নর্মদায় ক্রুজ উল্টে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ গিয়েছে ৯ জনের। দুর্ঘটনার ঠিক আগের একাধিক ভিডিও সামনে আসার পর স্পষ্ট হয়েছে যে কোনরকম নিরাপত্তা বিধিই সেখানে মানা হয়নি। প্রতিকূল আবহাওয়ায়, কমলা সতর্কতা থাকা সত্ত্বেও পর্যটকদের নিয়ে রওনা হয়েছিল ক্রুজটি। প্রবল হাওয়ায় এবং জলের স্রোতের টানে টালমাটাল পরিস্থিতি ছিল বোটটির।
প্রশ্ন উঠেছে, কেন প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে সেটি রওনা হয় ? কেন যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট ছাড়া যাত্রা করতে দেওয়া হয়েছিল ? এই দুর্ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কেন্দ্রীয় ত্রাণ তহবিল থেকে মৃতদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য এবং আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়েছে। মৃতদের পরিবার পিছু ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে এককালীন সাহায্যের কথা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
Advertisement
মধ্যপ্রদেশের জবলপুরে নর্মদা নদীর বার্গি ড্যামে পর্যটকবোঝাই একটি ক্রুজ উল্টে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে বৃহস্পতিবার। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে হাসি-আড্ডা ও ছবি তোলার উচ্ছ্বাস চলছিল, মুহূর্তের মধ্যেই সেই দৃশ্য বদলে যায় আতঙ্ক, চিৎকার ও প্রাণ বাঁচানোর লড়াইয়ে।ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, ক্রুজের ভেতরে জল ঢুকে থই থই করছে।
Advertisement
একদিকে প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়ছে ক্রুজের গায়ে, অন্যদিকে আতঙ্কে চিৎকার করছেন যাত্রীরা। মহিলাদের লাইফজ্যাকেট পরে বসে থাকতে দেখা গেলেও অনেক যাত্রীর গায়েই তা ছিল না। অভিযোগ উঠেছে প্রাণ বাঁচাতে পর্যাপ্ত লাইফজ্যাকেটও মেলেনি। কিছু ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, শেষ মুহূর্তে ক্রু সদস্যরা সিটের নিচ থেকে লাইফজ্যাকেট বের করে যাত্রীদের দিচ্ছেন, তখন ভিতরে জল ঢুকতে শুরু করেছে।
অন্য একটি ভিডিওতে দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগের দৃশ্য ধরা পড়েছে। সেখানে পর্যটকরা হাসি-আড্ডায় মশগুল। কেউ আবার নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন। কিন্তু ঝোড়ো হাওয়ার দাপট এবং উত্তাল ঢেউয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
সরকারি ও প্রশাসনিক সূত্রে খবর, ওই ক্রুজে প্রায় ৪০ জন যাত্রী ছিলেন, যদিও টিকিট নথিভুক্ত ছিল মাত্র ২৯ জনের। ফলে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, ইনল্যান্ড ভেসেলস্ অ্যাক্ট, ২০২১ অনুযায়ী যাত্রার আগে প্রতিটি যাত্রীকে লাইফজ্যাকেট পরানো বাধ্যতামূলক হলেও তা মানা হয়নি।
ঘটনার সময় আবহাওয়া দপ্তরের তরফে ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ের সতর্কতাবার্তা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও ক্রুজ চলাচল বন্ধ করা হয়নি। যাত্রীদের অনুরোধ উপেক্ষা করারও অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বোট ঘুরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করা হলেও তা শোনা হয়নি।দুর্ঘটনার পরপরই শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। উদ্ধার অভিযান শুরু হতেও দেরি হয় বলে অভিযোগ। বৃহস্পতিবার সন্ধে ৬টা ১৫ নাগাদ দুর্ঘটনাটি ঘটে। কিন্তু, সন্ধে ৬টা ৪০ পর্যন্ত কোনও উদ্ধারকারী দলের বোট যাত্রা শুরুই করেনি বলে অভিযোগ।
এমনকী, উদ্ধারকাজের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও হাতের কাছে মজুত ছিল না। সব জোগাড়ের পর উদ্ধারকারী দল সন্ধে ৭টা নাগাদ উদ্ধারের জন্য বোট নিয়ে রওনা দেয়। অভিযোগ, উদ্ধারকারী দল যদি আরও তৎপর হতো, তবে এতজনের মৃত্যু হয়তো হতো না। উদ্ধারকাজে এনডিআরএফ, এসডিআরএফ এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে উদ্ধারকাজ চালায়। অন্ততপক্ষে ৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। ২৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। শেষে পাওয়া তথ্যানুযায়ী ৪ জন এখনও নিখোঁজ।
ঘটনার পর মধ্যপ্রদেশ সরকার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রাথমিক তদন্তে ক্রুজের পাইলট, হেলপার এবং টিকিট কাউন্টার ইনচার্জকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি বার্গি ক্লাবের এক ম্যানেজারকেও সাসপেন্ড করা হয়েছে। পর্যটন বিভাগ রাজ্যে আপাতত সব ক্রুজ পরিষেবা স্থগিত রেখেছে।ইতিমধ্যেই, বরগী বাঁধের ঘটনায় একাধিক জনকে বরখাস্ত করেছে মধ্যপ্রদেশের প্রশাসন।
Advertisement



