• facebook
  • twitter
Saturday, 10 January, 2026

বর্তমান সংকটে প্রয়োজন স্বামী বিবেকানন্দের মত ও পথ

স্বামীজি সবচেয়ে বেশি যুব সম্প্রদায়ের উপর আস্থা রাখতেন। তিনি তরুণ ও যুবকবৃন্দকে তাই সর্বদাই আহ্বান জানিয়েছেন, মানুষের পাশে দাঁড়াতে পথে নামতে।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

কুশল চক্রবর্তী

এখন সুখের সময় নয়। এ সময় বড় দুঃসময়। বাংলা তথা সমগ্র ভারত এখন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সমাজ অর্থনীতি রাজনীতি এমনকি আন্তর্জাতিক সমগ্র বিষয়েই দেশ এখন এক সংকটের মুখে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আমাদের সামাজিক সমস্যা জাটিল আকার ধারণ করছে, যা ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষের রূপ নিচ্ছে মাঝে-মধ্যেই। তাই এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ আমরা খুঁজে পেতে পারি স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও পথের মধ্য দিয়ে। বিবেকানন্দের বাণীগুলিকে যদি শুধু প্রচার করা নয়, আমরা নিজেরাও গ্রহণ করি, তাহলে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বহু সমাধান হয়ে যায়৷ তাই আজ স্বামী বিবেকানন্দের এই পুণ্য জন্মতিথিতে আমরা তাঁকে স্মরণ করছি এই সংকট থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য।

Advertisement

আমেরিকার বুকে ভারতের ঐতিহ্যশালী জয় পতাকা পুঁতে সারা বিশ্ব জয় করেন বীর বিপ্লবী সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ ভারতের ফিরলেন ১৮৯৭ সালের ১৫ই জানুয়ারি। সেই সময় চেন্নাইয়ে তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তার নামকরণ পরবর্তীকালে হয়েছিল ‘ভারতের ভবিষ্যৎ’! সেই বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘আগামী পঞ্চাশ বৎসর আমাদের গরীয়সী ভারতমাতাই আমাদের আরাধ্য দেবতা হউন, অন্যান্য অকেজো দেবতা এই কয়েক বৎসর ভুলিলে কোন ক্ষতি নাই। অন্যান্য দেবতা ঘুমাইতেছেন, তোমার স্বজাতি– এই দেবতা এখন একমাত্র জাগ্রত– সর্বত্রই তাঁহার হস্ত, সর্বত্র তাহার কর্ণ, তিনি সকল স্থান ব্যাপিয়া আছেন।’

Advertisement

আশ্চর্যের ব্যাপার, ঠিক এই সময়ে মাত্র এক সপ্তাহ পরে ২৩ জানুয়ারি ১৮৯৭ সালে জন্ম নিলেন এক শিশু, যে ভবিষ্যৎ স্বামীজীর মত এবং বাণীর মুর্ত প্রতীক! যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়েও স্বামীজিকে এবং পরমহংসদেবকে স্মরণ করতেন। বলা বাহুল্য তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। স্বামীজি তার কর্মকাণ্ডে তার কথায় তার আচরণে তিনি সর্বদাই যুব সমাজ, যুব সম্প্রদায়ের উপর সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখতেন ভরসা রাখতেন। আর তিনি গুরুত্ব দিতেন নারী জাতির উপর। কারণ তিনি মনে করতেন যুব সম্প্রদায় এবং নারী সমাজ ভারতবর্ষের যে কোনও বিপ্লব সুসম্পন্ন করতে পারে।

বাস্তবে ঘটেওছিল তাই। স্বামীজীর বক্তৃতা, স্বামীজীর বাণী ও রচনার দ্বারা সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল যুব সম্প্রদায়কে এবং নারী সমাজকে। শুধু তাই নয় তার আবির্ভাবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম একটা অন্য মাত্রা লাভ করেছিল। কারণ তাঁর বাণীর শক্তি যেকোনো মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে যথেষ্ট। স্বামী বিবেকানন্দের বাণীর অসাধারণ শক্তি ও প্রভাব আমরা উপলব্ধি করতে পারি বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক নোবেল জয়ী রোমাঁ রোলাঁর বক্তব্যে। তিনি বলছেন, ‘তাঁর কথাগুলো ছিল সংগীতের মত, বিঠোফোনের মতো সেগুলোর বাক্যাংশের বিন্যাস, আর হ্যান্ডেলের কোরাসের মতো তার প্রাণমাতানো ছন্দ। —ত্রিশ বছর আগের লেখা বইগুলো যখনই আমি পড়ি আমার সারা শরীর দিয়ে যেন চকিতে তড়িৎস্পর্শের মত শিহরণ বয়ে যায়’। এই মন্তব্য থেকে আমরা অকল্পনীয় বাগ্মিতার গভীর প্রভাব উপলব্ধি করতে পারি।

যৌবনের টানাপোড়নে সুভাষচন্দ্র যখন গভীর সংকট এর মধ্যে দিয়ে সময়ে কাটাচ্ছেন সেই সময়ই এক আত্মীয়ের বাড়িতে বিবেকানন্দের রচনাবলী হাতে পেলেন। সেটা ছিল ১৯১২ খ্রিস্টাব্দ। তিনি লিখছেন, ‘কয়েকটি পৃষ্ঠা উল্টে বুঝলাম এতে এমন কিছু আছে যা আমি খুঁজে মরছি।’ এর পরবর্তীকালে সারা জীবন সুভাষচন্দ্রের আত্মস্থ ছিল স্বামী বিবেকানন্দের বাণী এবং ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের লোকশিক্ষা। এমনকি যুদ্ধের রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে স্বামী বিবেকানন্দ এবং পরমহংস রামকৃষ্ণকে স্মরণ করেছেন। সুযোগ পেলেই স্থানীয় রামকৃষ্ণ মঠে গিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ ও ঠাকুরের সামনে ধ্যান করেছেন, নতুন করে শক্তি অর্জন করে আবার ঝাঁপিয়ে পড়েছেন যুদ্ধে। স্বামী বিবেকানন্দ চিরকালই দুটো জিনিসের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন, তা হল ত্যাগ ও চরিত্র গঠন। তিনি মনে করতেন, ত্যাগ ব্যতীত কোনও উপলব্ধি সম্ভব নয়। তিনি এও বলতেন ভারতবর্ষে মহাপুরুষদের কোন অভাব নেই কিন্তু তাঁরা সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য এগিয়ে আসেননি। তাই স্বামীজি বলতেন, ‘মানুষ গড়াই আমার কাজ’।

মাতৃভূমির দুঃখ-দুর্দশা দূর করার জন্য তাই তিনি উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘উচ্চকণ্ঠে বল ভাই, দরিদ্র ভারতবাসী, মূর্খ ভারতবাসী, ব্রাহ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই!’ বিবেকানন্দের কাছে দেশের মানুষ আর দেশ মাতৃকাই ছিল সর্বস্ব। তিনি সর্বদাই তার জীবন অতিবাহিত করেছেন এই দেশবাসী ও দেশ মাতৃকার জন্য। ভগিনী নিবেদিতা ‘স্বামীজিকে যেমন দেখিয়াছি’ গ্রন্থে এক জায়গায় লিখেছেন, ‘তাঁর আরাধনার দেবতা ছিল তাঁর মাতৃভূমি। পুরোহিত, উচ্চবর্ণ এবং বণিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে তিনি তার লেখায় যে আক্রমণ চালিয়েছিলেন আপনারা তা পড়েছেন। সেসব কথা বলা একজন সর্বশ্রেষ্ঠ গোড়া সমাজতান্ত্রিকের পক্ষে বিশেষ প্রশংসার বিষয়। আপনারা যাকে আধ্যাত্মিক ভন্ডামি বলতে পারেন, স্বামীজির মধ্যে তার বিন্দুমাত্র আবাসও ছিল না। তার চোখে এসব অসহ্য বোধ হতো।’

আজকাল রাজনৈতিক নেতাদের মুখে একটা কথা শোনা যায় যে, আবেগ দিয়ে রাজনীতি হয় না। অথচ স্বামী বিবেকানন্দ রাজনীতিকে কখনোই আবেগ ভালোবাসা এবং সহমর্মিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। তিনি বলতেন আবেগ এবং ভালোবাসা ছাড়া কখনোই রাজনীতির করা যায় না। আসলে আধুনিক রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রী—- তাঁরা কখনোই দলের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন না, সব সময় সমস্ত কাজে-কর্মে তাঁদের আচরণে মুখ্য লক্ষ্য থাকে দলের স্বার্থ এবং ব্যক্তিস্বার্থ, এক কথায় ভোটের রাজনীতি। যেটা বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক সংকটের এবং সামাজিক সংকটের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি এবং দুর্বৃত্তায়ন এখন রাজনীতির দুটি প্রধান হস্ত এবং হাতিয়ার, পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে এই একই অভিযোগে করে সমস্ত রাজনৈতিক দল, তার কারণ রাজনৈতিক দল এইগুলোকে সম্পদ বলে মনে করে।

স্বামীজি সবচেয়ে বেশি যুব সম্প্রদায়ের উপর আস্থা রাখতেন। তিনি তরুণ ও যুবকবৃন্দকে তাই সর্বদাই আহ্বান জানিয়েছেন, মানুষের পাশে দাঁড়াতে পথে নামতে। তিনি ভীরু দুর্বল মানুষ পছন্দ করতেন না তাই তরুণ সমাজকে সর্বদাই দৈহিক এবং মানসিক দিক থেকে শক্তিশালী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কারণ দেহে এবং মনে শক্তি সঞ্চয় না করতে পারলে শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই যুব ও তরুণ সম্প্রদায়ের উদ্দে​শে তিনি বলেছেন, ‘প্রথমত আমাদের তরুণদের শক্তিশালী হতে হবে। ধর্ম আসবে তারপর। গীতার চেয়ে ফুটবলের মধ্য দিয়ে স্বর্গের কাছাকাছি তোমরা যেতে পারবে।’

স্বামী বিবেকানন্দের বাণী কেন এত শক্তিধর, কেন সর্বত্রই এত গভীর প্রভাব বিস্তার করে, যাকে বলে কর্ণ দিয়ে মরমে প্রবেশ করে, তার কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে স্বামীজি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ধর্ম ও বিজ্ঞানের অতীত ও বর্তমানের সমন্বয় সাধন করেছিলেন এবং সেই সমন্বয়ের ফলই হয়েছিল তাঁর বাণী, যা তিনি দেশবাসীকে প্রতি মুহূর্তেই শোনাতে চেয়েছিলেন। শুধু বাণী নয় সারা জীবন সেই নীতি ও আদর্শ তিনি নিজেই অবলম্বন করেছিলেন। তাই তাঁর শিক্ষায় দেশবাসী আত্মসম্মান আত্মবিশ্বাস এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার শক্তি ফিরে পেয়েছিল।

ভাবতে অবাক লাগে, এই একবিংশ শতকে যখন আমরা চাঁদে চন্দ্রযান পাঠাচ্ছি, মানুষ পাঠাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন অনারকিলিংয়ের নামে নিজের মেয়ে বোন কিম্বা ভাইদের পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে। আজও বধূনির্যাতন, নারীনির্যাতন এবং যৌন অত্যাচার যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের সমাজে। এ নিয়ে হৈচৈ হয়, প্রতিবাদ হয় কিন্তু প্রতিকার হয় না। কারণ আমরা অর্থাৎ সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানসিকতা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি তাই নারীকে আমরা আজও যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করতে পারি না, যাকে স্বামী বিবেকানন্দ আমাদের জাতীয় পাপ বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ‘এই পাপ দূর করতে না পারলে আমাদের উন্নতির সম্ভাবনা নেই। তিনি লিখেছেন, ‘মেয়েদের পূজা করেই সব জাত বড় হয়েছে। যে দেশে যে জাতে মেয়েদের পুজো নেই সেই দেশে সেই জাত কখনো বড় হতে পারেনি, কস্মিনকালেও পারবেও না। স্ত্রী জাতির অভ্যুদয় না হলে ভারতের কল্যাণের সম্ভাবনা নাই। এক পক্ষে পক্ষীর উত্থান সম্ভব নয়।’

Advertisement