স্কুলশিক্ষা দপ্তরের নতুন আদর্শ কার্যপ্রণালীটি পড়তে পড়তে একটি বাক্যে চোখ আটকে যায়। বিদ্যালয়ে উদ্বৃত্ত শিক্ষক চিহ্নিত করার
সময় নাকি সর্বাগ্রে বিবেচিত হবেন তাঁরা, যাঁদের জৈবিক বয়স কম। অর্থাৎ, কে কত দিন ধরে পড়াচ্ছেন তা নয়, কে কোন সালে জন্মেছেন— সেটিই ঠিক করে দেবে কার শিকড় উপড়ে ফেলা হবে।
পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন নিয়ে বিতর্কের অবকাশ কম। সরকারি হিসেব বলছে, রাজ্যে প্রায় ১,৬০০টি বিদ্যালয়ে একজনও পড়ুয়া নেই, প্রায় ৬,৭০০টিতে পড়ুয়ার সংখ্যা দশেরও কম, অথচ এই বিদ্যালয়গুলিতে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় সাতাশ হাজার। একদিকে ফাঁকা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক বসে আছেন, অন্য দিকে বহু বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে দিনভর পাঁচটি শ্রেণি সামলাতে হচ্ছে। এই অসাম্য মেটানো জরুরি। প্রশ্নটা তাই উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, পদ্ধতি নিয়ে। এবং পদ্ধতির গোড়াতেই যে মাপকাঠি বসানো হয়েছে, তা কেবল অযৌক্তিক নয়, তা অতীতের অন্যায়কে পুরস্কৃত করে বসে আছে।
কীভাবে, তা বুঝতে একটি বাস্তব দৃশ্যকল্প যথেষ্ট। ধরা যাক, একটি বিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ঠিকঠাক ছিল। বছর পাঁচেক আগে সেখানে অতিরিক্ত একজন শিক্ষক এসে যোগ দিলেন— বদলি হয়ে, এবং সেই বদলি নিয়ে এলাকায় প্রশ্ন উঠেছিল। তিনি বয়সে প্রবীণ। ওই বিদ্যালয়েই পনেরো বছর ধরে পড়াচ্ছেন আর একজন, যিনি বয়সে তুলনায় নবীন। নতুন কার্যপ্রণালী কার্যকর হলে উদ্বৃত্তের তালিকায় নাম উঠবে দ্বিতীয়জনের। যে বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট, প্রতিটি পড়ুয়ার পারিবারিক ইতিহাস তাঁর জানা, সেখান থেকে তিনি বিদায় নেবেন, আর যাঁর আসাটাই ছিল প্রশ্নচিহ্নিত, তিনি থেকে যাবেন। জন্মতারিখের অজুহাতে একটি সন্দেহজনক বদলি রাতারাতি বৈধতা পেয়ে যাবে।
এখানেই সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রসঙ্গটি এসে পড়ে। গত দেড় দশকে জেলায় জেলায় প্রাথমিক শিক্ষা সংসদ ও মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বদলি-প্রক্রিয়া ঘিরে যে অভিযোগ বারবার উঠেছে, তা কোনও গুজব নয়— তার অনেকগুলি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে, তদন্তকারী সংস্থার নথিতে ঠাঁই পেয়েছে। অভিযোগ ছিল, অর্থের বিনিময়ে পছন্দের বিদ্যালয়ে বদলি মিলত, এবং সেই বন্দোবস্তে জড়িয়ে থাকতেন সংসদের কিছু কর্তা, দফতরের কিছু আধিকারিক, এমনকি হাতে-গোনা কিছু শিক্ষকও। নতুন সরকারের কাছে তাই প্রথম দাবিটি পুনর্বিন্যাস নয়— নিরীক্ষা। গত দশ বছরে হওয়া বদলিগুলির একটি স্বাধীন পর্যালোচনা হোক, দেখা হোক কোন বদলি কোন নিয়মে, কোন যুক্তিতে হয়েছিল।
দ্বিতীয় আপত্তিটি আরও মৌলিক, এবং তা জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র পাঠ থেকেই উঠে আসে। যে নীতিকে এই কার্যপ্রণালীর বৈধতার ঢাল হিসাবে দেখানো হচ্ছে, সেই নীতির পঞ্চম অধ্যায়ের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদটি স্পষ্ট ভাষায় বলছে, শিক্ষকদের অতিরিক্ত বদলির অভ্যাসটি ক্ষতিকর এবং তা বন্ধ করতে হবে— যাতে পড়ুয়ারা তাদের আদর্শ ও শিক্ষা-পরিবেশের ধারাবাহিকতা পায়, বদলি হবে কেবল অত্যন্ত বিশেষ পরিস্থিতিতে, রাজ্যের নির্ধারিত সুস্পষ্ট কাঠামো মেনে, এবং স্বচ্ছ অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে। অর্থাৎ শিক্ষানীতি বদলিকে শেষ উপায় হিসাবে দেখে, প্রথম উপায় হিসাবে নয়। ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ শব্দবন্ধটিকে টেনে লম্বা করে যদি হাজার হাজার শিক্ষকের গণবদলিকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেটি নীতির প্রয়োগ নয়, নীতির অপব্যবহার। উল্লেখযোগ্য, দিল্লিতে দশ বছরের বেশি একই বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক বদলির নির্দেশ ঘিরে বিতর্কের সময় ওই একই অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়েই সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহারের দাবি উঠেছিল।
শিক্ষানীতির আরও দু’টি জায়গা এখানে প্রাসঙ্গিক। ওই অধ্যায়েরই ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে, শিক্ষকদের আর শিক্ষকতা-বহির্ভূত কাজে জড়ানো চলবে না; কঠোর প্রশাসনিক কাজ থেকে তাঁদের অব্যাহতি দিতে হবে, যাতে তাঁরা পুরো মনোযোগ শ্রেণিকক্ষে দিতে পারেন। আর ২ নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে, প্রতিটি বিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত তিরিশের নীচে রাখতে হবে এবং শূন্যপদ পূরণ করতে হবে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে। খেয়াল করার মতো বিষয়—শিক্ষানীতি ঘাটতি মেটানোর দাওয়াই হিসাবে নিয়োগের কথা বলেছে, বিদ্যমান শিক্ষকদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঠেলে দেওয়ার কথা বলেনি। সপ্তম অধ্যায়ে তার প্রস্তাব আরও নির্দিষ্ট: কাছাকাছি বিদ্যালয়গুলিকে নিয়ে বিদ্যালয়-গুচ্ছ গড়ে তুলে শিক্ষক ও পরিকাঠামো ভাগ করে নেওয়া হোক। বিষয়শিক্ষকের ঘাটতি মেটানোর এই সমাধানে কারও চাকরির ঠিকানা বদলায় না, অথচ পড়ুয়া শিক্ষক পায়। যে নীতি এই পথ দেখিয়েছে, তারই নাম করে উচ্ছেদের কার্যপ্রণালী তৈরি হওয়া স্ববিরোধিতার চূড়ান্ত।
দপ্তরের তরফে যুক্তি দেওয়া হতে পারে, কমবয়সিদের অবশিষ্ট কর্মজীবন দীর্ঘ, তাই নতুন বিদ্যালয়ে তাঁরা বেশি দিন কাজ করতে পারবেন, কিংবা অবসরের কাছাকাছি শিক্ষককে হঠাৎ সরানো অমানবিক। প্রথম যুক্তিটির মারাত্মক ত্রুটি হল, তা কার্যত পুনরাবৃত্তিযোগ্য— একজন শিক্ষক সর্বদাই কারও না কারও চেয়ে কমবয়সি, ফলে তাঁকে কর্মজীবনে বারবার উদ্বৃত্ত ঘোষণা করা যায়। দ্বিতীয় যুক্তিটি সঙ্গত, কিন্তু তার সমাধান গোটা তালিকাকে বয়সের ক্রমে সাজানো নয়, অবসরের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে থাকা শিক্ষকদের জন্য পৃথক সুরক্ষা-বিধান রাখলেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়। প্রশাসনিক সুবিধা কখনও ন্যায্যতার বিকল্প হতে পারে না, আর যে নিয়ম চোখে ন্যায্য ঠেকে না, দীর্ঘমেয়াদে তা
মামলার পাহাড়ই ডেকে আনে।
এই কার্যপ্রণালী এমন এক সময়ে এল, যখন শিক্ষকসমাজ এমনিতেই পরিশ্রান্ত। গত শীতে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের কাজে বুথ-স্তরীয় আধিকারিক হিসাবে যুক্ত ছিলেন হাজার হাজার শিক্ষক। কাজের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়া, এমনকি মর্মান্তিক পরিণতির খবরও একাধিক জেলা থেকে সংবাদমাধ্যমে এসেছে, পরিবারের অভিযোগ ছিল অসহনীয় চাপের। তার রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে জনগণনার প্রস্তুতিপর্ব, যেখানে আবার সেই শিক্ষকই ভরসা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যোগ্যতা-নির্ণায়ক পরীক্ষা ঘিরে অনিশ্চয়তা— কর্মরত বহু প্রাথমিক শিক্ষককে শীর্ষ আদালতের নির্দেশে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে টেট উত্তীর্ণ হতে হবে, নচেৎ চাকরি থাকবে না। একজন মধ্যবয়সি শিক্ষক তাই একই সঙ্গে ভোটার তালিকার নথি মেলাচ্ছেন, জনগণনার প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন, রাতে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এবং এখন খবরের কাগজে পড়ছেন যে, তাঁর জন্মসাল তাঁকে উদ্বৃত্ত বানিয়ে দিতে পারে।
সমালোচনা তখনই কাজের, যখন তার সঙ্গে বিকল্প থাকে। প্রথমত, উদ্বৃত্ত নির্ধারণের মাপকাঠি হোক ওই বিদ্যালয়ে যোগদানের ক্রম— যিনি সবার শেষে এসেছেন, তিনিই আগে বিবেচিত হবেন। এই নীতি প্রশাসনে বহু পরীক্ষিত, সমান বস্তুনিষ্ঠ, অথচ অভিজ্ঞতার প্রতি সুবিচার করে। দ্বিতীয়ত, বাধ্যতামূলক তালিকা তৈরির আগে স্বেচ্ছাবদলির আবেদন নেওয়া হোক, বহু ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের বড় অংশ এতেই মিটে যায়। তৃতীয়ত, অবসরের শেষ কয়েক বছরে থাকা শিক্ষক, গুরুতর অসুস্থ, প্রতিবন্ধকতাযুক্ত বা একক অভিভাবকদের জন্য সুস্পষ্ট ছাড় থাকুক। চতুর্থত, বদলি কার্যকর হোক কেবল শিক্ষাবর্ষের শুরুতে। পঞ্চমত, চূড়ান্ত তালিকার আগে খসড়া তালিকা ও তার ভিত্তি প্রকাশিত হোক, আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকুক এবং প্রতিটি জেলায় নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তিযোগ্য অভিযোগ-নিরসন ব্যবস্থা চালু হোক, যার সিদ্ধান্ত লিখিত কারণসহ জানানো হবে। ষষ্ঠত, উন্নীত বিদ্যালয়গুলিতে অনুমোদিত পদ সৃষ্টি ও নিয়মিত নিয়োগের সময়সূচি ঘোষণা করা হোক— কারণ বদলি দিয়ে শূন্যপদ পূরণ হয় না, কেবল শূন্যতা স্থান বদল করে।
বিশ্বের যে দেশগুলি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে, তাদের কারও পথই এটা নয়। ফিনল্যান্ড থেকে সিঙ্গাপুর— সর্বত্র শিক্ষকের কর্মজীবনকে যতটা সম্ভব স্থিতিশীল রাখা হয়, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ককে সম্পদ বলে গণ্য করা হয়। বিদ্যালয়ের ফল ভালো হয় শিক্ষকের ধারাবাহিক উপস্থিতিতে, ফাইলের নিখুঁত অনুপাতে নয়।
নতুন সরকার শিক্ষায় স্বচ্ছতা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব নিয়েছে। সেই প্রতিশ্রুতির প্রথম পরীক্ষাটি বোধহয় এখানেই। একটি অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে বড় কোনও অর্থ লাগে না, লাগে ভুল স্বীকারের সদিচ্ছা। জন্মতারিখ কোনও অপরাধ নয়; পনেরো বছর একই বিদ্যালয়ে থেকে যাওয়া তো নয়ই। যে ব্যবস্থা আগামী প্রজন্মকে যুক্তি শেখাতে চায়, তার নিজের নির্দেশিকাগুলিও যুক্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে— এটুকু প্রত্যাশা অন্তত অসংগত নয়।




