দুই মায়ের আবেদন মঞ্জুর করলেন হাইকোর্টে বিচারপতি অমৃতা সিনহা। অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত সন্তানের পরিচর্যার স্বার্থে বাড়ির কাছাকাছি স্কুলে বদলির আবেদন খারিজ হওয়ায় দুই শিক্ষিকা ইন্দ্রাণী বসু ও তনুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা হাইকোর্টে দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, রাজ্যের স্কুল সার্ভিস কমিশনের জেনারেল ট্রান্সফার অন স্পেশাল গ্রাউন্ড এন্ড রিয়েললোকেশন রুলস, ২০১৫ অর্থাৎ কোনও বিশেষ কারণে যেমন, গুরুতর অসুস্থতা, প্রতিবন্ধকতা, পারিবারিক সমস্যা, স্বামী-স্ত্রীর একই কর্মস্থল ইত্যাদি ক্ষেত্রে বদলির আবেদন করা যাবে।
আবেদন করার শর্ত ও পদ্ধতি, কর্মস্থল বা পদ পুনর্বিন্যাসের নিয়মের পাশাপশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার মধ্যে বিধিতে অটিজম-সহ মানসিক ও স্নায়ুবিক বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতাকে বিশেষ কারণে বদলির আওতায় রাখা হয়নি। ফলে তাঁরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এটি সংবিধানের ১৪ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।
আবেদনকারী ইন্দ্রাণী বসু ও তনুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষের আইনজীবী ফিরদৌস শামিম ও গোপা বিশ্বাস জানান, একজন ২০০৭ সালে উত্তর ২৪ পরগনার ঘোনজা হাই স্কুলে বাংলা বিষয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। অন্য আবেদনকারী ২০১৩ সালে পুরুলিয়ার মানবাজার গার্লস হাই স্কুল (উচ্চমাধ্যমিক)-এ ইংরেজির সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। দু’জনেরই সন্তান অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত। তাঁদের দাবি, সন্তানের চিকিৎসা ও পরিচর্যার জন্য বাড়ির কাছাকাছি কর্মস্থলে বদলি অত্যন্ত জরুরি।
আবেদনকারীদের আইজীবীদের আরও অভিযোগ, তাঁরা ‘উৎসশ্রী’ পোর্টালের মাধ্যমে একাধিকবার বদলির আবেদন করলেও তা বারবার ফেরত পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে জানানো হয়, মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের শংসাপত্রে উল্লেখিত রোগ সরকারি নির্দেশিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়। অন্য ক্ষেত্রে আবেদন ‘গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করে খারিজ করা হয়। ফলে তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনসম্মত ও ন্যায্যভাবে আবেদন বিবেচনা করেনি।
আবেদনকারীরা আদালতে দাবি করেছেন, বর্তমান নিয়মে ৪০ শতাংশ বা তার বেশি শারীরিক প্রতিবন্ধকতার ভিত্তিতে বদলির সুযোগ থাকলেও অটিজমের মতো মানসিক ও স্নায়ুবিক বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তাঁদের মতে, এটি শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের মধ্যে অযৌক্তিক বৈষম্য তৈরি করছে, যা সংবিধানের সমতার অধিকার এবং জীবন ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারের পরিপন্থী।
মামলায় আরও প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ২০১৫ সালের বিধির ৪ নম্বর নিয়ম সংবিধানবিরোধী ও অতি ক্ষমতাবহির্ভূত কি না, প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আবেদন খারিজ করে আইন লঙ্ঘন করেছে কি না। এর পাশাপাশি স্কুল কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র না দেওয়া এবং বদলির আবেদন কার্যকর না করার সিদ্ধান্তও চ্যালেঞ্জ করে তাঁরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
আবেদনকারীদের দাবি, অটিজমে আক্রান্ত সন্তানের সবসময়ের পরিচর্যার বিষয়টি মানবিক ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে তাঁদের বাড়ির নিকটবর্তী স্কুলে বদলির সুযোগ দেওয়া উচিত। এই পরিস্থিতিতে আদালতের হস্তক্ষেপই একমাত্র ভরসা বলে তাঁরা বিষয়টি আদালতের নজরে নিয়ে আসেন।
বিচারপতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে রায় দিতে গিয়ে জানিয়েছেন, রাজ্যে নতুন সরকার গঠন হয়েছে। ফলে উৎসশ্রী পোর্টাল কার্যক্রম পরিচালনা করতে সময় লাগছে। কারণ ইতিমধ্যে জনগণনার জন্য প্রস্তুতি চলছে। তাই অনলাইন অথবা অফলাইনে আট সপ্তাহের মধ্যে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে হবে।




