নোটন কর
১৮৮৬ সাল, ১ মে। আজ থেকে ১৪০ বছর আগে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল আমেরিকার শিকাগো শহর। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক সেদিন ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে। তাই মে দিবসের তাৎপর্য অপরিসীম। সে সময় আমেরিকার বিভিন্ন শ্রমিক ও বামপন্থী দলগুলোর আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল শিকাগো শহর। এ আন্দোলনের প্রধান দাবিটি ছিল খুবই স্পষ্ট— দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার দাবি।
Advertisement
উল্লেখ্য, উনিশ শতকের শুরুর দিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির বিনিময়ে সপ্তাহের ৬ দিনই দৈনিক ১০–১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হতো। কর্মঘণ্টা কমানোর এই আন্দোলন মে মাস জুড়ে ধর্মঘটে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো-সহ বিভিন্ন শহরের কলকারখানা অচল হয়ে পড়ে। মালিকশ্রেণীর স্বার্থে পুলিশ যে কোনও মূল্যে আন্দোলন দমন করতে মরিয়া হয়ে উঠে। ৩ মে ‘ম্যাক কর্মিক রিপার’ কারখানায় ধর্মঘটী শ্রমিকদের এক সভায় পুলিশ বিনা প্ররোচনায় গুলি চালায়। ৬ জন শ্রমিক নিহত হন। তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েন শ্রমিকরা। ৪ মে শিকাগোর হে মার্কেট চত্বরে শ্রমিক–জনতা মিলে প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করে। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও সেখানে কয়েক হাজার মানুষ উপস্থিত হয়। সমাবেশ চলছিল, সর্বশেষ বক্তা যখন বক্তব্য রাখছিলেন সেইসময় পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, অগণিত শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত হয় হে মার্কেট চত্বর।
Advertisement
অসংখ্য আন্দোলনকারী শ্রমিককে কারারুদ্ধ করা হয়। ৮ জন শ্রমিককে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় আদালত। বিচারের পদ্ধতিকে শ্রমিকরা প্রহসনের বিচার বলে উল্লেখ করেন। অ্যালবার্ট পারসন্স, অগাস্ট স্পাইস, অ্যাডলফ ফিশার ও জর্জ অ্যাঙ্গেল নামের ৪ শ্রমিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয় ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর। কিন্তু আন্দোলন থেমে যায়নি। দেশে দেশে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার শ্রমিকের দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের ন্যায্য দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। তিন বছর পর ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত মহামতি এঙ্গেলসের নেতৃত্বে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সম্মেলন শিকাগোর রক্তঝরা শ্রমিকশ্রেণীর অধিকার অর্জনকে স্বীকৃতি দেয় এবং ১ মে দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। আজও এই দিবসটিকে দেশে-দেশে শ্রমজীবী মানুষ শ্রমিক অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে ‘শ্রমিক দিবস’ পালন করেন। পরে রাষ্ট্রসংঘ এই দিবসটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশেও ঘটাও করে ১ মে দিনটিকে ‘শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। সরকারি–বেসরকারি নেতা–নেত্রীরা, এমনকি শিল্পপতিরা সেদিন বড় বড় ভাষণ দেন শ্রমিক অধিকারের পক্ষে, পত্রপত্রিকার পৃষ্ঠাগুলো ভরে উঠে শ্রমজীবী মানুষের ছবিতে, বিভিন্ন সভা–মিটিং চলে দিনব্যাপী, কোনও কিছুরই খামতি থাকে না। আমাদের দেশের অনেক বড় বড় ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এদিন বক্তৃতা করেন। কিন্তু তাদের বক্তব্যে মালিকের শ্রম শোষণের কথাটি আড়াল থেকে যায়।
শ্রমিক অধিকারের যে ইতিহাস ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি আর মর্যাদার লড়াইয়ে লেখা হয়েছিল, আজ তা ‘নিউ ইন্ডিয়া’-র কর্পোরেট হোর্ডিংয়ের নিচে চাপা পড়ে গেছে। কেন্দ্রে এক ফ্যাসিবাদী ধরনের সরকার আসার পর আমাদের দেশে শ্রমিকশ্রেণি-সহ সাধারণ মানুষের অবস্থা ভয়াবহ হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার কর্পোরেট স্বার্থে নতুন শ্রমআইন ‘শ্রমকোড’ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন বিধিমালায় সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’ নীতিকে কার্যত আইনি বৈধতা দান। আগে ১০০ জনের বেশি শ্রমিকের কারখানায় ছাঁটাই বা লে-অফের জন্য সরকারি অনুমতি লাগত, এখন সেই সীমা বাড়িয়ে ৩০০ করা হয়েছে। অর্থাৎ, কলকাতা বা শহরতলি-সহ দেশের ছোট-মাঝারি ইউনিটের ২৯৯ জন শ্রমিক এখন মালিকের মর্জির ওপর নির্ভরশীল— যাঁদের অনিশ্চিত জীবনে আজ কাজ থাকলেও, কাল নেই।
শ্রমিক বিরোধী এই আইন শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন, ধর্মঘট করার অধিকার-সহ সামাজিক সুরক্ষা, ন্যূনতম মজুরি, স্থায়ী চাকরি কেড়ে নিয়েছে। শ্রমকোডে শ্রমিকদের কাজের সময় ঘুরিয়ে ১২ ঘন্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে অস্থায়ী ও ঠিকাভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। এটা এক ধরণের মজুরি হ্রাসের প্রক্রিয়া। দেশের ৯০ শতাংশই এখন অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত। দেশের বিপুল শ্রমিক কর্মচারীদের অধিকাংশেরই কোনও কর্মনিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নেই। নীতি আয়োগের তথ্যমতে, ২০২৯-৩০ সালের মধ্যে ভারতে ‘গিগ ওয়ার্কার’-এর সংখ্যা ২.৩৫ কোটিতে পৌঁছাবে। কলকাতা-সহ বড় শহরগুলোতে ডেলিভারি অ্যাপ বা রাইড-শেয়ারিংয়ের হাজার হাজার যুবক প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টা রাস্তায় কাটান, অথচ তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা নেই। ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট ২০২৪ বলছে, মাত্র ৯.৪ শতাংশ শ্রমিকের ভাগ্যে জোটে নিয়মিত ফর্মাল চাকরি, বাকিদের জীবন কাটে ‘অ্যালগরিদমের’ অদৃশ্য চাবুক কিংবা কন্ট্রাক্ট লেবারের জাঁতাকলে।
আজকের ভারতে শ্রমিক মানে কেবল কারখানার নীল-পোশাকি মানুষ নন, আপনার-আমার ঘরের শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোনেরাও এই অনিশ্চিত শ্রমজগতের অংশ। আইটি সেক্টরের লে-অফ আতঙ্ক, চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকতা কিংবা বেসরকারি অফিসের নিরাপত্তা রক্ষীর কাজ এখনকার কঠোর বাস্তবতা। ‘স্টেট অফ ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ রিপোর্ট জানাচ্ছে, ২৫ বছর বয়সী গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার আজ প্রায় ৪০ শতাংশ। ফলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে হাজার হাজার যুবক আজ অ্যালগরিদমের খেয়ালে ‘গিগ ওয়ার্কার’ হিসেবে রাস্তায় ঘুরছেন। দেশে কোটি কোটি শ্রমিকের হাহাকার আজ আর কোনও বিচ্ছিন্ন কাহিনি নয়, এ এক সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিধ্বনি।
এই ক্রান্তিকালে মে দিবস পালন কেবল শিকাগোর শহিদ স্মরণে লাল পতাকার আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ নয়, বরং নাগরিকত্বের সংজ্ঞা পুনরুদ্ধারের লড়াই, শ্রমিকশ্রেণির অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই। শ্রমিকের অধিকার সংকুচিত হলে আদতে গণতন্ত্রের পরিসরই ছোট হয়ে আসে। তাই, আজ দেশজুড়ে শ্রমিকশ্রেণি তথা মেহনতি জনগণের ওপর যে আগ্রাসন ও শোষণ চলছে, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তীব্র লড়াই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে রুখে দিতে হবে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন ও শোষণ। নয়ডা সহ উত্তর ভারতের শ্রমিক আন্দোলন আমাদের পথ দেখাচ্ছে। ঐতিহাসিক মে দিবসে এটাই হোক শ্রমজীবি জনতার শপথ।
Advertisement



