স্পেনের উত্তর আফ্রিকার উপকূলবর্তী ছোট্ট শহর সিউটা হঠাৎই আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের ঢল শুধু একটি সীমান্ত-সংকট তৈরি করেনি, বরং ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথাকথিত ঐক্যের ভিত কতটা নড়বড়ে— তা প্রকাশ করে দিয়েছে। অভিবাসন প্রশ্নে ইউরোপ যে এখনও একমত নয়, বরং স্বার্থের হিসেবেই সিদ্ধান্ত নেয়— এই ঘটনায় তা আরও স্পষ্ট।
এই প্রবল স্রোতের উৎস কোথায়? স্পেনের বক্তব্য, মানব পাচারকারী চক্র একটি সাম্প্রতিক আদালতের রায়কে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে ভুল বার্তা ছড়িয়েছে। সেই রায়ে বলা হয়েছিল, সমুদ্রপথে ধরা পড়া অভিবাসীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া ফেরত পাঠানো যাবে না। এই আইনি সূক্ষ্মতাকেই ‘খোলা দরজা’ হিসেবে প্রচার করা হয়। তারপর যা হওয়ার, তাই ঘটেছে— হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সিউটার দিকে ছুটে আসে। কেউ সাঁতরে, কেউ পাথরের গা ঘেঁষে, কেউ আবার স্রেফ ভিড়ের জোরে।
মানবিক দিকটি এখানে অনস্বীকার্য। উন্নত জীবনের স্বপ্ন, দারিদ্র্যের দমবন্ধ করা বাস্তবতা, বেকারত্বের হতাশা— এই সব মিলিয়েই মানুষকে ঠেলে দেয় এমন ঝুঁকির মুখে। মরক্কোর তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে অসন্তোষ জমছে, তা গত কয়েক বছরের প্রতিবাদেই স্পষ্ট। সিউটার ঢল সেই চাপেরই বহিঃপ্রকাশ।
কিন্তু এই ঘটনার আসল নাটক শুরু হয়েছে ইউরোপের ভিতরে। স্পেন যখন পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যস্ত, তখনই ইতালি শেনগেন চুক্তি আংশিক স্থগিত করে বসে। ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, চেক প্রজাতন্ত্র— সবাই একে একে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। যেন এই সংকট স্পেনের একার, আর অন্যরা দূর থেকে আঙুল তুলতে পারে।
এখানেই ইউরোপীয় সংহতির বড় প্রশ্ন। যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেকে ‘সম্মিলিত শক্তি’ বলে প্রচার করে, সেই জোটের সদস্য দেশগুলি কি সত্যিই সংকটের সময় একসঙ্গে দাঁড়াতে পারে? নাকি বাস্তবে প্রত্যেকে নিজের সীমান্ত, নিজের ভোটব্যাঙ্ক, নিজের রাজনীতি নিয়েই বেশি ব্যস্ত? স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের ক্ষোভ তাই অমূলক নয়। তাঁর কথায়, এই প্রতিক্রিয়া শুধু স্বার্থপর নয়, বিভাজনকেও উস্কে দেয়।
অন্যদিকে, ইতালির মতো দেশের যুক্তিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে, তা ইউরোপ ইতিমধ্যেই দেখেছে। দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান, জনমতের মেরুকরণ— সব কিছুর পেছনেই এই ইস্যুর বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা ও মানবিকতার মধ্যে টানাপোড়েন অনিবার্য।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়— সিউটা কি শুধু স্পেনের সমস্যা? ভৌগোলিকভাবে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের আফ্রিকার সঙ্গে একমাত্র স্থলসীমান্ত। তাই এই সীমান্তের সুরক্ষা গোটা ইউরোপের যৌথ দায়িত্ব হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দায়িত্বের চেয়ে দোষারোপই যেন বেশি সহজ।
এই সংকট ইউরোপীয় নীতির এক পুরনো দুর্বলতাকেই আবার সামনে এনেছে। অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিন্ন নীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। ফলে প্রতিটি দেশ নিজের মতো করে প্রতিক্রিয়া জানায়, যা সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
মরক্কোর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। স্পেন বলছে, মরক্কো সহযোগিতা করছে। কিন্তু এত বড় সংখ্যায় মানুষের সীমান্ত পেরিয়ে আসা কি শুধুই আকস্মিক? নাকি এর পিছনে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক বার্তা লুকিয়ে আছে? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এই প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিও এই ঘটনায় নীরব নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত মন্তব্য করেছে। তবে এই সব মন্তব্যের মধ্যেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের গন্ধ পাওয়া যায়। অভিবাসন এখন আর শুধু মানবিক বা অর্থনৈতিক ইস্যু নয়, এটি স্পষ্টতই ভূ-রাজনীতির একটি হাতিয়ার।
সব মিলিয়ে, সিউটা সংকট ইউরোপের সামনে এক কঠিন অন্তর্দ্বন্দ্বের ছবি তুলে ধরেছে। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে— ঐক্যের দাবি যত জোরালোই হোক, বাস্তবে তা প্রায়শই ভেঙে পড়ে জাতীয় স্বার্থের চাপে। অভিবাসনের মূল কারণগুলি, যেমন দারিদ্র্য, বৈষম্য, সুযোগের অভাব ইত্যাদি, যদি অমীমাংসিতই থেকে যায়, তবে এমন সংকট বারবার ফিরে আসবে।
শেষ পর্যন্ত, শুধু সীমান্তে কাঁটাতার বাড়িয়ে বা রাজনৈতিক ভাষণ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতি, আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা এবং সর্বোপরি একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। না হলে সিউটার ঢেউ থামলেও, তার প্রতিধ্বনি ইউরোপীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে শোনা যাবে— আর সেই প্রতিধ্বনি সুখকর নাও হতে পারে।




