো কমিটি ১২ থেকে ১৮ হাতের দুর্গামূর্তি তৈরি করাচ্ছে। ঐতিহ্যপ্রেমীদের মতে, এর মাধ্যমে অজান্তেই বাংলার বহু শতাব্দী প্রাচীন মন্দিরকেন্দ্রিক দুর্গা (Durga Puja) আরাধনার একটি বিশেষ ধারাই যেন নতুন করে ফিরে আসছে।
দেখুন:




