জীবনের প্রতিটা বিষয়েই সমালোচনা এবং আত্মসমালোচনা করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সেটা রাজনৈতিক হোক অরাজনৈতিক হোক পারিবারিক জীবন হোক বা কর্মক্ষেত্র। সর্বত্রই এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যার মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসে ঘটনার সত্যতা। বিচারব্যবস্থা তার বাইরে নয় বললেই চলে।
বিচারব্যবস্থার উপর যখন মামলা-জট, দীর্ঘসূত্রিতা, বাড়তি খরচ এবং অনিশ্চয়তার চাপ ক্রমশ বাড়ছে, তখন আইনজীবী মহলকেও একজোট হয়ে ভাবতে হবে। বার কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়েও প্রয়োজন আত্মসমীক্ষার। জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লির ১৩তম সমাবর্তনে এমনই তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বিভি নাগরত্না।
শনিবারের অনুষ্ঠানে বিচারপতি নাগরত্না বলেন, কেন্দ্র হোক বা রাজ্য,বার কাউন্সিলগুলিকে নিজেদের ভূমিকা নতুন করে পর্যালোচনা করতে হবে। পেশাগত নীতি, নৈতিকতা এবং দক্ষতা রক্ষায় তাদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কথায়, “যখন কোনও বার কাউন্সিল তার সদস্যদেরই সম্মান অর্জন করতে পারে না, তা আইনজীবী পেশার জন্য ভাল লক্ষণ নয়।”
আইনজীবী মহলের ঐক্যের উপরও জোর দেন তিনি। বিচারপতি নাগরত্নার বক্তব্য, ভারতের বিচারব্যবস্থাকে কী ভাবে টিকিয়ে রাখা যায়, তা নিয়ে বারকে “একটি অভিন্ন কণ্ঠে” কথা বলতে হবে। মামলা জমে থাকা, বিচারে বিলম্ব, ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো সমস্যার মোকাবিলায় আইনজীবীদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
আইনজীবীদের স্বাধীনতার প্রসঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বারের স্বাধীনতা আইনজীবীদের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য কোনও অধিকার নয়। সাংবিধানিক গণতন্ত্রে এমন একটি পেশাদার শ্রেণি প্রয়োজন, যারা রাষ্ট্র, বাজার কিংবা এমনকি নিজেদের মক্কেলের অনুমতির অপেক্ষা না করেই পরামর্শ দিতে, যুক্তি পেশ করতে, প্রশ্ন তুলতে এবং মানুষের হয়ে সওয়াল করতে পারেন।
আইনজীবী পেশার কোনও ভুল বা বিচ্যুতির প্রভাব যে শুধু আদালতের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, রাজনৈতিক ও নাগরিক জীবনেও তার গভীর প্রভাব পড়ে—সেই সতর্কবার্তাও দিয়েছেন বিচারপতি নাগরত্না। মক্কেলের জন্য কাজকে নিছক পেশা না ভেবে জনসেবার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোনোর আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর কথায়, “পেশা কোনও ব্যবসা বা নিছক জীবিকা নয়, এটি আস্থার দায়িত্ব।” একজন আইনজীবীকে প্রতি ঘণ্টায় আইনি জ্ঞান বিক্রি করা মানুষে পরিণত করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সমাবর্তনে উপস্থিত ছিলেন দিল্লি হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য দেবেন্দ্র কুমার উপাধ্যায়, দিল্লি হাই কোর্টের বিচারপতিরা এবং উপাচার্য অধ্যাপক জি এস বাজপাই।
উল্লেখযোগ্য ভাবে, এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান মানন কুমার মিশ্রের একটি নির্দেশ ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৬-এর এনএএলএসএআর, হায়দরাবাদের স্নাতক পড়ুয়াদের আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত না করার জন্য রাজ্য বার কাউন্সিলগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ, নিজেদের সমাবর্তনে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে আমন্ত্রণ জানানোর বিরোধিতা করেছিলেন ওই পড়ুয়ারা।
নতুন প্রজন্মের আইনজীবীদের উদ্দেশে বিচারপতি নাগরত্নার শেষ বার্তা ছিল আরও তাৎপর্যপূর্ণ,বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব শেষ নয়। তাঁরা বেরিয়ে যাচ্ছেন “আদালতের আধিকারিক এবং সংবিধানের রক্ষক” হিসেবে। সেই দায়িত্বের মর্যাদা ধরে রাখাই আগামী দিনের আইনি পেশার সবচেয়ে বড় অগ্নি পরীক্ষা।




