• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 24 October, 2026

বক্সাইট খনির বিরুদ্ধে আদিবাসী আন্দোলনের জের: গ্রেপ্তার চিকিৎসক র‍্যান্ডাল সিকোয়েরা ও দলিত নেতা লক্ষ্মণ নায়েক, প্রবল বিতর্ক

ওড়িশার সিজিমালি ও কুত্রুমালি পাহাড়ে বক্সাইট খননের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জেরে কালাহান্ডি থেকে গ্রেপ্তার চিকিৎসক ডা. সিকোয়েরা ও দলিত নেতা লক্ষ্মণ নায়েক। এফআইআরে নাম না থাকা সত্ত্বেও খুনের চেষ্টার মামলা ঘিরে তুঙ্গে বিতর্ক।

বক্সাইট খনির বিরুদ্ধে আদিবাসী আন্দোলনের জের: গ্রেপ্তার চিকিৎসক র‍্যান্ডাল সিকোয়েরা ও দলিত নেতা লক্ষ্মণ নায়েক, প্রবল বিতর্ক

Odisha Doctor Randall Sequeira Arrested in Case Linked to Anti-Mining Protest (Image: X/@theliverdoc)

আদিবাসী অধ্যুষিত পাহাড়ে কর্পোরেট সংস্থার বক্সাইট খননের (Bauxite Mining in Odisha) বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ‘অপরাধে’ ফের কি দমনপীড়নের ছবি সামনে এল ওড়িশায়? কালাহান্ডি ও রায়গড়ার প্রত্যন্ত গ্রামে বছরভর যাঁর কাজ ছিল বিনা চিকিৎসায় ধুঁকতে থাকা আদিবাসীদের স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া, সেই তরুণ চিকিৎসক ডা. র‍্যান্ডাল সিকোয়েরা (Dr. Randall Sequeira) এবং বিশিষ্ট প্রতিবাদী দলিতমুখ লক্ষ্মণ নায়েককে (Laxman Naik) মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেল ওড়িশা পুলিশ। এফআইআরে (FIR) নাম না থাকা সত্ত্বেও তাঁদের বিরুদ্ধে চাপানো হয়েছে খুনের চেষ্টা, ডাকাতি এবং অস্ত্র আইনের মতো একগুচ্ছ জামিন-অযোগ্য (Non-Bailable Charges) ধারা। মানবাধিকার সংগঠন ও সমাজকর্মীদের অভিযোগ, সিজিমালি (Sijimali) ও কুত্রুমালি (Kutrumali) পাহাড়ে বৃহৎ কর্পোরেট গোষ্ঠীর খননের রাস্তা পরিষ্কার করতেই পরিকল্পিত ভাবে এই ধরপাকড় চালাচ্ছে প্রশাসন।

মধ্যরাতে অভিযান

গত ১৬ অক্টোবর রাত ১১টা নাগাদ দক্ষিণ ওড়িশার কালাহান্ডি (Kalahandi) জেলায় ডা. র‍্যান্ডাল সিকোয়েরার বাড়িতে আচমকা হানা দেয় পুলিশের একটি দল। সেখান থেকেই চিকিৎসক সিকোয়েরা এবং মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক তথা দলিত অধিকার কর্মী লক্ষ্মণ নায়েককে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকদের সংগঠন ‘মেডিকো ফ্রেন্ড সার্কেল’ (Medico Friend Circle) এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের দাবি, গ্রেপ্তারির সময় তাঁদের কোনও আইনজীবীর (Legal Access) সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, এমনকি পরিবারের সদস্যদেরও কিছু জানানো হয়নি।

পুলিশ সূত্রে খবর, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রায়গড়া জেলার কান্তামাল (Kantamal Village) গ্রামে খনি-বিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীদের যে সংঘর্ষ হয়েছিল, সেই ঘটনাতেই দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এপ্রিলের সেই ঘটনায় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটিয়েছিল এবং পাল্টা প্রতিরোধে দু’পক্ষেরই বেশ কয়েকজন জখম হন। বর্তমানে ডা. সিকোয়েরা ও লক্ষ্মণ নায়েককে রায়গড়া সাব-জেলে (Rayagada Sub-Jail) বন্দি রাখা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হল, মূল এফআইআরে তাঁদের দু’জনের কারও নাম না থাকলেও পুলিশ এখন তাঁদের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টা (Attempt to Murder), মারণাস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা (Rioting with Deadly Weapon), সশস্ত্র ডাকাতি (Dacoity), প্রাণনাশের হুমকি এবং অস্ত্র আইনের (Arms Act) মতো গুরুতর ধারা রুজু করেছে।

কে এই ডা. সিকোয়েরা এবং লক্ষ্মণ নায়েক?

মুম্বইয়ে বেড়ে ওঠা র‍্যান্ডাল সিকোয়েরা বেঙ্গালুরুর খ্যাতনামা সেন্ট জনস মেডিক্যাল কলেজ (St. John’s Medical College, Bengaluru) থেকে এমবিবিএস এবং ইন্টারনাল মেডিসিনে এমডি (MD in Internal Medicine) ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু অভিজাত কর্পোরেট হাসপাতালের কেরিয়ার ছেড়ে গত পাঁচ-ছ’বছর ধরে তিনি ওড়িশার কালাহান্ডি ও রায়গড়ার প্রত্যন্ত আদিবাসী জনপদে কাজ করছেন। ‘স্বাস্থ্য স্বরাজ’-এর (Swasthya Swaraj) মতো জনস্বাস্থ্য উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত সিকোয়েরার মূল দর্শনই হল, শুধুমাত্র প্রেসক্রিপশন লিখে রোগ সারানো সম্ভব নয়, যদি না মানুষের কাছে বিশুদ্ধ জল, দূষণমুক্ত বাতাস এবং পুষ্টিকর খাবারের অধিকার (Social Determinants of Health) থাকে। খনি অঞ্চলের দূষণে আদিবাসীদের স্বাস্থ্য ও জীবিকা কীভাবে বিপন্ন হচ্ছে, তা নিয়ে নিবিড় কাজ করছিলেন তিনি।

সিকোয়েরার গ্রেফতারির পর এক্স হ্যান্ডলে সরব হয়েছেন দেশের বিশিষ্ট হেপাটোলজিস্ট তথা সেন্ট জনস মেডিক্যাল কলেজে তাঁর সিনিয়র ডা. সিরিয়াক অ্যাবি ফিলিপস (Dr. Cyriac Abby Philips, যিনি ‘দ্য লিভার ডক’ নামে পরিচিত)। ২০১৮ সালের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে তিনি লেখেন, ভরা বর্ষায় দুর্গম কুত্রুমালি পাহাড়ের খাড়াই ভেঙে ‘কুটিয়া কোন্ধ’ (Kutiya Kondh) জনজাতির মানুষদের জন্য স্বাস্থ্যশিবির করতে গিয়েছিলেন র‍্যান্ডাল। এমন একজন মানবিক চিকিৎসকের কণ্ঠস্বর যেন জেলের অন্ধকারে চাপা পড়ে না যায়, চিকিৎসক মহলের কাছে সেই আবেদনই জানিয়েছেন তিনি। অন্য দিকে, র‍্যান্ডালের মা ন্যান্সি সিকোয়েরা (Nancy Sequeira) এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমার ছেলে আদিবাসীদের অধিকার ও সম্মানের জন্য লড়ছে। আমরা ওর পাশে আছি এবং বিশ্বাস করি সত্যের জয় হবেই।’

পাশাপাশি, ধৃত লক্ষ্মণ নায়েক ওড়িশার খনি-বিরোধী মঞ্চ ‘মা মাটি মালি সুরক্ষা মঞ্চ’ (Maa Mati Maali Surakhya Manch) এবং ‘সমাজবাদী জন পরিষদ’-এর এক পরিচিত মুখ। দীর্ঘ দিন ধরেই তিনি দলিত ও আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনে সামনের সারিতে রয়েছেন।

বিতর্কের কেন্দ্রে বক্সাইট খনি

এই গ্রেপ্তারির শিকড় লুকিয়ে রয়েছে দক্ষিণ ওড়িশার খনিজ-সমৃদ্ধ পাহাড় ঘিরে চলা ‘জল, জঙ্গল ও জমি’ (Jal, Jangal, Jameen) রক্ষার লড়াইয়ে। কালাহান্ডি ও রায়গড়া সীমান্তে সিজিমালি পাহাড়ে বেদান্ত গোষ্ঠী (Vedanta Group) এবং কুত্রুমালি পাহাড়ে আদানি গোষ্ঠীর (Adani Group) প্রস্তাবিত বক্সাইট খনির বিরুদ্ধে ২০২৩ সাল থেকে ধারাবাহিক আন্দোলন চালাচ্ছে ‘মা মাটি মালি সুরক্ষা মঞ্চ’। স্থানীয় আদিবাসী ও দলিতদের আশঙ্কা, পাহাড় কেটে বক্সাইট তোলা হলে চিরতরে শুকিয়ে যাবে পাহাড়ি ঝরনা, ধ্বংস হবে জঙ্গল এবং চাষবাস।

আন্দোলনকারীদের মূল অভিযোগগুলি হল– বনাধিকার আইন (Forest Rights Act) এবং ‘পেসা’ আইন (PESA Act) অনুযায়ী, ২০২৩ সালে স্থানীয় গ্রামসভাগুলি সর্বসম্মত ভাবে বক্সাইট খননের প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছিল। অভিযোগ, পরে সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতিতে ভয় দেখিয়ে সম্মতি আদায়ের চেষ্টা হয়, যা নিয়ে বর্তমানে ওড়িশা হাই কোর্টে (Orissa High Court) মামলা চলছে। ২০২৩ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত খনি-বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে ৪৩টি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ এবং ১০০ জনেরও বেশি দলিত ও আদিবাসী মানুষ, যাঁদের মধ্যে অনেক মহিলা ও প্রবীণও রয়েছেন, জেলবন্দি হয়েছেন। গত মার্চ মাসেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বিশিষ্ট দলিত নেতা লিঙ্গরাজ আজাদকে (Lingaraj Azad)। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে রায়গড়া জেলায় ডা. সিকোয়েরার প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল জেলা প্রশাসন। কিন্তু ওড়িশা হাই কোর্ট সেই সরকারি নির্দেশকে ‘অযৌক্তিক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে খারিজ করে দিয়েছিল।

পুলিশের সাফাই

গবেষক ও সমাজকর্মী রঞ্জনা পাধি (Ranjana Padhi), ‘হিউম্যান রাইটস ফোরাম’ (Human Rights Forum), ‘রাইট টু ফুড ক্যাম্পেন’, ‘কনসার্নড সিটিজেনস কমিটি’ এবং সিপিআইএমের ওড়িশা রাজ্য কমিটি এই গ্রেপ্তারির তীব্র নিন্দা করেছে। রঞ্জনা পাধির কথায়, ওড়িশায় বক্সাইট খননের পথ মসৃণ করতে রাষ্ট্র ও কর্পোরেট সংস্থার এক শক্তিশালী অক্ষ (State-Corporate Nexus) কাজ করছে। আদিবাসী ও দলিতদের ভয় দেখাতে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে হাতিয়ার করা হচ্ছে। ‘হিউম্যান রাইটস ফোরাম’-এর মতে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়া একজন চিকিৎসককে অপরাধীর তকমা দিয়ে আসলে সমস্ত সংবেদনশীল নাগরিক ও সমাজকর্মীদেরই ভয় দেখানোর বার্তা দিতে চাইছে রাষ্ট্র।

যদিও যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে ওড়িশা পুলিশ। দক্ষিণ-পশ্চিম রেঞ্জের ডিআইজি অখিলেশ্বর সিং (DIG Akhileshvar Singh) গ্রেপ্তারির পক্ষে সওয়াল করে সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে বলেছেন, কালাহান্ডি ও রায়গড়ায় আরও অনেক চিকিৎসক কাজ করছেন, কিন্তু ডা. সিকোয়েরা ছাড়া আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। উনি চিকিৎসা পরিষেবা দিচ্ছিলেন নাকি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের উস্কানি দিচ্ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক এফআইআরে নাম না থাকলেও এপ্রিল মাসের কান্তামাল সংঘর্ষের পরবর্তী তদন্তে দেখা গিয়েছে, পুলিশবাহিনীর উপর হামলার পিছনে সিকোয়েরা ও লক্ষ্মণ নায়েকের প্রত্যক্ষ উস্কানি ছিল।