মাত্র ১৪ মাস বয়সে ধরা পড়েছিল বিরল ও জটিল ক্যান্সার নিউরোব্লাস্টোমা। তৃতীয় পর্যায়ের সেই ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের শেষে তিন বছরেরও বেশি সময় পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে মায়ের হাত ধরে ফের কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ফিরল সেই শিশু। চিকিৎসকদের কথায়, রাজ্যে কম বয়সি শিশুর ক্ষেত্রে এই ধরনের চিকিৎসার এমন সাফল্য এই প্রথম।
তিন বছর তিন মাস আগে পেট ফোলা ও তীব্র পেটব্যথা নিয়ে শিশুটিকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হয়। একাধিক পরীক্ষার পর ধরা পড়ে, সে নিউরোব্লাস্টোমায় আক্রান্ত। এটি আদি স্নায়ুকোষের বিরল ক্যান্সার, যা সাধারণত পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগ ধরা পড়ে ফাইনাল স্টেজে।
চিকিৎসকরা জানান, নিউরোব্লাস্টোমা, জার্মসেল টিউমার, হেপাটোব্লাস্টোমা, উইলমস টিউমার ও রেটিনোব্লাস্টোমা— এই পাঁচ ধরনের বিরল শিশু ক্যান্সারের ক্ষেত্রে রোগ তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছালে শুধু কেমোথেরাপি যথেষ্ট নয়। সে ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপির পাশাপাশি রোগীর নিজের অঙ্কুরকোষ (স্টেম সেল) সংগ্রহ করে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে রোগমুক্তির সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়ে এবং ক্যান্সার ফিরে আসার আশঙ্কাও কমে।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৩ সালের এপ্রিলে মাত্র ১৪ মাস বয়সি এই শিশুর শরীর থেকে অঙ্কুরকোষ সংগ্রহ করে প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। চিকিৎসার পর নিয়ম মেনে তিন বছরের বেশি সময় ধরে তার শারীরিক অবস্থার উপর নজর রাখা হয়। সম্প্রতি পরীক্ষায় দেখা যায়, শিশুটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং রোগমুক্ত।
এই সাফল্যের নেপথ্যে ছিল মেডিক্যাল কলেজের অঙ্কোলজি, ব্লাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন এবং শিশু বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা। চিকিৎসকদের বক্তব্য, মাত্র ৮ কেজি ওজনের শিশুর শরীরে এই জটিল চিকিৎসা চালানো ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা ধরে বিশেষ পদ্ধতিতে রক্ত থেকে অঙ্কুরকোষ সংগ্রহ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় রক্তস্বল্পতা, ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়া, শরীরের তাপমাত্রা হ্রাস, সংক্রমণ-সহ নানা জটিলতার ঝুঁকি ছিল। সেই সব পরিস্থিতি সফলভাবে সামাল দিয়ে চিকিৎসা সম্পন্ন করা হয়।
অঙ্কোলজি বিভাগের প্রধান ডা. স্বর্ণবিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, শিশুটির অবস্থা প্রথমে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ছিল। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তিন বছর পরে যখন সে সুস্থ অবস্থায় নিজের পায়ে হেঁটে হাসপাতালে আসে, তখন চিকিৎসক দল হিসেবে সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ব্লাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. প্রসূন ভট্টাচার্য জানান, এত কম ওজনের শিশুর শরীরে অঙ্কুরকোষ সংগ্রহ ও প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। বিভিন্ন বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে। শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. কল্পনা দত্তের কথায়, এত কম বয়সি শিশুর ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা পশ্চিমবঙ্গে প্রথম। চিকিৎসার সময় ও পরবর্তী পর্যায়ে শিশুটিকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল।




