শোভনলাল চক্রবর্তী: কয়েক দশক আগেও যাকে মনে হত অফুরান, সেই জলের ভান্ডারেও কি দুনিয়া দেউলিয়া হতে বসেছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্টটির নামই ‘গ্লোবাল ওয়াটার ব্যাঙ্করাপ্সি’— ‘জল দেউলিয়া বিশ্ব’। সমস্যাটির খণ্ডচিত্র সবার দেখা, সবার জানা। বিশ্বের বিভিন্ন শহরাঞ্চলে এক-এক সময় তৈরি হয় তীব্র জলসঙ্কট, এক বালতি জলের জন্য হন্যে হতে হয় শহরবাসীকে। আবার, অনাবৃষ্টি বা খরার কারণে কৃষির বিপন্নতার কথাও একই রকম জানা। রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের সব প্রান্তে এই সমস্যা সমান তীব্র নয়।
কোথাও জলের অভাব এখনই প্রকট, আবার কোথাও সে বিপদ লুকিয়ে আছে সুদূর বা অদূর ভবিষ্যতের গর্ভে। কিন্তু, কোনও এক অঞ্চল জলের অভাবে বিপন্ন হওয়া যে আসলে এখনই বিপন্ন না-হওয়া অঞ্চলগুলির জন্যও সমান সমস্যার, সে কথা মনে করিয়ে দিয়েছে রিপোর্টটি। কারণ, গোটা দুনিয়া এখন জোড়া রয়েছে হরেক সূত্রে— কোথাও সে সুতোর নাম বাণিজ্য, আবার কোথাও অভিবাসন। বিশ্বের এক প্রান্ত কৃষি অনাবৃষ্টি বা বন্যার কারণে বিপন্ন হলে যেমন সুদূরে তার প্রভাব পৌঁছে যায় খাদ্যের জোগানশৃঙ্খল বেয়ে, তেমনই ধারাবাহিক অনাবৃষ্টি বা বন্যায় বিপর্যস্ত অঞ্চলের মানুষের বাধ্যতামূলক অভিবাসন চাপ বাড়ায় অন্য প্রান্তে।
Advertisement
রিপোর্টটি মনে করিয়ে দিয়েছে যে, অনাবৃষ্টি বা খরা যেমন জলসঙ্কটের একটি রূপ, স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এবং বন্যাও তার আর একটি রূপ। এবং, খরা ও বন্যা দুই-ই এক অভিন্ন সমস্যার দুই ধরনের বহিঃপ্রকাশ। সে সমস্যা হল পাল্টে যাওয়া বৃষ্টির ধরন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হয়েছে। দীর্ঘ অনাবৃষ্টির পর অল্প কয়েক দিনের মধ্যে প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে বন্যা হচ্ছে, কিন্তু সে জল মাটির গভীরে প্রবেশ করার অবকাশ পাচ্ছে না। ফলে, মাটির নীচে জলের স্তর পূরণ হওয়ারও সুযোগ ঘটছে না। অন্য দিকে, হিমবাহের গলনের চরিত্রও পাল্টেছে, ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীর জলপ্রবাহও অনিয়মিত হয়েছে।
Advertisement
সমস্যা শুধু বৃষ্টিরই নয়, তুষারপাতেরও। এই মুহূর্তে ভারতের হিমালয় সংলগ্ন রাজ্যগুলিতে তুষারপাতের খরা চলছে। তার অর্থ এই নয় যে, শীতের শেষ পর্বেও সেখানে তুষারপাত হবে না। হয়তো হবে, হয়তো স্বাভাবিকের চেয়ে ঢের বেশি হবে। কিন্তু শেষ-শীতের সেই তুষার চরিত্রে আলাদা— তা দ্রুত গলবে, ফলে মাটির পক্ষে তার আর্দ্রতা টেনে নেওয়ার যথেষ্ট সময় মিলবে না। এই ঘটনাগুলির সম্মিলিত ফল হল, জলের প্রয়োজনের সঙ্গে জোগানের সাযুজ্য নষ্ট হবে। এই অবস্থায় জল-নীতিকে নতুন করে ভাবতে হবে।
জলের অভাব মানে যে শুধু বসতি এলাকায় বাড়তি জলের জোগানের ব্যবস্থা করা বা কৃষিতে সেচের পরিধি বিস্তার নয়, তার চেয়ে ঢের বেশি কিছু, সে কথা বুঝতে হবে। প্রথম প্রয়োজন বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি তৎপর ও কুশলী নীতি গ্রহণ। মাটির জলধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধির পন্থা উদ্ভাবনের জন্য আরও অনেক গবেষণা চাই। এবং, বৃহত্তর ভাবে, বৃষ্টিপাত ও জলের সঙ্কটের প্রশ্নটিকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ করে তুলতে হবে। মানবোন্নয়নের ক্ষেত্রে তার নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলে যেতে হবে বারংবার।
জলের অপর নাম যে জীবন, শিশুপাঠ্য এই উপদেশটি কোনও মতেই বিস্মৃত হওয়া চলবে না। ২০১৫ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ ঘোষণা করে সাস্টেনেবল ডেভলপমেন্ট গোলস (এসডিজি) বা সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহ। মোট ঘোষিত লক্ষ্য ১৭টি, ২০৩০ সালের মধ্যে তা পূরণ করার কথা বলেছিল রাষ্ট্রপুঞ্জ। গোটা পৃথিবী এবং তার সব অধিবাসীর জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করাই এসডিজি-র লক্ষ্য; পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদের মোকাবিলা করাও। এসডিজি-র প্রথম তিনটি লক্ষ্য হল দারিদ্র দূরীকরণ, দুনিয়াকে ক্ষুধামুক্ত করা, এবং, সকলের সুস্বাস্থ্য ও সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ নিশ্চিত করা।
ছয় ও সাত নম্বর লক্ষ্য হল সকলের জন্য পরিস্রুত পানীয় জল, ও নিকাশির ব্যবস্থা করা এবং সুলভ দূষণহীন শক্তির ব্যবস্থা করা। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই বিষয়গুলির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ ঠেকানোর সম্পর্ক কী? মাইক্রোসফট-এর প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস হাউ টু অ্যাভয়েড আ ক্লাইমেট ডিজাস্টার (২০২১) বইটিতে সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। বিল এবং তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’ (বিএমজিএফ) নামে একটি অলাভজনক সংস্থা চালান— সংস্থাটি বিশ্ব-স্বাস্থ্য, লিঙ্গসাম্য, পরিবেশ দূষণ, সার্বিক উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে বিশ্ব জুড়ে কাজ করে।
সকলের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কাজ ও উন্নয়নের দাবিকে (অর্থাৎ সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো) প্রতিষ্ঠা করা এই সংস্থার ঘোষিত নীতির মধ্যে পড়ে। সংস্থার কাজের ফলাফল ও তার বিশ্লেষণ থেকে বিশ্বের সার্বিক উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ার পিছনে দু’টি প্রাথমিক কারণ শনাক্ত করা যায়, যেগুলি পরিবেশের সঙ্গে গভীর ভাবে সম্পর্কিত— এক, শক্তির ব্যবহার; এবং দুই, জলবায়ু পরিবর্তন। সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের ৮৬ কোটি মানুষের কাছে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছয়নি। রান্না, আলো জ্বালানো ইত্যাদি দৈনন্দিন কাজের জন্য তাঁরা কাঠকুটো-কয়লা-ঘুঁটে-তেল যাই ব্যবহার করুন, তা কার্বন নিঃসরণ করছে, ফলে নিয়মিত দূষণ ঘটছে।
যত ক্ষণ তাঁদের জন্য বিদ্যুতের মতো সবচেয়ে দূষণহীন শক্তির ব্যবস্থা না করা হচ্ছে, তত ক্ষণ এই দূষণ ঘটেই চলবে। অন্য দিকে, জলবায়ু বদলের কারণে গাছের ফল, খেতের ফসল ও জলজ প্রাণীর সংখ্যা ও জীবনচক্রে যে পরিবর্তন হচ্ছে, তা কোটি কোটি মানুষের জীবনের প্রাথমিক চাহিদা জল ও খাদ্য নিরাপত্তাকে চূড়ান্ত ভাবে বিঘ্নিত করছে। এর মধ্যে অরণ্যবাসী মানুষ, পশুপালনকারী যাযাবর গোষ্ঠীর মানুষ যেমন আছেন, তেমনই কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী, মউলিদের মতো বিভিন্ন প্রকৃতি নির্ভর পেশাদাররাও আছেন।
এই ফলাফলের সামনে দাঁড়িয়ে আর সব উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে যায়। তাই সুলভে দূষণহীন বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং তা সকলের কাছে পৌঁছে যাওয়া তো বটেই, জলবায়ু বদলের প্রতিরোধ করাও সুস্থায়ী উন্নয়নের আবশ্যিক লক্ষ্য।তার জন্য শিল্পের পরিকাঠামোকে অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক করে তুলতে হবে, যাতে নতুন নতুন উদ্ভাবনকে অগ্রগতির হাতিয়ার করে তোলা যায় (এসডিজি-র নবম লক্ষ্য)। বিল গেটসও নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনের কথাই বলেছেন, যা জীবাশ্ম জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে।
আর আবহাওয়া-জলবায়ু-পরিবেশ এই সবই জল ও স্থলের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রের উপরে নির্ভরশীল; তাই সুস্থায়ী উন্নয়ন মানে যে আসলে জঙ্গলের গভীর থেকে জলের নীচে সর্বত্র জীবনকে নির্বিঘ্নে বিকশিত হতে দেওয়া, সে কথাও ১৪ ও ১৫ নম্বর লক্ষ্যে উল্লেখ করা আছে। তবে সুস্থায়ী উন্নয়নের সব লক্ষ্যই পূরণ হতে পারে একমাত্র সার্বিক ও যথার্থ শিক্ষার মাধ্যমে; তাই সার্বিক শিক্ষার প্রসারকেও তালিকার চার নম্বরে রাখা হয়েছে। সুস্থায়ী উন্নয়ন যে-হেতু আসলে সার্বিক উন্নয়ন, তাই লিঙ্গসাম্য (নারী-পুরুষ অনুপাতের সমতা) এবং নারীর ক্ষমতায়ন এর একটি আবশ্যক উদ্দেশ্যের মধ্যে পড়ে যায় (পঞ্চম লক্ষ্য)।
ক্ষমতায়নের ফলে নারী ও নারীশ্রম অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কিন্তু তা ছাড়াও মহিলারা তাঁদের সঞ্চয়মুখী ও সাশ্রয়মুখী স্বভাবের কারণে নানা ধরনের সম্পদ সংরক্ষণের দিকে যে পদক্ষেপ করে থাকেন, তা পরিবেশের পক্ষে সর্বদাই অনুকূল হয়। সে বৃষ্টির জল ধরে রাখাই হোক আর নিবে আসা আগুনে ‘গমে গমে’ কিছু রান্না করাই হোক বা পুরনো কাপড় দিয়ে পোশাক, চাদর, পর্দা বানানোই হোক। পারিবারিক বা প্রাতিষ্ঠানিক উভয় অর্থেই নারী ক্ষমতায় থাকলে এই কাজগুলো অনেক বেশি ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে যা আসলে পরিবেশবিদ্যায় পড়া ‘থ্রি-আর’ (রিডিউস, রি-ইউজ, রিসাইকল)-কেই সমর্থন করে।
Advertisement



