• facebook
  • twitter
Monday, 23 March, 2026

বিচারাধীন ভোটারদের পরিণতি কী হবে?

দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সহ অন্যান্য ধর্মের প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে দেশ ছাড়া করতে অথবা ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢোকাতে চাইছে

গত অক্টোবর, ২০২৫ এসআইআর (SIR) শুরুর সময় পশ্চিম বাংলায় জনসংখ্যা ছিল ১০.৫৬ কোটি। একই সময়ে রাজ্যে ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯ জন অর্থাৎ রাজ্যের জনসংখ্যার ৭২.৫৪ শতাংশ ছিল ভোটার। এনুমারেশন পর্ব শেষে গত ১৬ ডিসেম্বর খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়। ওই তালিকা থেকে বাদ পড়েন ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯ জন। খসড়া তালিকায় দেখানো হয় নিখোঁজ ভোটারের সংখ্যা ১২ লক্ষ ২০ হাজার ৩৮। মৃত ভোটার রয়েছেন ২৪ লক্ষ ১৬ হাজার ৮৫২। স্থানান্তরিত ভোটারের সংখ্যা ১৯ লক্ষ ৮৮ হাজার ৭৬। ভুয়ো ভোটারের সংখ্যা ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৩২৮ ও নানা জটিলতার কারণে বাদ ৫৭ হাজার নাম।

তাহলে মোট দাঁড়াল ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৯ জন।এছাড়াও, প্রাথমিকভাবে খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে আনম্যাপড অর্থাৎ ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে কোনও সংযোগ দেখাতে পারেনি এমন ৩০ লক্ষ ভোটার। ৬ নম্বর ফর্মের মাধ্যমে নতুন নাম যুক্ত হয়েছে ১ লক্ষ ৮২ হাজার ৩৬ জনের। ৮ নম্বর ফর্মের মাধ্যমে নাম যুক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৬৭১ জনের এবং ৭ নম্বর ফর্মের মাধ্যমে বাদ দেওয়া হয়েছে ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম।
খসড়া তালিকা প্রকাশের সময় ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৮ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৪ জন।

Advertisement

এই ৭ কোটি ৮ লক্ষ ৫৯ হাজার ভোটারের মধ্যে শুনানির জন্য চিহ্নিত হন প্রায় ১ কোটি ৫২ লক্ষ ভোটার। এর মধ্যে ‘নো-ম্যাপিং’ ভোটারের সংখ্যা ৩১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৪২৬ জন ভোটার ২০০২ সালের শেষ এসআইআরের সঙ্গে লিঙ্ক দেখাতে পারেননি। বাকি ১ কোটি ২০ লক্ষ ভোটার এবং সব মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৪২ লক্ষ ভোটারকে তথ্যগত অসঙ্গতি (লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি)-র জন্য শুনানিতে ডেকে পাঠায় কমিশন। ১ কোটি ৪২ লক্ষ ভোটারদের নথি যাচাই এবং নিষ্পত্তি নিয়ে রাজ্য ও কমিশনের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়।

Advertisement

৮২ লক্ষ ভোটারের নথি নিয়ে ইআরও এবং এইআরও-দের সঙ্গে সহমত হয় কমিশন। বিতর্ক বাধে বাকি ৬০ লক্ষ ভোটারকে নিয়ে। ইআরও এবং এইআরও-দের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হয়নি কমিশন। অভিযোগ, কমিশনের নিযুক্ত মাইক্রো অবজারভারেরা বিপরীত মত দেন। পরে সুপ্রিম কোর্ট এই ৬০ লক্ষ ভোটারের নথি নিষ্পত্তির জন্য বিচারকদের দায়িত্ব দেন। আগামী বিধানসভা ভোটের মনোনয়নের শেষ দিন পর্যন্ত ধাপে ধাপে ৬০ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম তদন্ত করে তালিকা প্রকাশ করা হবে। আপাতত এটিকে ‘বিচারাধীন’ হিসাবে রেখেছে কমিশন। এই অবস্থায় দেখা যাচ্ছে কিছু ভোটারের নাম নিষ্পত্তি হলেও, ভবিষ্যতে নাম বাদ পড়বে অনেক বৈধ ভোটারের।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় রাজ্যে নাম রয়েছে ৬ কোটি ৪৪ লক্ষ ৫২ হাজার ৬০৯ জনের। বাদ পড়া তালিকা থেকে দেখা যাচ্ছে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা যেমন মালদহ উত্তর দিনাজপুর মুর্শিদাবাদ, নদিয়া থেকে বেশি নাম বাদ গিয়েছে আর তথ্যগত অসঙ্গতির নামে ‘বিচারাধীন’ অবস্থায় আছে। আছে হিন্দুদের মধ্যে নমঃশূদ্র বর্গ, রাজবংশী, মতুয়া সম্প্রদায়, আদিবাসী ও প্রান্তিক গরীব জনগণ।বিহার, তামিলনাড়ু, ইত্যাদি রাজ্যে এসআইআর চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যত নাম বাদ গিয়েছে, তার থেকে বেশি নাম যোগ হয়েছে কিন্তু পশ্চিম বাংলায় ঠিক উল্টো ছবি। খসড়া তালিকায় যোগ হয়েছে ১ লক্ষ ৮২ হাজারের নাম।

বাদ গিয়েছে ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার। ৩ গুণের বেশি। সন্দেহ করা হচ্ছে, এইসব বাদ যাওয়া মানুষদের আধার কার্ড লক করা হবে, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হবে, অন্যান্য নাগরিক সুযোগ সুবিধে থেকে বঞ্চিত হবেন।সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ‘বিচারাধীন’-এর পরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নাগরিকদের পুনর্বিচারের আবেদন বিচার করার জন্য ২৩টি জেলার জন্য ১৯টি ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে। ট্রাইবুনালে রয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও ১৯ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। অনলাইনে এখানে আবেদন করা যাবে।

এদেশের বিচারব্যবস্থায় ট্রাইবুনালের ভূমিকা নিয়ে দেশের প্রধান বিচারপতি মাত্র কয়েক দিন আগে (২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, LIVE LAW) তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। দুর্নীতির ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ট্রাইবুনালের অনেক সদস্য নিজে রায়ই লেখেন না। রায় লেখার দায়িত্ব ভাড়া করা লোককে দেন। তিনি ট্রাইবুনালগুলোকে বিচার ব্যবস্থার বোঝা হিসাবে বর্ননা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বিচারব্যবস্থার ট্রাইবুনালাইজেশন বিচার ব্যবস্থার ভয়ানক ক্ষতি করছে। অথচ সেই প্রধান বিচারপতি লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব বিচারের গুরুদায়িত্ব দিলেন ট্রাইবুনালের উপর।

আমরা এখানে আসামের ফরেনার্স ট্রাইবুনালগুলোর কথা স্মরণ করতে পারি, কীভাবে টাকার খেলা চলেছে সেখানে। তারপরও ১৯ লক্ষ মানুষ বেনাগরিক হয়েছেন। তার মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি। অনেকেই ডিটেনশন ক্যাম্পে ছিলেন ২/৩ বছর। বোঝাই যাচ্ছে, কী ভয়ংকর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে এরাজ্যের লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক মানুষ বা নাগরিকদের জন্য।এই অবস্থায় রাজ্যে ভোট ঘোষিত হয়েছে। ভোটার তালিকার এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনের বাদ দেওয়ার এসআইআর প্রক্রিয়াকে বিজেপি প্রথম থেকেই জোরদারভাবে সমর্থন করে আসছে। তাদের চরম প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা আমাদের কাছে স্পষ্ট।

রাজ্যে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রাথমিক পর্যায়ে এই ব্যাপারে কিছু আপত্তি করলেও পরে বিরোধিতা কর্মসূচি তুলে নেয়। সংসদীয় বামেদের বক্তব্যেও এই সব বাদ পড়া বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির তালিকায় বিচারাধীন থাকা ভোটারদের কথা আপাতত নেই। বোঝা যাচ্ছে, বিজেপির এই ভোটার তালিকা সংশোধন এসআইআর প্রকল্পের বিরুদ্ধে রাজ্যের শাসক দল-সহ বামেরা কোনও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে অক্ষম। বরং নির্বাচনে তাদের নীরব অংশগ্রহণের ফলে তারা একভাবে এখন এই প্রক্রিয়ার অংশীদার হয়ে পড়েছে।

এই অবস্থায় সংসদীয় রাজনৈতিক দলগুলি ভোট ছাড়া কিছু ভাববে না, এটা পরিস্কার। কিন্তু, বাকিরা? আমরা সাধারণ নাগরিকরা, আমাদের সাধ্যমত প্রতিবাদে সামিল হয়ে দাবি করতে পারি— প্রকৃত মৃত ভোটার ছাড়া রাজ্যের বাকি সমস্ত ভোটারদের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। দেশের জন প্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০ অনুযায়ী রাজ্যের সমস্ত নাগরিকদের (১৮ বছর ও তার উর্ধ্বে) ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকত্ব হরণকারী SIR প্রক্রিয়া বাতিল করো।ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশনের নেহাতই একটি সাধারণ কাজ।

এই প্রক্রিয়ায় তালিকা থেকে মৃত, স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত ভোটার, একই ভোটারের একাধিক স্থানে থাকা নাম খুঁজে বের করা, সেগুলো তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং নতুন সদ্য প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।কিন্তু, গতবছর থেকে আইনি এবং সাংবিধানিক এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে দেশের সমস্ত ভোটারদের নতুন করে নাগরিকত্ব যাচাই শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। বিংশ শতাব্দীর তিরিশ দশকে জার্মানিতে হিটলার ইহুদি ও অন্যান্য মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছিল। তাঁদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করে।

তাঁদের চাকরি ও বিভিন্ন পেশা থেকে বহিষ্কার করা হয়। ব্যবসা ও সমস্ত পেশা থেকে বিতারিত করে তাঁদের রোজগার বন্ধ করা হয়। পরবর্তীকালে তাঁদের দেশ ছাড়া করা হয় এবং গ্যাস চেম্বারে ঢোকানো হয়। হিটলারের শিষ্যরা আরএসএস-বিজেপি এখন সেই পথে চলেছে। দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সহ অন্যান্য ধর্মের প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে দেশ ছাড়া করতে অথবা ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢোকাতে চাইছে। আগামীদিনে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নাগরিকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে, আমাদের সহ-নাগরিকদের পাশে দৃঢভাবে দাঁড়াতে হবে।

Advertisement