জল নেমেছে। কিন্তু বিপর্যয় এখনও কাটেনি। বরং নেপালে হড়পা বানের ভয়াবহতার পর এবার সামনে এসেছে আরও এক অসহায়তার ছবি। বুধবারের ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেড়ে নিয়েছে বহু মানুষের প্রাণ। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে মৃতদেহ রাখার জায়গা মিলছে না। মর্গ উপচে পড়েছে। হাসপাতালের ঠান্ডা ঘরেও আর জায়গা নেই। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোথাও পরিত্যক্ত ভবনকে অস্থায়ী মর্গ বানানো হচ্ছে। কোথাওবা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পাঠানো হচ্ছে দেহ। তার মধ্যেই এখনও নিখোঁজ প্রায় ১৫০০ জন। প্রশাসনের আশঙ্কা, নিখোঁজ বহু মানুষকেই জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করার আশা প্রায় ক্ষীণ। শুক্রবার সকালে নেপালের একাধিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫০০ হয়েছে।
বুধবার সকালে তিব্বত সীমান্ত ঘেঁষা নেপালের রাসুয়া জেলার উপরে আচমকাই নেমে এসেছিল জল-কাদার মৃত্যুমিছিল। ভোটেকোশী নদীতে হড়পা বান। প্রবল স্রোতে নদীর জল আর কাদার সঙ্গে ভেসে যায় গ্রামের পর গ্রাম। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, মানুষ কিছুই রেহাই পায়নি। বড় বড় বাস-গাড়িগুলিকে মোচার খোলার মতো ভেসে যেতে দেখা গিয়েছে। তার পর থেকেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে উদ্ধারকাজ। সেই উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে ভয়াবহ ছবি। প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে দেহ উদ্ধারের সংখ্যা। কিন্তু সেই দেহ রাখার জায়গাই মিলছে না। ইতিমধ্যেই একাধিক দেহ সৎকার করা হয়েছে। তবে অশনাক্ত দেহের সংখ্যাই নেপাল সরকারের মাথা ব্যথার কারণ। বিপর্যয়-পরবর্তী সঙ্কটে কার্যত দিশাহীন নেপাল সরকার।
পোখরা অ্যাকাডেমি অফ হেলথ সায়েন্সের অধিকর্তা সুশীল আরিয়াল বলেছেন, ‘মর্গে আপাতত ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দেহ রাখা হচ্ছে। এভাবে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৪ দিন দেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব। তার পরে আর রাখা যাবে না। এর মধ্যে পরিবারের কেউ এসে শনাক্ত করতে না পারলে অশনাক্ত দেহ সৎকার করা ছাড়া উপায় থাকবে না। গণসৎকারের বিষয়ে নেপাল সরকার এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ঠিকই, কিন্তু পরিস্থিতি যে সে দিকেই এগোচ্ছে তা স্পষ্ট।’ স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, বহু দেহ জলের তোড়ে ভেসে কয়েক কিলোমিটার দূরে চলে গিয়েছে। তাই মৃতের পরিচিতদের দেহ শনাক্ত করার জন্য বেশ কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। রাস্তাঘাটের অবস্থাও খুব খারাপ। তাই অনেকেই পরিজনদের খোঁজে সময়মতো হাসপাতাল বা মর্গে পৌঁছতে পারছেন না।
চিতওয়ান জেলাতেও একই ছবি। জেলার সব মর্গ মিলিয়ে একসঙ্গে মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি দেহ রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। ইতিমধ্যেই সেগুলি পূর্ণ। তার মধ্যেই জেলায় নতুন করে উদ্ধার হয়েছে আরও ১৩৭টি দেহ। বাধ্য হয়ে কয়েকটি পরিত্যক্ত ভবন চিহ্নিত করে সেখানে অস্থায়ীভাবে আরও ২৫০টি দেহ রাখার ব্যবস্থা করেছে জেলা প্রশাসন। কোথাও আবার জায়গা না থাকায় দেহ পাঠানো হচ্ছে পাশের জেলাতেও। তবে অশনাক্ত দেহ সৎকারের আগে পরিবারের শেষ আশাটুকু বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে প্রশাসন। চিতওয়ান জেলার সরকারি আধিকারিকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, প্রতিটি অশনাক্ত দেহের ছবি ও ভিডিও করা হবে। সংগ্রহ করা হবে ডিএনএ-র নমুনা। উদ্দেশ্য হল, পরে কোনও পরিবার নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে এলে যাতে শনাক্তকরণ সম্ভব হয়।
কিন্তু দেহ সাময়িক সংরক্ষণেও রয়েছে সঙ্কট। কারণ দেহ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় রাসায়নিক এবং শুকনো বরফ জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছে নেপাল প্রশাসন। অন্যদিকে, মর্গের সামনে ভিড় বাড়ছে নিখোঁজ মানুষের পরিজনদের। হাতে প্রিয়জনের ছবি। শেষবারের মতো স্বজনকে খুঁজে পাওয়ার আশায় তাঁরা এক মর্গ থেকে অন্য মর্গ, এক দরজা থেকে আর এক দরজায় ঘুরছেন।




