নিট-স্নাতক ২০২৬-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস-কাণ্ড ঘিরে দেশজুড়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে এটি শুধু একটি সাধারণ অনিয়ম নয়, বরং দেশের পরীক্ষাব্যবস্থার উপর গভীর আঘাত। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং জাতীয় পরীক্ষামূলক সংস্থার শীর্ষ কর্তার বক্তব্যে প্রকাশ্যে এসেছে চরম অসঙ্গতি। আর সেই কারণেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন পরীক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকেরা।
সংসদের স্থায়ী কমিটির সামনে হাজির হয়ে জাতীয় পরীক্ষামূলক সংস্থার শীর্ষ করতে অভিষেক সিং দাবি করেন, নিটের প্রশ্নপত্র কোনও ভাবেই ব্যবস্থার ভিতর থেকে ফাঁস হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরীক্ষার মূল প্রযুক্তিগত কাঠামো অক্ষত ছিল এবং কোনও ধরনের ডিজিটাল অনুপ্রবেশ ঘটেনি। কিন্তু কয়েক দিন আগেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলে বড়সড় ভাঙন তৈরি হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এই ব্যর্থতার দায়ও কেন্দ্র সরকার নিয়েছে।
Advertisement
এই দুই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। যদি কোনও গলদ না-ই ঘটে থাকে, তবে শিক্ষামন্ত্রী কেন প্রশাসনিক ব্যর্থতার কথা বললেন? আবার যদি সত্যিই শৃঙ্খলে ফাঁক থেকে থাকে, তবে পরীক্ষামূলক সংস্থা কীভাবে দাবি করছে যে সব কিছু সুরক্ষিত ছিল?
Advertisement
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে ‘ব্যবস্থা’ শব্দটির অর্থ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে ব্যবস্থা মানে শুধু যন্ত্রনির্ভর তথ্যভাণ্ডার নয়। প্রশ্নপত্র তৈরি, মুদ্রণ, প্যাকেটবন্দি করা, বিভিন্ন রাজ্যে পৌঁছে দেওয়া, ভাণ্ডারে সংরক্ষণ, পরীক্ষাকেন্দ্রে নিরাপত্তা ও নজরদারি— এই পুরো শৃঙ্খলই একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। আর তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে, এই শৃঙ্খলের কোনও না কোনও স্তর থেকেই প্রশ্ন বাইরে পৌঁছে গিয়েছে।
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অনুসন্ধানে ইতিমধ্যেই একাধিক গ্রেফতারি হয়েছে। রসায়নের শিক্ষক পি ভি কুলকার্নিকে এই চক্রের মূল মাথা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রশ্ন ও উত্তর মোটা টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অর্থের লেনদেন, দালালচক্র ও সংগঠিত জাল সম্পর্কে একাধিক তথ্যও উঠে এসেছে তদন্তে।
এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষামূলক সংস্থার বক্তব্য আরও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বহু অভিভাবকের অভিযোগ, বাস্তব ব্যর্থতা আড়াল করতে এখন ভাষার খেলায় নামছে কর্তৃপক্ষ। কারণ একজন পরীক্ষার্থীর কাছে সবচেয়ে বড় সত্য হল প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। সেটি কীভাবে বাইরে এল, সেই তর্ক তাঁদের কাছে গৌণ।
এই কাণ্ডের পর কেন্দ্রীয় স্তরে নতুন করে ভাবনা শুরু হয়েছে। সূত্রের খবর, ভবিষ্যতে কলম-কাগজের বদলে সম্পূর্ণ যন্ত্রনির্ভর পদ্ধতিতে নিট নেওয়ার পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় গুরুতর নিরাপত্তাহীনতা না থাকলে এত বড় পরিবর্তনের কথা ভাবত না কেন্দ্র। ফলে নিট-কাণ্ড এখন শুধু একটি পরীক্ষা নয়, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
Advertisement



