• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 31 October, 2026

‘যে হাতে বিবেকানন্দের পদস্পর্শ করেছি, সেই হাতে গান্ধী নয়!’—ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের লেন্সে দুর্ধর্ষ বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের বিস্ময়কর উক্তি

বাংলার অগ্নিযুগের সারথী বিপ্লবী নেতা হেমচন্দ্র ঘোষ! ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট এর পরে অস্ত্র ত্যাগ করেন | বিপ্লবের প্রেক্ষাপট বদলের সঙ্গে রাজনীতির ক্ষেত্র ছেড়ে সমাজ -বিপ্লবের মঞ্চে অবতীর্ণ হলেন | ১৯৮০ সালের আজকের দিনে আমৃত্যু বিপ্লবের অভিযাত্রী হেম চন্দ্র ঘোষ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন!

‘যে হাতে বিবেকানন্দের পদস্পর্শ করেছি, সেই হাতে গান্ধী নয়!’—ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের লেন্সে দুর্ধর্ষ  বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের বিস্ময়কর উক্তি

Image: AI নির্মিত

‘যে হাতে বিবেকানন্দের পদস্পর্শ করেছি, সেই হাতে গান্ধী নয়!’ বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা অনুশীলন তত্ত্ব ক্রমশ ছাই চাপা আগুনের মতো জ্বলছিল! ১৯০১ সাল, মিশর সফর থেকে তড়িঘড়ি ফিরলেন স্বামী বিবেকানন্দ। বালির মতো দ্রুত ফুরিয়ে আসছে সময়| নিভে যাওয়ার আগে জীবন প্রদীপ চির ভাস্বর করে যেতে হবে তাকে। পূর্ববঙ্গ সফরে গেলেন| সম্মেলন বক্তৃতা সভায় থিক থিক করছে ব্রিটিশদের গুপ্তচর| সন্ন্যাসীর আড়ালে তিনি বিপ্লবের কাণ্ডারী! ১৯০১ সালের ১৯ মার্চ স্বামীজি যখন ট্রেনযোগে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছন, তখন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তরুণ হেমচন্দ্র ঘোষ তাঁকে প্রথম দেখেন।

এরপর ১৯০১ সালের ৩ ও ৪ এপ্রিল ঢাকায় একদল তরুণ বন্ধুবর্গসহ (যার মধ্যে শ্রীশ পাল, রাজেন গুহ প্রমুখ ছিলেন) হেমচন্দ্র ঘোষ স্বামীজির সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গভাবে কথাবার্তা বলার সুযোগ পান| সন্ন্যাসী হতে চেয়েছিলেন হেমচন্দ্র| সে উদ্দেশে বন্ধুদের নিয়ে সাক্ষাতে যান স্বামীজির| কিন্তু এক জাদু মন্ত্র বলে সেই সাক্ষাৎ বাংলার অগ্নিযুগের অগ্নি সংযোগ ঘটায়| স্বামীজি তার অফুরন্ত জীবনীশক্তি সঞ্চার করেন হেমচন্দ্রের মধ্যে| সন্ন্যাস কী? দেশমাতা তরুণ প্রজন্মের বলি চায়!

শৃঙ্খল উন্মোচন এর জন্য রাজনৈতিক শ্রীকৃষ্ণই হবে উত্তর প্রজন্মের আত্মত্যাগের আলোকবর্তিকা! সাক্ষাতের সময় ১৮ বছর বয়সী তরুণ হেমচন্দ্রকে স্বামী বিবেকানন্দ পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। স্বামীজি তাঁকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন যে, পরাধীন জাতির জন্য দেশের স্বাধীনতাই হলো একমাত্র ধর্ম। স্বামীজির এই দেশপ্রেমের বাণী বুকে নিয়েই হেমচন্দ্র ঘোষ পরবর্তীকালে বিপ্লবী সংগঠন ‘মুক্তি সংঘ’ (যা পরে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স বা বি.ভি. নামে পরিচিত হয়) প্রতিষ্ঠা করেন।

বিবেকানন্দের শক্তির বাণী, আত্মমর্যাদার শিক্ষা এবং পরাধীন জাতিকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান তাঁকে আলোড়িত করেছিল। অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস রাজনৈতিক পথের সঙ্গে তাঁর মতাদর্শগত দূরত্ব ছিল স্পষ্ট। স্বাধীনতা অর্জনের প্রশ্নে তিনি বিশ্বাস করতেন আত্মশক্তি, সংগঠন এবং সশস্ত্র প্রতিরোধে। তাঁর কাছে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙা ছিল জাতির আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের লড়াই।

ব্রিটিশ ইন্টালিজেন্সের নথিতে বিপ্লবী নেতা হেমচন্দ্র ঘোষের হিস্ট্রি সিট

এই উক্তির মধ্য দিয়ে হেমচন্দ্র ঘোষের রাজনৈতিক অবস্থানের একটি পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু তিনি কে ছিলেন? কেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগের কাছে তাঁর নাম এতখানি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল? কী এমন সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল তাঁর, যার জন্য ঢাকার গোপন বৈঠক থেকে কলকাতার বিপ্লবী কার্যকলাপ পর্যন্ত তাঁর গতিবিধি অনুসরণ করত ঔপনিবেশিক পুলিশ? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের বাংলায়।

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের পর বাংলার রাজনৈতিক পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। স্বদেশি আন্দোলন, জাতীয় শিক্ষা, ব্রিটিশ পণ্য বয়কটের পাশাপাশি গোপনে বিস্তার লাভ করছিল সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন। কলকাতার বাইরেও ঢাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, ফরিদপুরসহ পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে তরুণদের সংগঠিত করার কাজ চলছিল। একদল যুবক মনে করেছিলেন, কেবল আবেদন-নিবেদন করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা আদায় করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আত্মশক্তি, শৃঙ্খলা এবং সংগঠিত প্রতিরোধ। এই সময়েই পূর্ববঙ্গের বিপ্লবী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন হেমচন্দ্র ঘোষ।

তাঁর জীবন সম্পর্কে একটি অসাধারণ ঐতিহাসিক দলিল আমাদের হাতে রয়েছে। সেটি কোনও আত্মজীবনী নয়, কোনও সহযোদ্ধার স্মৃতিকথাও নয়। এটি ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের তৈরি একটি গোপন পুলিশি নথি—‘History Sheet No. 213 of Hem Chandra Ghosh’। ১৯১৬ সালের অক্টোবর মাসে প্রস্তুত এই আট পৃষ্ঠার নথিতে রয়েছে তাঁর পারিবারিক পরিচয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ, বিপ্লবী কর্মকাণ্ড এবং দীর্ঘদিনের পুলিশি নজরদারির বিবরণ। নথির চতুর্থ পৃষ্ঠায় সংযুক্ত রয়েছে তাঁর সম্মুখ ও পার্শ্বপ্রতিকৃতি। একজন বিপ্লবীর মুখের সেই পুরনো ছবির দিকে তাকালে মনে হয়, এক উত্তাল সময়ের ইতিহাস যেন নীরবে আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

একসময় গান্ধী এলেন, দেশের মুক্তিত্রাতার বেশে| বাংলার প্রদেশ কংগ্রেসে তখন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ছত্রছায়ায় বিপ্লবীরা কেমোফ্লাজ নিয়েছে| হেমচন্দ্রই বা বাদ জানেন কী করে? গান্ধীজির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার অবকাশ সৃষ্টি হয়। অসম্মত হলেন হেমচন্দ্র! ‘যে হাতে স্বামী বিবেকানন্দের পদস্পর্শ করেছি, সেই হাতে গান্ধী নয়!’ স্বামী বিবেকানন্দের কাছে প্রত্যক্ষভাবে বিপ্লব মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন হেমচন্দ্র এবং বিপ্লবী আলিমুদ্দিন| সেই দুর্লভ অভিজ্ঞতা তার বিপ্লব জীবনের জীবনী শক্তি হিসাবে ছিল অক্ষয়, আমৃত্যু!

ব্রিটিশ পুলিশের নথি অনুযায়ী, হেমচন্দ্র ঘোষের পিতার নাম মথুরামোহন ঘোষ। তাঁদের আদি নিবাস ছিল তৎকালীন বাকরগঞ্জের ঝালকাঠি থানার অন্তর্গত গাভা গ্রামে। হেমচন্দ্র ভুনা নামেও পরিচিত ছিলেন। পিতার কর্মসূত্রে তিনি ঢাকায় বসবাস করতেন। তাঁর পিতা সেখানে মোক্তারি পেশায় যুক্ত ছিলেন। ঢাকার জুবিলি স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর হেমচন্দ্র যোগ দেন ঢাকা অনুশীলন সমিতিতে। এই যোগদানই তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।

ঢাকা অনুশীলন সমিতি তখন পূর্ববঙ্গের বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সংগঠনের কাজ ছিল তরুণদের মধ্যে দেশপ্রেম ও আত্মশক্তির চেতনা জাগিয়ে তোলা এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। হেমচন্দ্র ক্রমে এই সংগঠনের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হয়ে ওঠেন। তাঁর কাজ শুধু ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন শাখার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা, বিপ্লবী যুবকদের সংগঠিত করা এবং গোপন নির্দেশ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার কথা ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বারবার উল্লেখ করেছে।

১৯০৯ সালের ২৫ নভেম্বর আগরতলায় জ্ঞানেন্দ্র রায়ের সঙ্গে হেমচন্দ্র গ্রেফতার হন। সেই সময় পূর্ববঙ্গ ও আসামের লেফটেন্যান্ট গভর্নরের সফর উপলক্ষে পুলিশের নজরদারি ছিল অত্যন্ত কড়া। জ্ঞানেন্দ্র রায়ও পুলিশের নজরে থাকা রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে তাঁদের আটক করা হলেও শেষ পর্যন্ত এই ঘটনায় অভিযোগ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়নি। কিন্তু পুলিশের নজরদারির তালিকায় হেমচন্দ্রের নাম ততদিনে বিশেষ গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা,পর্ব ৭: বিভার প্রেম এবং আত্মত্যাগ, ‘রবিবার’ গল্পে নারীসত্তার এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক দিক উন্মোচন

তাঁর সঙ্গে বরিশালের বিপ্লবী কার্যকলাপের যোগাযোগের কথাও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসে। পুলিশ জানায়, তিনি প্রায়ই বরিশালে যাতায়াত করতেন। নরেন সেনের বিপ্লবী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে গোয়েন্দাদের ধারণা। ফণী রায়ের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্কের উল্লেখ রয়েছে। পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন বিপ্লবী শাখার মধ্যে যে যোগাযোগের জাল গড়ে উঠছিল, হেমচন্দ্র তার অন্যতম সংযোগসূত্র হয়ে উঠেছিলেন বলে পুলিশের ধারণা।

১৯১২ সালের ডিসেম্বর মাসে বসন্তকুমার ভট্টাচার্য নামে এক রাজনৈতিক সন্দেহভাজন ব্যক্তি পুলিশের কাছে হেমচন্দ্রের নাম উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হেমচন্দ্র ছিলেন ঢাকার গোপন বিপ্লবী সমিতির একজন বিশিষ্ট সদস্য। বিভিন্ন শাখার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা, গোপন বার্তা আদানপ্রদান এবং সংগঠনের সদস্যদের নির্দেশ দেওয়ার কাজ তিনি করতেন। গিরীন্দ্রমোহন দাসের বক্তব্যেও তাঁর নাম উঠে আসে।

এই নথিতে ১৯১২ সালের শেষদিকে সংঘটিত কোলা ডাকাতির প্রসঙ্গও রয়েছে। বসন্তকুমার ভট্টাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ডাকাতির লুণ্ঠিত সম্পদের অর্ধেক হেমচন্দ্র নিজের কাছে রেখেছিলেন এবং বাকি অর্ধেক নরেন সেনের কাছে পাঠানো হয়েছিল। ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে জমা পড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, যার নম্বর ছিল ৪০০, দাবি করেছিল যে ১৯০৮ সালের জুন মাসের বরাহ ডাকাতি এবং অনুশীলন সমিতির সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত মানসা চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও হেমচন্দ্র যুক্ত ছিলেন। মাদারিপুরের ডাকাতির তদন্তেও একজন অভিযুক্তের বক্তব্যে তাঁর নাম উঠে আসে।

Swami Vivekanda
বিপ্লবীদের প্রেরণার উৎস স্বামী বিবেকানন্দ (Image: AI নির্মিত)

এই অভিযোগগুলি যে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সংগৃহীত তথ্য ও সন্দেহের ভিত্তিতে তৈরি, তা মনে রাখা জরুরি। সব অভিযোগকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। তবে এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, পূর্ববঙ্গের বিপ্লবী সংগঠনগুলির কার্যকলাপ সম্পর্কে ব্রিটিশ প্রশাসন কতখানি উদ্বিগ্ন ছিল এবং হেমচন্দ্রকে তারা কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করত।

১৯১৪ সালে তাঁর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্য কলকাতায় আসেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হরিদাস দত্ত ওরফে কুঞ্জ, শ্রীশ পাল এবং খগেন দাস। ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগের দাবি অনুযায়ী, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল শ্যামনগরের একটি পাটকলে কর্মরত ও’ব্রায়েন নামে এক ইউরোপীয় কর্মচারীকে হত্যা করা। অভিযোগ ছিল, আলেকজান্দ্রা জুট মিলে এক ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী হয়েও ওই ব্যক্তি মাত্র ১৬০ টাকা জরিমানা দিয়ে রেহাই পেয়েছিলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্রতিশোধমূলক হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে পুলিশ জানায়।

এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা কলকাতার পুরনো অনুশীলন সমিতির কয়েকজন সদস্যের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করেন। ব্রিটিশ নথিতে এই সমিতির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে আলিপুর বোমা মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত ইন্দ্রনাথ নন্দীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। গোয়েন্দারা জানতে পারে, হরিদাস দত্ত ও খগেন দাস ছদ্মনামে ওই পাটকলেই চাকরি নিয়েছিলেন। বিপ্লবীদের কার্যকলাপ অনুসরণ করতে গিয়ে পুলিশ কলকাতা ও পূর্ববঙ্গের সংগঠনগুলির মধ্যে এমন এক যোগাযোগের সন্ধান পেয়েছিল, যা তাদের কাছে যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছিল।

১৯১৪ সালের মে মাসের গোড়ায় কলকাতায় বিপ্লবী সদস্যদের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, সেখান থেকে নিষিদ্ধ প্রচারপত্র, বিপ্লবী সাহিত্য এবং ‘Anarchy and Anarchism’ নামে একটি পুস্তিকা উদ্ধার হয়। ওই পুস্তিকায় বোমা তৈরি ও ব্যবহারের বিবরণ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হরিদাস দত্ত আত্মগোপন করেন। খগেন দাস ও শৈলেন্দ্র সিংহের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর কয়েক মাস পরেই ঘটে বাংলার বিপ্লবী ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা—রডা কোম্পানির অস্ত্র লুণ্ঠন।

১৯১৪ সালের ২৬ আগস্ট রডা অ্যান্ড কোম্পানির জন্য পাঠানো ৫০টি মাউজার পিস্তল এবং ৪০ হাজার রাউন্ড গুলি পরিবহণের সময় চুরি হয়ে যায়। এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কোম্পানির কর্মচারী শ্রীশচন্দ্র মিত্র, যিনি হাবু নামে পরিচিত। ব্রিটিশ গোয়েন্দা নথিতে তাঁকে হেমচন্দ্র ঘোষ ও কলকাতার অনুশীলন সমিতির সংযুক্ত বিপ্লবী গোষ্ঠীর সদস্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তে হরিদাস দত্তের কাছ থেকে ২১,৩০০ রাউন্ড চুরি যাওয়া কার্তুজ উদ্ধার করার কথাও নথিতে রয়েছে। পুলিশ জানায়, শ্রীশ মিত্র আত্মগোপন করেছিলেন এবং হেমচন্দ্র তাঁকে আশ্রয় দিচ্ছিলেন। এই ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। তবে প্রতিবেদনের একটি বিশেষ স্বীকারোক্তি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, রডা অস্ত্র লুণ্ঠন কিংবা ও’ব্রায়েন হত্যার পরিকল্পনায় হেমচন্দ্রের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের প্রমাণ তাদের হাতে ছিল না। তাদের দাবি ছিল, গোপন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী এই দুই ঘটনার পরিকল্পনা ও পরিচালনায় হেমচন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

অর্থাৎ ব্রিটিশ পুলিশের চোখে হেমচন্দ্র ছিলেন এমন একজন সংগঠক, যিনি নিজে সামনে না থেকেও বিপ্লবী কার্যকলাপের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন। ঢাকায় তাঁর প্রভাব কতখানি বিস্তৃত ছিল, তার আরও একটি ছবি পাওয়া যায় ১৯১৫ সালের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। পুলিশের নজরদারিতে জানা যায়, হেমচন্দ্র নিয়মিত ঢাকার এস. রায়ের দোকানে বিপ্লবী যুবকদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। সন্ধ্যার সেই বৈঠকে কখনও কখনও পঞ্চাশ থেকে ষাটজন যুবকের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। একটি দোকান, সন্ধ্যার কয়েক ঘণ্টা এবং সেখানে জড়ো হওয়া এতগুলি তরুণ—এই সামান্য বিবরণই সেই সময়ের গোপন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের একটি জীবন্ত ছবি তুলে ধরে।

১৯১৫ সালের নববর্ষের দিনে ঢাকায় আটজন যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। পাঁচজন ধরা পড়েন ঢাকায়, বাকি তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয় গোয়ালন্দে। পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, তাঁদের চলাফেরা সন্দেহজনক ছিল এবং নজরদারির সময় তাঁরা পুলিশকে হুমকি দিয়েছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তাঁরা নিজেদের পরিচয় গোপন করতে মিথ্যা নাম ও ঠিকানা দিয়েছিলেন।

এই আটজনের পরিচয়ও নথিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন রিপন কলেজের ছাত্র, একজন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্র, একজন কলকাতার গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া প্রেসের কর্মচারী। আরেকজনের বাড়ি ছিল চব্বিশ পরগনার উজিলপুরে। একজন ছিলেন ঢাকার বাসিন্দা, যিনি কলকাতা থেকে এসেছিলেন। আরেকজন যশোরের বাসিন্দা এবং বহরমপুর কলেজের ছাত্র। সপ্তম ব্যক্তি ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র, যাঁর বাস ছিল ইডেন হিন্দু হস্টেলে। অষ্টমজন ছিলেন মেট্রোপলিটন কলেজের ছাত্র।

বিপ্লবী নেতা হেমচন্দ্র ঘোষের স্বাক্ষর

তাঁদের সকলকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৯ ধারায় নিরাপত্তার মুচলেকা দিতে বলা হয়েছিল। একজন ধৃত যুবকের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা ডাকাতির উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসেছিলেন এবং কলকাতার বিপ্লবী নেতা বিপিনচন্দ্র গাঙ্গুলির মাধ্যমে হেমচন্দ্রের দলের সাহায্য করতে পাঠানো হয়েছিল। এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, কলকাতা ও ঢাকার বিপ্লবী যোগাযোগের পরিধি কতদূর বিস্তৃত হয়েছিল। কলেজের ছাত্র, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং বিভিন্ন জেলা থেকে আসা যুবকদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল এক জটিল যোগাযোগব্যবস্থা।

১৯১৫ সালের ১৮ এপ্রিল হেমচন্দ্রকে মানীন্দ্রভূষণ রায়ের সঙ্গে দেখা করার কথাও পুলিশ নথিভুক্ত করে। মানীন্দ্রভূষণ ছিলেন নরেন সেনের সহযোগী। একই সময়ে প্রফুল্ল সেনের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগের কথা প্রতিবেদনে রয়েছে। ২২ এপ্রিল এস. রায়ের দোকানে একটি বৈঠকের সময় হেমচন্দ্র পুলিশের নজরদারির বিষয়টি বুঝতে পারেন। তিনি তাঁর সহযোগীদের সতর্ক করেন এবং দোকানের দরজা বন্ধ করে দেন। এই ঘটনাটি থেকে বোঝা যায়, বিপ্লবীদের প্রতিটি বৈঠকের উপর পুলিশের নজর ছিল এবং সংগঠকদের প্রতিনিয়ত সতর্ক থাকতে হতো।

এই দীর্ঘ প্রতিবেদনের শেষে স্বাক্ষর করেছিলেন কলকাতা সিআইডির ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেপুটি ইনস্পেক্টর জেনারেল আর. এইচ. স্নেড হাচিনসন। তারিখ ২৭ এপ্রিল ১৯১৫। নথির শেষাংশে হেমচন্দ্রের অন্তরীণ থাকার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। সরকারি নোট অনুযায়ী, ১৯১৬ সালের ৫ জুন ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া আইনের অধীনে সরকারি আদেশে তাঁকে বাকরগঞ্জের গাভা গ্রামে অন্তরীণ রাখা হয়। অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সাধারণ ফৌজদারি মামলার বাইরে যুদ্ধকালীন বিশেষ আইনের অধীনেও নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করেছিল।

নথির পঞ্চম পৃষ্ঠায় রয়েছে হেমচন্দ্রের স্বাক্ষরযুক্ত একটি ইংরেজি বিবৃতি। তারিখ ৭ জুন ১৯১৫। সেখানে তিনি সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে সরকারের অনুমোদিত কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছাড়া নির্দিষ্ট অপরাধের বিচার আদালত গ্রহণ করতে পারবে না বলে বলা হয়েছে। এই দলিলটি তাঁর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তাঁকে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের বিশেষ আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখিও হতে হয়েছিল। ১৯১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরের একটি সরকারি মন্তব্যে জানানো হয়, অন্তরীণ অবস্থায় হেমচন্দ্র ঘোষের বিরুদ্ধে কোনও গোলযোগ সৃষ্টির ঘটনা ঘটেনি। সংক্ষিপ্ত এই মন্তব্যটির মধ্যেও যেন ধরা রয়েছে এক দীর্ঘ বিপ্লবী জীবনের পরবর্তী অধ্যায়।

আরও পড়ুন: ছোট গল্প: মধু ঋতু, একটি ছোট্ট মেয়ের আবদার

হেমচন্দ্র ঘোষের জীবন সম্পর্কে এই আট পৃষ্ঠার দলিলটি পড়তে পড়তে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে তিনি নিছক একজন রাজনৈতিক সন্দেহভাজন ছিলেন না। ঢাকা অনুশীলন সমিতি, বরিশালের বিপ্লবী যোগাযোগ, কলকাতার সংগঠন এবং বিভিন্ন জেলার যুবকদের মধ্যে যে নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে তাঁর নাম বারবার জড়িয়ে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের সমস্ত অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না, কিন্তু ব্রিটিশ গোয়েন্দারা যে তাঁকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক বলে মনে করত, নথির প্রতিটি পৃষ্ঠা তার সাক্ষ্য বহন করে।

হেমচন্দ্রের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কেন্দ্রে ছিল আত্মমর্যাদা ও শক্তির আদর্শ। স্বামী বিবেকানন্দ ভারতীয় যুবসমাজকে যে আত্মবিশ্বাস এবং জাতীয় জাগরণের শিক্ষা দিয়েছিলেন, বিপ্লবী প্রজন্মের অনেকেই তার মধ্যে নিজেদের সংগ্রামের প্রেরণা খুঁজে পেয়েছিলেন। হেমচন্দ্রের বহুল প্রচলিত উক্তিটিও সেই মানসিকতার পরিচয় বহন করে। গান্ধিজির অহিংস আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের দুটি পৃথক রাজনৈতিক পথের পরিচয়।

আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে হেমচন্দ্র ঘোষকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন বিপ্লবীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়। এর অর্থ বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই নেপথ্যের ইতিহাসকে সামনে নিয়ে আসা, যা অনেক সময় পরিচিত রাজনৈতিক ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল সভা, সমাবেশ, বক্তৃতা কিংবা রাজনৈতিক প্রস্তাবের ইতিহাস নয়। তার ভিত গড়ে উঠেছিল এমন অসংখ্য সংগঠকের শ্রমে, যাঁরা গোপনে কাজ করেছেন, তরুণদের একত্রিত করেছেন এবং নিজেদের জীবনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছেন।

ব্রিটিশ পুলিশের তৈরি ‘History Sheet No. 213’ আজ সেই বিস্মৃত ইতিহাসের এক মূল্যবান সাক্ষ্য। যে প্রশাসন হেমচন্দ্র ঘোষকে বিপজ্জনক বিপ্লবী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, সেই প্রশাসনেরই গোয়েন্দা নথি আজ তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জানার সুযোগ করে দিয়েছে। সময়ের প্রবাহে বহু বিপ্লবীর নাম ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যেতে বসেছে। তাঁদের ফিরিয়ে আনা আমাদের দায়িত্ব। কারণ, স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের নয়, যাঁরা নীরবে সেই সংগ্রামের ভিত নির্মাণ করেছিলেন, তাঁদেরও। বিবেকানন্দের শক্তির আদর্শে অনুপ্রাণিত, নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসে অবিচল এই বিপ্লবী সংগঠককে আজ নতুন করে স্মরণ করা প্রয়োজন। বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

দেখুন: