নিশীথ সিংহ রায়
শিক্ষা একটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি। যে জাতি শিক্ষায় যত বেশি অগ্রসর, সেই জাতি তত বেশি সচেতন, মানবিক ও প্রগতিশীল। পশ্চিমী বিশ্ব বিশেষত ইউরোপ, আমেরিকা আমাদের থেকে শিক্ষায় উন্নত বলে তারা এত বেশি প্রগতিশীল এবং ধর্মমুক্ত। উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে বা বিশ্বকে পথ দেখায়। এই সমস্ত উন্নত দেশগুলির শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে এখনও বিশেষ পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কোথাও কোথাও কিছু মিলও রয়েছে বটে তবে তা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডকে সোজা করে দাঁড় করানোর মত যথেষ্ট নয়। হ্যাঁ, আমাদের কিছু কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজ বিশ্বমানের এবং সেখানকার শিক্ষার্থীরা বিশ্ব অর্থনীতির অনেকটাই পরিচালনা করেন তবুও আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার অনেকটাই এখনও পুরাতন প্রথানির্ভর অর্থাৎ ব্যবহারিক শিক্ষার থেকে মুখস্থ-নির্ভর এবং পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতামূলক। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখতে পাওয়া বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায়।
Advertisement
সরকারি ক্ষেত্রে তবু একটা ক্লাস পর্যন্ত পরীক্ষায় বসতে হয় না, কিন্ত বেসরকারি ক্ষেত্রে সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রিমাত্রিক বা বাৎসরিক এভাবে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসতেই হয়। বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার উদাহরণ দেওয়ার কারণ এখন ভারতে সরকারি স্কুলের থেকে বেসরকারি স্কুলে পড়ার প্রবণতা অনেক বেশি। যাই হোক, উন্নত দেশের শিক্ষার সঙ্গে আমাদের দেশের শিক্ষার তুলনামূলক আলোচনা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থা এখন ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এবং কোন পথে এগোলে তা আরও কার্যকর ও আধুনিক হতে পারে।
Advertisement
শিক্ষার উদ্দেশ্য ও দর্শন আমাদের বুঝতে হবে। উন্নত দেশগুলির শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীকে জীবনের জন্য প্রস্তুত করা। সেখানে শিক্ষার মাধ্যমে স্বাধীন চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া হয়। শিক্ষা যে শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয় বরং মানুষ গড়ার প্রক্রিয়া সেটার ওপর জোর দেওয়া হয়। আর একটা কথা ওই যে বললাম ‘সামাজিক দায়বদ্ধতা’ যেটা সুশিক্ষার প্রথম ধাপ সেটা শেখান হয়। অন্যদিকে, ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনও অনেকাংশে পরীক্ষা ও নম্বরকেন্দ্রিক। এখানে শিক্ষার্থীদের মানসিকতাই থাকে কীকরে পরীক্ষার খাতায় বেশি নম্বর পাওয়া যয়। সেকারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষার উদ্দেশ্য সীমাবদ্ধ থাকে ডিগ্রি অর্জন ও চাকরির যোগ্যতা অর্জনের মধ্যে। ফলে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা অনেক সময়ই অবদমিত হয়।
উন্নত দেশগুলির সঙ্গে আমাদের পাঠ্যক্রম ও বিষয়বস্তুর পার্থক্য এখনও অনেকটাই। উন্নত দেশগুলিতে পাঠ্যক্রম অত্যন্ত নমনীয় ও যুগোপযোগী। শিক্ষার্থীরা নিজেদের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করতে পারে। বিজ্ঞান, মানববিদ্যা, শিল্পকলা, প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে বাস্তব জীবনের সঙ্গে পাঠ্যক্রমের সরাসরি সংযোগ থাকে। এদিকে ভারতের পাঠ্যক্রম তুলনামূলকভাবে এখনও অনেক ক্ষেত্রে অত্যধিক তথ্যনির্ভর ও মুখস্থ বিদ্যানির্ভর। পাঠ্যসূচি প্রায়ই বাস্তব জীবনের চাহিদা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। যদিও সাম্প্রতিক শিক্ষানীতি (NEP 2020) এই কাঠামো বদলানোর চেষ্টা করছে, বাস্তবে তার প্রয়োগ এখনও সীমিত।
ভারতের শিক্ষাদান পদ্ধতি এখনও গতানুগতিক এটা বলা যায়। উন্নত দেশগুলিতে শিক্ষাদান পদ্ধতি মূলত শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক। সেখানে শ্রেণিকক্ষে আলোচনা, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, দলগত কাজ ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার উপর জোর দেওয়া হয়। শিক্ষক সেখানে একজন পথপ্রদর্শক বা সহায়ক মাত্র। ভারতে এখনও বহু ক্ষেত্রে শিক্ষক-কেন্দ্রিক শিক্ষাপদ্ধতি চালু রয়েছে। শিক্ষক তাঁর ক্ষমতা অনুযায়ী বলেন আর শিক্ষার্থী তা শোনে। আমাদের এই একমুখী পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার মানসিকতা ও যুক্তিবোধ অনেক সময় বিকশিত হয় না। তারা জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রায় পুরোটাই শিক্ষকের
উপর নির্ভরশীল।
উন্নত দেশে শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন শুধুমাত্র পরীক্ষার মাধ্যমে ওপর নির্ভর নয়। সেখানে ধারাবাহিক মূল্যায়ন, প্রকল্প, উপস্থাপনা, গবেষণা ও ব্যবহারিক দক্ষতার উপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি বিচার করা হয়। একটি পরীক্ষায় খারাপ ফল মানেই শিক্ষার্থী অযোগ্য এই ধারণা সেখানে নেই। একটা পরীক্ষায় ভাল বা খারাপ ফল জীবনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো তারতম্য আনে না। এদিকে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যায়ন এখনও প্রধানত লিখিত পরীক্ষা নির্ভর। বোর্ড পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রবল মানসিক চাপ, ভয় ও আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা যায়। তাই একটা পরীক্ষায় খারাপ ফল বা অকৃতকার্য মানে এখানে ধরা হয় তার জীবনের উন্নতির সব পথ বন্ধ হয়ে গেল।
উন্নত দেশগুলিতে শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক ও উচ্চমানের পেশা। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষকরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আধুনিক পদ্ধতিতে পড়াতে পারেন। এক্ষেত্রে বিশ্বে এক ব্যতিক্রম নাম ফিনল্যান্ড। আর ভারতে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মান সর্বত্র সমান নয়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদাও পান না। এর প্রভাব সরাসরি শিক্ষার গুণগত মানে পড়ে। আর শিক্ষকদেরও তাঁদের পেশাকে নিছক শিক্ষকতার চাকরি না ভেবে যখন তাকে সেবা হিসেবে ভাবতে পারবেন তখন শিক্ষকরা অবশ্যই তাঁদের প্রাপ্য সম্মান অবশ্যই পাবে।
আর একটা প্রধান দিক উন্নত প্রযুক্তি। শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহারে উন্নত দেশগুলি আমাদের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলিতে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত ব্যাপক। ডিজিটাল ক্লাসরুম, অনলাইন রিসোর্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা সেখানে সাধারণ বিষয়। ভারতে প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমশ বাড়লেও ডিজিটাল বিভাজন একটি বড় সমস্যা। তবু শহরাঞ্চলে ডিজিটাল সুযোগ সুবিধার অনেকটা এগোলেও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষায়াতনে এখনও তেমন ভাবে এগোয়নি। তাই গ্রামের বিদ্যালয়গুলিতে সুযোগের অসমতা এখনও প্রকট। আর ভারত আজও গ্রামনির্ভর। তাই বলা যায় দেশের একটা বিরাট অংশের শিক্ষার্থীরা আধুনিক সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত।
উন্নত দেশগুলিতে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করা হয়। সকল শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়। আমাদের এই মহাদেশের যেমন চিন, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মত দেশে উচ্চ-নীচ, ধনী-দরিদ্র সব শিক্ষার্থীদের একাসনে বসিয়ে সমাজে একটা সাম্যের বাতাবরণ তৈরি করা হয়। সেদিকে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতিফলন। ভালো শিক্ষা প্রায়ই উচ্চবিত্ত ও শহুরে সমাজের নাগালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আবার সেখানেও অনেকাংশে সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের দেখভাল করা হয়। আর গ্রামের দিকে এর প্রভাব আরও প্রকট। সেখানে জাতপাত, ধনী-দরিদ্র এগুলি খুবই দেখা যায়। শিক্ষার্থীরা শিশু বয়স থেকেই এর মুখোমুখি হওয়ার জন্য সমাজে এর একটা খারাপ প্রতিক্রিয়া হয় যা সুশিক্ষার অন্তরায়।
এটা আমরা বুঝতে পারলাম উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য মূলত দৃষ্টিভঙ্গি, কাঠামো ও বাস্তব প্রয়োগে। ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহ্য ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, আধুনিকীকরণ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে তা অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে। উন্নত দেশগুলির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, ভারত যদি শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে জীবনমুখী, সৃজনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে পারে, তবে ভবিষ্যতে ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাও বিশ্বমানের হয়ে উঠতে পারে যার কিছুটা ঝলক আমরা
দেখেছি ইঞ্জিনিয়ারিং বা ম্যানেজমেন্ট শিক্ষায়তনগুলির ক্ষেত্রে।
Advertisement



