• facebook
  • twitter
Thursday, 19 March, 2026

পশ্চিম সীমান্তে অশান্তি

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগুন যখন ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ঘিরে, তখন তার ছায়া পড়তে শুরু করেছে দক্ষিণ এশিয়ার উপরেও

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগুন যখন ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত ঘিরে, তখন তার ছায়া পড়তে শুরু করেছে দক্ষিণ এশিয়ার উপরেও। ভারতের পশ্চিম সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, সীমান্ত-জটিলতা এবং সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ— সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক।

সম্প্রতি পাকিস্তানের বিমান হামলায় কাবুলের একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র ধ্বংস হওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। বহু নিরীহ মানুষের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে, যদিও পাকিস্তান দাবি করেছে যে তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। কিন্তু দৃশ্যমান প্রমাণের সঙ্গে সেই দাবি মেলে না। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে ভারত, যা একে ‘কাপুরুষোচিত আক্রমণ’ বলে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অবস্থান যথার্থ, কারণ যুদ্ধের বলি হিসেবে সাধারণ মানুষ, বিশেষত অসহায় ও চিকিৎসাধীন মানুষদের মৃত্যু কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

Advertisement

পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের অবনতি নতুন নয়। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-কে ঘিরে দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান তালিবান প্রশাসন এই জঙ্গিগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং তাদের মাধ্যমে পাকিস্তানে হামলা চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে আফগানিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একাধিক জঙ্গি হামলায় সেনা ও সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। তাতে আরও বেড়েছে উত্তেজনা।

Advertisement

এই সংঘাতের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ভূরাজনৈতিক অবস্থান। আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ পাকিস্তানের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ তুলেছে যে কাবুল ক্রমশ দিল্লির প্রভাববলয়ে চলে যাচ্ছে। যদিও বাস্তবে ভারত এখনও তালিবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, তবুও মানবিক সহায়তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখছে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া একদিকে কৌশলগত, অন্যদিকে আবেগপ্রসূত বলেও মনে হতে পারে।

একই সময়ে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ আন্তর্জাতিক মনোযোগকে অন্যদিকে সরিয়ে দিয়েছে, যা আঞ্চলিক শক্তিগুলিকে কিছুটা ‘স্বাধীনতা’ দিচ্ছে নিজেদের মতো করে পদক্ষেপ নেওয়ার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি সমর্থন ইসলামাবাদের সামরিক পদক্ষেপকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করছে, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে পাকিস্তান নিজেই সীমান্ত-সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে, যা ভারতের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি, অন্যদিকে এই অস্থিরতা পুরো অঞ্চলের জন্যই বিপজ্জনক। দুই ফ্রন্টে পাকিস্তানের সামরিক চাপ কিছু কৌশলগত স্বস্তি দিলেও, শেষ পর্যন্ত এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার পক্ষে শুভ নয়।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের ভূমিকা সীমিত হলেও গুরুত্বহীন নয়। সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ না থাকলেও, আঞ্চলিক মঞ্চ—বিশেষত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)-র মতো প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে সংলাপ ও উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ, বিশেষত আফগানিস্তানের মতো দেশে, যেখানে নারীরা ও দুর্বল জনগোষ্ঠী ইতিমধ্যেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছে।
সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি সীমান্ত সংঘাত নয়; এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিরতার পূর্বাভাস। সংযম, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এখন জরুরি।

Advertisement