মায়ের পেনশনের হিসাবের ভুলের মাশুল কেন গুনবেন মেয়ে? মায়ের জীবদ্দশায় যে ভুল ধরতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর, সেই ভুলের দায়ে তাঁর মৃত্যুর পরে অবিবাহিত মেয়ের পারিবারিক পেনশন থেকে টাকা কেটে নেওয়া যাবে না। মানবিকতা ও ন্যায়ের এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিল কলকাতা হাইকোর্ট।
বিচারপতি অমৃতা সিনহার নির্দেশ, মৃত শিক্ষিকার অবিবাহিত মেয়ে পৌষালি ঘোষকে তাঁর প্রাপ্য পারিবারিক পেনশন কোনওরকম কাটছাঁট ছাড়াই দিতে হবে। শুধু তাই নয়, ২০২৩ সালের ৬ জুন থেকে প্রাপ্য বকেয়া পেনশনের উপর বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে সরল সুদও দিতে হবে রাজ্যকে।
মামলাকারী পৌষালি ঘোষের পক্ষের আইনজীবী অরুন কুমার মাইতি আদালতে জানান, পৌষালির মা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা ছিলেন। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর তাঁর পেনশন পেমেন্ট অর্ডার বা পিপিও জারি হয়। ২০২৩ সালের ৫ জুন তাঁর মৃত্যু হয়। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে পেনশন পাওয়ার সময় তাঁর প্রাপ্য নিয়ে কোনও আপত্তি তোলেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পরে ২০২৩ সালের আগস্টে পারিবারিক পেনশনের আবেদন করেন অবিবাহিত মেয়ে পৌষালি।
আবেদনের ভিত্তিতে তাঁর নামে পারিবারিক পেনশন মঞ্জুর হয় এবং ২০২৫ সালের ২৪ জুন পিপিও জারি করা হয়। কিন্তু সেখানেই জুড়ে দেওয়া হয় শর্ত। কর্তৃপক্ষের দাবি, মায়ের পেনশনের হিসাবের ভুলে অতিরিক্ত টাকা দেওয়া হয়েছিল। সেই টাকা সমন্বয় করতে মেয়ের পারিবারিক পেনশন থেকে কম টাকা দেওয়া হবে। অর্থাৎ, মায়ের জীবদ্দশায় যে ভুলের জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়নি, সেই ভুলের আর্থিক বোঝা এসে পড়ে মৃত্যুর পরে তাঁর মেয়ের উপর। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন পৌষালি।
আদালতে তাঁর আইনজীবীদের যুক্তি ছিল, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকার প্রাপ্য হিসাব করে কর্তৃপক্ষই তাঁর প্রাপ্য অর্থ নির্ধারণ করেছিল। সেই টাকা গ্রহণের ক্ষেত্রে মৃত শিক্ষিকার কোনও ভুল বা অসৎ উদ্দেশ্যের প্রমাণ নেই। ফলে তাঁর মৃত্যুর পরে মেয়ের প্রাপ্য পারিবারিক পেনশন থেকে সেই অর্থ কেটে নেওয়া যায় না। সওয়ালের সমর্থনে সুপ্রিম কোর্টের একটি মামলার রায়ের উল্লেখ করা হয়।
রাজ্যের তরফে অবশ্য জানানো হয়, পেনশনের হিসাবে ভুল ধরা পড়ায় অতিরিক্ত দেওয়া অর্থ পারিবারিক পেনশন থেকে সমন্বয় করা উচিত। কিন্তু সেই যুক্তিতে সায় দেয়নি আদালত। বিচারপতি অমৃতা সিনহা পর্যবেক্ষণ করেন, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকার পেনশনের হিসাবে ভুল শনাক্ত করতে কর্তৃপক্ষের এক দশকেরও বেশি সময় লেগেছে। ততদিনে ওই শিক্ষিকার মৃত্যু হয়েছে। তাঁর অবিবাহিত মেয়ে পারিবারিক পেনশনের আবেদন করার সময়ই পুরনো ভুলটি সামনে আসে।
আদালতের বক্তব্য, অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার পিছনে মৃত শিক্ষিকার কোনও দোষ বা ভুল তথ্য দেওয়ার প্রমাণ নেই। অবসরের সময় কর্তৃপক্ষই তাঁর প্রাপ্য হিসাব করে অর্থ দিয়েছিল। সেই অর্থ তিনি জীবদ্দশায় গ্রহণ করেছেন। এখন তাঁর মৃত্যুর পরে মেয়ের পারিবারিক পেনশন থেকে সেই টাকা কেটে নেওয়ার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
সুপ্রিম কোর্টের মামলার রায়ের উল্লেখ করে বিচারপতি জানান, অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের ক্ষেত্রে যেখানে অতিরিক্ত অর্থ পুনরুদ্ধারের উপর বিধিনিষেধ রয়েছে। সেখানে মৃত কর্মীর ক্ষেত্রে এমন পুনরুদ্ধার আরও বেশি করে অগ্রহণযোগ্য। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ, কথিত অতিরিক্ত অর্থ কোনওভাবেই পৌষালির প্রাপ্য পারিবারিক পেনশন থেকে কেটে নেওয়া বা সমন্বয় করা যাবে না।
বারাসত-২ ট্রেজারি অফিসারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, পৌষালির প্রাপ্য পারিবারিক পেনশন অবিলম্বে আর কোনও বিলম্ব না করে, ২০২৩ সালের ৬ জুন থেকে কার্যকর করে দিতে হবে। বিলম্বে অর্থ পাওয়ার কারণে বকেয়া টাকার উপর প্রাপ্যতার দিন থেকে প্রকৃত অর্থপ্রদানের দিন পর্যন্ত বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে সরল সুদও দিতে হবে।
সেই সঙ্গে আদালত জানিয়ে দিয়েছে, অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের জন্য কোনও আধিকারিকের ভুল দায়ী হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে। আদালতের এই নির্দেশের তাৎপর্য একটাই, প্রশাসনের হিসাবের ভুলের দায়ে নির্দোষ উত্তরাধিকারীর ন্যায্য পাওনা কেড়ে নেওয়া যায় না। সরকারি দপ্তরের ভুলের বোঝা নয়, প্রাপ্য অধিকার নিয়েই বাঁচার সুযোগ পেলেন এক অবিবাহিত মেয়ে।




