• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 4 June, 2026

বৈভব সূর্যবংশী : এক ব্যতিক্রমী সম্ভাবনা

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দ্রুতগতির ভেতরেও এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ বিরল। বিশেষ করে একজন পনেরো বছরের কিশোরের ক্ষেত্রে তা প্রায় অবিশ্বাস্য

ফাইল চিত্র

সৈয়দ হাসমত জালাল : ক্রিকেটে কখনও কখনও এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা স্কোরবোর্ডের সংখ্যাকে ছাপিয়ে যায়। সেই মুহূর্তগুলোতে খেলা কেবল খেলা থাকে না— তা হয়ে ওঠে সময়ের দলিল। এবারের আইপিএলে তেমনই এক দলিল রচনা করছে এক পনেরো বছরের কিশোর—বৈভব সূর্যবংশী। এই বয়সে ক্রিকেট সাধারণত শেখার জায়গা। ভুল করার, সংশোধন করার, বড় হওয়ার সময়। অথচ বৈভব যেন সেই সমস্ত ধাপ অতিক্রম করে সরাসরি মঞ্চের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে। শুধু দাঁড়িয়েছে বললে কম বলা হয়—সে আলো কেড়ে নিয়েছে।

সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে এলিমিনেটর ম্যাচে তার ২৯ বলে ৯৭ রানের ইনিংসটি প্রথম বিস্ফোরণ। কিন্তু এই বিস্ফোরণ হঠাৎ নয়; এটি ছিল প্রস্তুতির, সাহসের এবং অদ্ভুত এক স্বচ্ছন্দতার ফল। প্লে-অফের চাপ যেখানে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদেরও চাপে ফেলে, সেখানে এক কিশোর এমন নিশ্চিন্তে ব্যাট করছে— এ দৃশ্য নিজেই প্রশ্ন তোলে: ক্রিকেট কি নতুন এক মানসিকতার দিকে এগোচ্ছে?
এই ইনিংসে তার ১২টি ছক্কা কেবল শক্তির প্রদর্শন নয়; এগুলো ছিল টাইমিং, পজিশনিং এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিখুঁত উদাহরণ। বিশেষ করে প্যাট কামিন্সের বিরুদ্ধে পরপর তিনটি ছক্কা— এটি নিছক দুঃসাহস নয়, এটি এক গভীর আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক মানের বোলারকে পড়ে নেওয়ার ক্ষমতা সাধারণত বহু বছরের অভিজ্ঞতার ফল। বৈভব সেই অভিজ্ঞতাকে যেন স্বতঃসিদ্ধভাবে অর্জন করেছে।
এই ইনিংসের মধ্য দিয়েই সে ভেঙে দেয় এক আইপিএল মরসুমে সর্বাধিক ছক্কার রেকর্ড। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে পাওয়ার-হিটিংয়ের যে আধিপত্য এতদিন প্রতিষ্ঠিত ছিল, তার এক নতুন সংজ্ঞা যেন তৈরি হতে শুরু করে। এখানে শুধু শক্তি নয়, বুদ্ধি এবং গতি— দুটির সমন্বয় জরুরি। বৈভব সেই সমন্বয় ঘটাচ্ছে স্বাভাবিকভাবে।তবে একটি ইনিংস দিয়ে কোনও ক্রিকেটারের মূল্যায়ন সম্পূর্ণ হয় না। বড় খেলোয়াড়দের আলাদা করে তাদের ধারাবাহিকতা। আর সেখানেই বৈভবের গল্প আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
কোয়ালিফায়ার ২— প্রতিপক্ষ গুজরাট টাইটানস। সামনে ফাইনালে ওঠার লড়াই। এলিমিনেটরের ঝড়ো ইনিংসের পর তার দিকে সব নজর। প্রতিপক্ষ প্রস্তুত, পরিকল্পনা সাজানো। এই অবস্থায় অনেক তরুণ ব্যাটসম্যান চাপে ভেঙে পড়ে। কিন্তু বৈভব ভেঙে পড়েনি; বরং নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে।
৪৭ বলে ৯৬— সংখ্যাটা আবার অসম্পূর্ণতার গল্প বলে। এলিমিনেটরে ৯৭, এখানে ৯৬। দু’বারই শতরান হাতছাড়া। কিন্তু এই দুই ইনিংসকে পাশাপাশি রাখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়— সে নিজেকে বদলাতে পারে।
এলিমিনেটরে যেখানে শুরু থেকেই আক্রমণ, সেখানে কোয়ালিফায়ারে তার ব্যাটিংয়ে ছিল স্তরবিন্যাস। প্রথমে সংযম, তারপর গতি বাড়ানো, এবং শেষে আক্রমণাত্মক সমাপ্তির চেষ্টা। এই ‘ইনিংস বিল্ডিং’ ক্ষমতাই তাকে কেবল হিটার নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ ব্যাটসম্যান হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই ইনিংসে সে শুধু বাউন্ডারি খোঁজেনি; গ্যাপ ব্যবহার করেছে, সিঙ্গল-ডাবল নিয়েছে, স্ট্রাইক ঘুরিয়েছে।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দ্রুতগতির ভেতরেও এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ বিরল। বিশেষ করে একজন পনেরো বছরের কিশোরের ক্ষেত্রে তা প্রায় অবিশ্বাস্য।
তবুও, ম্যাচের ফলাফল তার পক্ষে যায়নি। রাজস্থান রয়্যালস হেরে যায়, তাদের যাত্রা শেষ হয়। কিন্তু এখানেই বৈভবের গল্প আলাদা হয়ে ওঠে। কারণ, পরাজয়ের মধ্যেও তার ইনিংস আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।ক্রিকেটে ব্যক্তিগত সাফল্য অনেক সময় দলের ফলাফলের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। কিন্তু কিছু ইনিংস থাকে, যা ম্যাচের ফলাফলকে অতিক্রম করে যায়। বৈভবের এই দুটি ইনিংস সেই শ্রেণির।
টানা দুই প্লে-অফ ম্যাচে ১৯৩ রান— সংখ্যাটি নিজেই একটি বিবৃতি। কিন্তু তার থেকেও বড় হলো তার প্রভাব। প্রতিপক্ষ দলগুলো এখন তাকে নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা করছে। তার বিরুদ্ধে বোলিং করা মানে শুধু লাইন-লেংথ ঠিক রাখা নয়; তার মানে মানসিক প্রস্তুতি।তার ব্যাটিংয়ের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘স্পেস’ তৈরি করা। বোলার যখন নতুন কিছু চেষ্টা করে, সে সেটিকে নিজের খেলায় টেনে আনে। অফ-স্টাম্পের বাইরে বল হলে কাট, শর্ট বল হলে পুল, ফুল লেংথ হলে লফটেড ড্রাইভ— সবকিছু যেন পূর্বনির্ধারিত নয়, কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে সঠিক।
এই স্বতঃস্ফূর্ততাই তাকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। কারণ, তাকে পড়া কঠিন। বোলার যখন ভাবে– সে একটি নির্দিষ্ট শট খেলবে, তখন সে অন্য কিছু করে বসে।তার টেকনিক নিয়েও আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। সে ব্যাকলিফট ব্যবহার করে উচ্চতায়, কিন্তু তার হেড পজিশন স্থির। শট খেলার সময় শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয় না। এই মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক থাকায় সে বড় শট খেললেও নিয়ন্ত্রণ হারায় না।
এই জায়গায় তাকে আগের প্রজন্মের কিছু ব্যাটসম্যানের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কম বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উঠে আসা ক্রিকেটারদের ইতিহাসে আমরা দেখেছি— যারা টেকনিক এবং মানসিকতার সমন্বয় করতে পেরেছে, তারাই টিকে গেছে।কিন্তু তুলনার ফাঁদও বিপজ্জনক। প্রত্যেক প্রজন্মের ক্রিকেট আলাদা। বর্তমান টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের গতি, চাপ, প্রত্যাশা— সবই ভিন্ন। বৈভব সেই নতুন বাস্তবতার সন্তান।
তাই তাকে পুরনো মানদণ্ডে মাপা ঠিক নয়; বরং নতুন মানদণ্ড তৈরির সম্ভাবনা হিসেবেই দেখা উচিত।এই সম্ভাবনাই ক্রিকেটবিশ্বকে উত্তেজিত করছে। প্রাক্তন ক্রিকেটার, বিশ্লেষক, ধারাভাষ্যকার— সবাই তার ব্যাটিং নিয়ে কথা বলছেন। কেউ বলছেন ‘দুর্লভ’, কেউ বলছেন ‘অবিশ্বাস্য’, কেউ বা ‘জেনারেশনাল’।
তবে এইসব বিশেষণের মধ্যেও একটি সতর্কতা প্রয়োজন। খুব অল্প বয়সে অতিরিক্ত প্রত্যাশা অনেক সময় বিপরীত প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিভা যত বড়, চাপও তত বেশি।
এখানেই বৈভবের মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শতরান মিস করার পর তার প্রতিক্রিয়া ছিল সংযত। সে ব্যক্তিগত মাইলফলক নিয়ে বেশি ভাবেনি; দলের জয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি একজন ক্রিকেটারের দীর্ঘ পথচলার ভিত্তি তৈরি করে।ক্রিকেটে টিকে থাকার জন্য শুধু প্রতিভা নয়, প্রয়োজন ধৈর্য, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং শেখার ইচ্ছে। বৈভবের মধ্যে এই গুণগুলোর উপস্থিতি তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী করে।
এই আইপিএল তাই তার জন্য একটি সূচনা। হয়তো এখনও অসম্পূর্ণ, হয়তো এখনও অনেক কিছু শেখার বাকি— তবুও এই সূচনার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।রাজস্থান রয়্যালস হয়তো ট্রফি জিততে পারেনি, কিন্তু তারা পেয়েছে ভবিষ্যতের এক স্তম্ভ। আর ক্রিকেট পেয়েছে এমন একজন খেলোয়াড়, যাকে ঘিরে আগামী দশকের গল্প লেখা যেতে পারে।শেষ পর্যন্ত, ক্রিকেট সময়ের খেলা। আজকের আলো কাল ম্লান হতে পারে। কিন্তু কিছু কিছু আলো থাকে, যা নিভে যাওয়ার আগে অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখিয়ে যায়। বৈভব সূর্যবংশী সেই আলোর মতোই— অসম্পূর্ণ, কিন্তু উজ্জ্বল; অপরিণত, কিন্তু সম্ভাবনাময়।
হয়তো কয়েক বছর পর আমরা ফিরে তাকিয়ে দেখব— এই অসমাপ্ত শতরানগুলিই ছিল এক পূর্ণতার সূচনা।