সুকান্ত পাল
ভারতীয় নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ, শ্রেষ্ঠ পুরুষ বিবেকানন্দ ছিলেন মানবিকতাবাদের মূর্ত প্রতীক। তিনি ভারত আত্মার ও জাতির আত্মপরিচয়েরও প্রতীক হয়ে উঠেছেন তাঁর কর্মের মাধ্যমে। উপনিবেশিক শাসন কাঠামোর মধ্যে বদ্ধ বাঙালির চিন্তা চেতনার পুনর্জাগরণ ও পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শতক হিসেবে উনবিংশ শতাব্দীকে চিহ্নিত করা চলে।
উপনিবেশিক শাসনের এবং দেশিয় চিরাচরিত ব্রাহ্মণ্যবাদের কবলে পড়ে মানুষের স্বাভাবিক অধিকারগুলি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত হয়ে এসেছে। মানবিকতার আদর্শের মৃত্যু ঘটেছে অহরহ। বিংশ শতাব্দীতে যেসব মনীষীর আবির্ভাবে আমাদের দেশ, কাল, সমাজ, চিন্তা-চেতনা বোধ ঋদ্ধ হয়েছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিবেকানন্দ।
Advertisement
প্রতিনিয়ত মনুষ্যত্বের অবমাননায় ও অবহেলায় বিবেকানন্দ বিচলিত হয়েছিলেন। মানবপ্রেমিক ও মানব সেবায় নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন বিবেকানন্দ। তাই আজীবন মানবতাবাদের পক্ষেই তাঁর জীবনকে তিনি উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর শৈশবকাল থেকেই তিনি নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, নিপীড়িত মানুষের জন্য তাঁর প্রাণ আকুল হয়েছে। স্বামী মুমুক্ষানন্দের ভাষায়, ‘আশৈশব নরেন্দ্রনাথের পরদুঃখ কাতরতার পরিচয় পাই। আর্তের আর্তি দেখলে যেন আর রক্ষা নেই। বাড়ির যা কিছু পান, তাদের দিয়ে ফেলেন। এরূপ ছেলেকে নিয়ে সংসার করা দায়। মা বিরক্ত হয়ে ছেলেকে দোতলায় গৃহবন্দী করেছিলেন। তার ফলে জানালার ফাঁক দিয়ে ছেলে বাড়ির মূল্যবান বস্ত্র গরীব দুঃখীদের দিতে শুরু করেছিলেন। রাস্তায় কচি এক বালক গাড়ি চাপায় মৃত্যুর মুখোমুখি। নিজে প্রাণ বিপন্ন করে নরেন্দ্র তার জীবন রক্ষা করলেন। খেলার মাঠে দোলনার কাঠ ওঠাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটল। সাহায্যকারী বিদেশি নাবিক আহত হল। সঙ্গীরা অধিকাংশ পালাল। কিন্তু নরেন্দ্রনাথ অন্তরঙ্গ
Advertisement
দু-চারজনকে নিয়ে নাবিকের সেবা শুশ্রূষায় রত হলেন। পরীক্ষার ফি-র অভাবে সহপাঠীর দুর্ভাবনা নরেন্দ্রনাথ নিজের বুকে টেনে নিলেন। তার বেতন মকুব করার স্বেচ্ছাকৃত দায়িত্ব বহু কষ্টে পালন করেছিলেন।’
বিবেকানন্দ ছোটবেলা থেকেই মানুষের দুঃখ যন্ত্রণায় কাতর হয়েছিলেন। মানুষের প্রতি সেবার আদর্শ তখন থেকে তার মধ্যে বিশেষভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছিল। ভারতীয় সংস্কৃতিতে মানুষকে সবার উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির এটাই ছিল মূল মন্ত্র। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’— এই বাণী ভারতীয় সভ্যতার এক চিরকালীন বীজমন্ত্র। এখান থেকেই উৎসারিত হয় মানবিকতাবাদ। এখানে একটি বিষয়ের উল্লেখ না করলেই নয়। তা হল, মানবিকতাবাদ ও মানবতাবাদ কিন্তু দুটি একই অর্থ বহন করে না। বসুধা চক্রবর্তী তার ‘মানবতাবাদ’ গ্রন্থে পরিষ্কার বলেছেন যে, মানবিকতাবাদ করুণার উপর প্রতিষ্ঠিত। এই মানবিকতা মহান ও মঙ্গলময়। এর মধ্যে রয়েছে পরোপকারের এক প্রেরণা ও প্রবৃত্তি। অন্যদিকে, মানবতাবাদের মধ্যে রয়েছে মানবাধিকারের বিষয়টি। এই মানবাধিকার একটা মানুষের মৌলিক অধিকার, যা তার জন্মসূত্রে প্রাপ্ত। একে হনন করা যায় না। একে রক্ষা করাই মনুষ্যত্বের দাবি। অন্যদিকে প্রকৃত সভ্যতা এই মানবিকতাবাদকেই আশা করে। মানুষের এই দাবিকেই আজীবন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন বিবেকানন্দ।
বিবেকানন্দের চিন্তাভাবনার আবর্তন মানুষকে ঘিরেই। অর্থাৎ তিনি মানবতাবাদের দৃষ্টিতে সব কিছুকে দেখেছেন যার উৎস অবশ্যই তাঁর অধ্যাত্ম চেতনা। তাঁর এই চেতনাতেই তিনি মানুষকে দিয়েছেন সব থেকে উঁচু স্থান। তাঁর মূল আগ্রহের বিষয়ে ছিল মানুষের কল্যাণ সাধন। তাঁর জীবন দর্শনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানবপ্রেম। এই মানবের মধ্যে কোন জন্মগত ও জাতিগত ভেদাভেদ তিনি অস্বীকার করেন। সব মানব-সন্তানই অমৃতের সন্তান– এই ছিল তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি ভারতবর্ষে প্রচলিত জাতিভেদ প্রথার তীব্র সমালোচক ছিলেন। তিনি ভারতের জাতিভেদ প্রথার নির্মমতা, অনাচার ও কুসংস্কারকে পূর্ণরূপে মানবতাবিরোধী বলে মনে করেছেন। নিম্নবর্গীয় সমাজের উপর আধিপত্যবাদী ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের অবর্ণনীয় ও ভয়াবহ অত্যাচারকে কখনোই মেনে নিতে পারেননি।
মনে করা হয় যে, বিবেকানন্দের মানবপ্রেম ভারতপ্রেম বা ভারত সেবারই একটি রূপ। কিন্তু এই ভাবনা যথার্থ নয়। এটা স্বাভাবিক যে তিনি যেহেতু এই ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেহেতু তাঁর প্রাথমিক মানবপ্রেম খুব স্বাভাবিকভাবেই ভারতবর্ষের প্রতি ধাবিত হবে। কিন্তু যেই মানুষটা অন্যের ভিতর স্রষ্টাকে দেখতে পান সেই মানুষটার মানবপ্রেম বা মানবতাবাদ শুধুমাত্র নিজের দেশের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নিজের দেশের ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে তিনি তখন বিশ্বচরাচরের মানুষের জন্য তাঁর মানবতাবাদের জিয়নকাঠির স্পর্শে সবাইকে সেই মন্ত্রে দীক্ষিত করতে চান। এটাই স্বাভাবিক। তাঁর পরিধি সমগ্র বিশ্বব্যাপী। তা পৃথিবীর প্রতিটি মানবের জন্য, এমনকি প্রাণীর জন্যও পরিব্যাপ্ত হয়ে যায়। তাই একমাত্র তিনিই দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারেন ‘আমি যেমন ভারতের তেমনি বিশ্বের।’
স্বদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ব মানবের জন্য তার মানবতাবাদ বিস্তৃত। এখানে তিনি একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী এবং মানবতাবাদী হিসাবে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়ে ওঠেন। পৃথিবীর যেখানেই মানব সন্তানের লাঞ্ছনা হয়েছে, সেখানেই তাঁর মানবতাবাদের বাণী মুক্তির মন্ত্র হয়ে উঠেছে। তিনি যখন বলেন, ‘পৃথিবীতে এখন তৃতীয় যুগ চলছে বৈশ্য শ্রেণির প্রভুত্বে। চতুর্থ যুগ আসবে শূদ্রদের প্রভুত্ব নিয়ে।’ তখন আমাদের বুঝতে এতটুকু ভুল হয় না যে, তিনি শুধুমাত্র তাঁর স্বদেশেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। আরো একটি কথা, ‘শূদ্র’ শব্দটি ভারতীয় শব্দ হলেও তিনি এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন ‘প্রলেতারিয়েত’ বা শোষিত মানুষকে বোঝাতেই।
আসলে বিবেকানন্দর চিন্তাভাবনার আবর্তন মানুষকে ঘিরেই। অর্থাৎ মানবতাবাদী দৃষ্টিতেই তিনি সবকিছুকেই দেখেছেন, যার উৎস অবশ্যই তাঁর অধ্যাত্ম্য চেতনা। তাঁর এই চেতনাতেই তিনি মানুষকে দিয়েছেন সব থেকে উচ্চ স্থান। তাঁর মূল আগ্রহের বিষয়ে ছিল মানব সন্তানের কল্যাণসাধন। গবেষক দেবাঞ্জন মজুমদার তাই লেখেন, ‘‘Vivekananda’s prime concern was the human being whom we called by common gender ‘man’. His religious philosophy, his social thought, his economic plans— infact all his thought and action— had ‘man’ as the one centre. He put man on the throne of his worship…’’
মানুষ, শুধুই মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গল ভাবনা থেকে উৎসারিত হয়েছিল তাঁর সাধনার পথ। এ পথ মহান মানবতার পথ।
তাঁর যথার্থ ও শ্রেষ্ঠ পরিচয় তিনি একজন মহান মানবপ্রেমী ও মানবতাবাদী। রবীন্দ্রনাথ তাই বলেন যে, বিবেকানন্দকে যদি অণুু পরিমাণ বুঝে থাকি, তাহলে বলতে হবে, মানবতাবাদের এই মহাসঙ্গমে এসে মিলেছে বিবেকানন্দের ধারা। এখানেই তিনি পূর্ণ। এখানেই তিনি সমগ্র। কারণ তাঁর জীবন সাধনার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানব কল্যাণ। মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং মানুষের কল্যাণ সাধনাই ছিল তাঁর ঈশ্বর সাধনার লক্ষ্য। উপরের উদ্ধৃতি থেকে বুঝতে পারি তাঁর ঈশ্বর বিরাজ করতেন মানুষের অন্তরে। মানুষই ছিল তাঁর পরম ঈশ্বর। মানুষই তাঁর কাছে সব এবং এই মানুষের সেবাঈ শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তাই তিনিই, একমাত্র তিনিই বলতে পারেন,
‘বহুরূপে সম্মুখে ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?
জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।’
মানবতাবাদের এমন সুমহান পুরুষের অভাব আজ এই বিষণ্ণ ও দিক-দিশাহীন ভারত এবং সমগ্র বিশ্বে ভীষণভাবে অনুভূত হচ্ছে। তাঁর মতো মানবপ্রেমিক, মানবসেবায় নিবেদিত প্রাণপুরুষের নির্দেশিত পথের দিশা খুঁজে পেলে মানব সভ্যতারই জয় হবে। তাই আজ বছরে মাত্র একদিন বিবেকানন্দর জন্মদিন বর্ণাঢ্য উৎসব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর প্রদত্ত বাণী ও শিক্ষার চর্চা বিপুলভাবে জরুরী।
Advertisement



