বিবাহ সম্পর্কিত একটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রশ্ন এখন শীর্ষ আদালতের টেবিলে। স্বামীর হাতে স্ত্রীর ধর্ষণ (marital rape), আইনের চোখে তা কি আদৌ অপরাধ? সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) বুধবার এই মামলার শুনানিতে যে পর্যবেক্ষণ উঠে এল, তাতে স্তম্ভিত হতে হয়। আপাতত মামলার পরিণতি কী হবে, তা হয়তো সপ্তাহ তিনেক পরে জানা যাবে। তবে কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টে আবারও জানিয়েছে, বৈবাহিক ধর্ষণ বলে কিছু হয় কি না, সেটা ঠিক করার অধিকার রয়েছে সংসদের। কোর্টের এ ব্যাপারে কোনও ভূমিকা নেই। যদিও কেন্দ্রের এই বক্তব্য খুব ভালোভাবে নেয়নি সুপ্রিম কোর্ট।
বিয়ে মানেই কি পরাধীন
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (CJI Surya Kant), বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি (Justice Joymalya Bagchi) এবং বিচারপতি ভি মোহনার (Justice V Mohana) বেঞ্চে বুধবার বৈবাহিক ধর্ষণ সংক্রান্ত আবেদনগুলির শুনানি হয়। বেঞ্চের স্পষ্ট মন্তব্য, বিয়ে করলেই একজন নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা (individual autonomy) অস্তিত্বহীন হয়ে যায় না, এই যুক্তি আদালত পুরোপুরি মেনে নিচ্ছে। কিন্তু তার পরেই আসে আসল প্যাঁচ। দেশের ফৌজদারি আইন যা বলছে, তার সীমার মধ্যে থেকেই বিচার করতে হবে বলে মনে করিয়ে দেয় বেঞ্চ।
বিচারপতি বাগচির পর্যবেক্ষণ আরও তীক্ষ্ণ। বিয়ে কোনও নারীর স্বাধীনতা মুছে দিতে পারে না, এই কথাই তিনি ফের বলেন শুনানিতে। প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্র নিজে এই ঘটনাকে ধর্ষণ বলে সংজ্ঞায়িত করবে কি না, সেটাই আসল বিষয়।
কোথা থেকে শুরু এই লড়াই
ভারতীয় দণ্ডবিধির (Indian Penal Code) ৩৭৫ ধারার ব্যতিক্রম ২ (Exception 2 to Section 375) অনুযায়ী, স্বামী যদি প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রীর সঙ্গে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেও যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন, তা ধর্ষণ বলে গণ্য হয় না। ২০২৩ সালে চালু হওয়া নতুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতাতেও (Bharatiya Nyaya Sanhita) একই রকম ছাড় রয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ আইনের চোখে বিয়ের সিলমোহর পড়লেই শারীরিক সম্পর্কে স্ত্রীর সম্মতি স্বতঃসিদ্ধ, এমনটাই ধরে নেওয়া হয়।
এদিনের মামলার শিকড় ২০২২ সালের দিল্লি হাই কোর্টের (Delhi High Court) বিভক্ত রায়ে। বিচারপতি রাজীব শাকধের এই ব্যতিক্রমী ধারাটিকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছিলেন। উল্টো দিকে বিচারপতি সি হরি শঙ্কর জানিয়েছিলেন, বিয়ের মধ্যে যৌন সম্পর্ক প্রত্যাশিতই, তাই ছাড় বহাল থাকা উচিত। এই দ্বিমতই মামলাটিকে টেনে নিয়ে যায় শীর্ষ আদালতে।
কর্নাটক হাই কোর্টের (Karnataka HC) একটি মামলাও এর সঙ্গে জড়িয়ে। হৃষীকেশ সাহু নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাঁর স্ত্রী ধর্ষণ, নিষ্ঠুরতা-সহ একাধিক অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। কন্যাসন্তানকে যৌন নিগ্রহের অভিযোগও ছিল পকসো আইনে (POCSO)। সাহু এই বিতর্কিত ধারার আওতায় সুরক্ষা চেয়ে কর্নাটক হাই কোর্টে যান, কিন্তু ২০২২ সালে বিচারপতি এম নাগপ্রসন্ন তাঁর আবেদন খারিজ করে দেন।
কেন্দ্রের অবস্থান ঘিরে জটিলতা
কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা (Solicitor General Tushar Mehta) আদালতে হাজির ছিলেন। কেন্দ্রের বরাবরের অবস্থান, বিবাহিত জীবনে যৌন সম্পর্ক সংক্রান্ত এই বিষয়টি মূলত সামাজিক প্রশ্ন, নিছক আইনি বিষয় নয়। এই যুক্তি অবশ্য মহিলা অধিকার সংগঠনগুলির কাছে বিতর্কিত। কারণ সামাজিক প্রথার অজুহাতে সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করা যায় কি না, সেই প্রশ্নই এখন বারবার উঠছে।
আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং (Indira Jaising), করুণা নন্দী (Karuna Nundy), গোপাল শঙ্করনারায়ণন এবং এন এস নাপ্পিনাই আবেদনকারীদের হয়ে সওয়াল করছেন। করুণা নন্দীর যুক্তি, স্বামী যদি সঙ্গমের দোহাই দিয়ে স্ত্রীর শরীরে গুরুতর আঘাত করেন, তা হলে নিছক দাম্পত্য সম্পর্কের দোহাই দিয়ে তিনি আইনি রেহাই পেতে পারেন না।
আদালতের সামনে দুটো বড় প্রশ্ন
বেঞ্চ স্পষ্ট করে দিয়েছে, দুটি আলাদা প্রশ্নে বিচার হবে এই মামলায়। প্রথমত, বর্তমান রক্ষাকবচ-মার্কা ধারা বহাল থাকলেও কি কোনও স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা টিকতে পারে। দ্বিতীয়ত, এই ব্যতিক্রম ধারাটি নিজেই সাংবিধানিক ভাবে বৈধ কি না। কেন্দ্র তার হলফনামা জমা দেওয়ায় আদালত জানিয়েছে, তিন সপ্তাহ পরে বুধ ও বৃহস্পতিবার এই মামলার চূড়ান্ত শুনানি হবে।
আইনি মহলের মতে, এই রায় শুধু একটি ধারার ভবিষ্যৎ নয়, বরং ভারতের দাম্পত্য সম্পর্কের সংজ্ঞাকেই নতুন করে লিখতে পারে। জোসেফ শাইন মামলায় (Joseph Shine v. Union of India) ব্যভিচার সংক্রান্ত ধারা বাতিল করার সময়েও শীর্ষ আদালত একই সুরে বলেছিল, বিয়ে কোনও নারীর স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার লাইসেন্স নয়। সেই যুক্তির জের টেনেই এ বার আরেকটি মূল প্রশ্নের মুখোমুখি দেশের শীর্ষ আদালত।




