যুদ্ধের জন্যে যদি টাকার যোগাড় হয় তাহলে পরিবেশ দূষণ আর জলবায়ু পরিবর্তনের কুফল থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে টাকার অভাব হবে কেন? এই প্রশ্নটাই সামনে আসছে টার্কির আন্তালিয়ায় আগামী ৯ নভেম্বর থেকে শুরু হতে চলা রাষ্ট্রসঙ্ঘের আসন্ন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন বা কপ-৩১ কে ঘিরে। যদিও এবারের কপ সম্মেলনকে অতীতে গৃহীত নীতি, সিদ্ধান্ত সব কাজে রুপান্তরিত করার সম্মেলন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাহলেও ঘুরে ফিরে সেই প্রধান সমস্যা দাঁড়াচ্ছে কিন্তু অর্থের।
উন্নতিশীল দেশগুলো তাদের অনিয়ন্ত্রিত শিল্পোন্নয়নের জন্য দীর্ঘদিন ধরে যে ব্যাপক পরিবেশ দূষণ করেছে তার কুফল ভোগ করতে হচ্ছে উন্নতিশীল দেশগুলোকে। অথচ তাদের হাতে এই ব্যাপারে খরচ করার যথেষ্ট অর্থ নেই। যদিও প্যারিস সম্মেলনে দশ বছর আগে চুক্তি সই করে উন্নতিশীল দেশগুলো টাকা দেবার যে অঙ্গীকার করেছিল, তার থেকে তারা ক্রমেই নানা ছলে সরে আসছে। প্রতিটি কপ সম্মেলনেই এখন তাই টাকা চেয়ে লড়াই করে উন্নতিশীল, ছোট দ্বীপরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলো। সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও এই অর্থ যোগানের এ্কটা প্রক্রিয়া করার কথা এবং বেসরকারি অর্থের যোগানের কথাও বাকুতে অনুষ্ঠিত কপ-২৯ এ সিদ্ধান্ত হলেও, এবারের কপ-৩১ এ সেইসব ব্যবস্থাকে চুড়ান্ত করে অর্থের যোগান এবং তার ব্যবহারের রূপরেখা তৈরি করে কাজে নামাটা যে একান্ত প্রয়োজন তা সারা বিশ্বের বিশেষত উন্নতিশীল দেশগুলোর পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বার বার বলছেন।
এবারের কপ-৩১ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল, তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে নেতৃত্বের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে এটি একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা এবং এর আগে এত কপ সম্মেলন হয়েছে, কিন্তু এরকম নেতৃত্ব ভাগ করে নেবার ঘটনা কখনও ঘটে নি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ-৩০ বৈঠকে এই দুই দেশের মধ্যে সম্মতির ভিত্তিতে এই সমঝোতা হয়। কারণ দুই দেশই পরবর্তী কপ সম্মেলন করার দাবিদার ছিল। তুরস্ক সম্মেলনের আয়োজক দেশ ও আনুষ্ঠানিক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া নেতৃত্ব দেবে আন্তঃরাষ্ট্রীয় জলবায়ু আলোচনার প্রক্রিয়ায়। সেইসঙ্গে ক্লাইমেট একশন এজেন্ডা পরিচালনা করবে। তুরস্কের মনোনীত সভাপতি মুরাত কুরুম সম্মেলনের সামগ্রিক নেতৃত্ব দেবেন। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু ও জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস বোয়েন বিভিন্ন দেশের মধ্যে নানান বিষয় যেসব আলোচনা হবে সেই আলোচনা সভার সভাপতি হিসেবে সভা পরিচালনা করবেন। বিভিন্ন দেশের মধ্যে এর আগের কপ সম্মেলনগুলতে যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে সেগুলোকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পরামর্শ করা, আলোচনার খসড়া তৈরি এবং সমঝোতার পথ খোঁজা তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
এই ব্যবস্থার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলির স্বার্থকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতায় ফিজিতে প্রাক্-সম্মেলন এবং টুভালুতে নেতৃবৃন্দের বৈঠকের মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদের মুখে থাকা দেশগুলির অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে দুই দেশের নেতৃত্ব মানে এটি দুটি পৃথক কপ সম্মেলন কোনভাবেই নয়। উভয় দেশকে পরস্পরের সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করতে হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ঐকমত্যে আনার চেষ্টা করতে হবে। এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করবে নেতৃত্বের এই বিভাজন কতটা কার্যকর সহযোগিতায় রূপান্তরিত হয় তার ওপর।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে এখন জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানোর প্রচেষ্টা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী কপ-৩১ জলবায়ু সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হল ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট চূড়ান্ত শক্তি ব্যবহারের ৩৫ শতাংশ বিদ্যুতের মাধ্যমে মেটানোর লক্ষ্য। ‘৩৫-বাই-৩৫’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগের ঘোষণা ২০২৬ সালের ৯ জুন তুরস্কের পক্ষ থেকে করা হয়। কপ-৩১ এর জলবায়ু কর্মসূচির অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হিসেবে এটি অস্ট্রেলিয়া ও আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থাগুলির সহযোগিতায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা।
এই লক্ষ্যের তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এর অর্থ এই নয় যে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের মাত্র ৩৫ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ পাবেন। আবার এর অর্থও নয় যে বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩৫ শতাংশ পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি থেকে আসতে হবে। লক্ষ্যটি আসলে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো—অর্থাৎ পরিবহণ, শিল্প, কৃষি ও গৃহস্থালির মতো ক্ষেত্রে সরাসরি কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর পরিবর্তে যতটা সম্ভব বিদ্যুৎ ব্যবহার করা।
বর্তমানে বিশ্বের মোট চূড়ান্ত শক্তি ব্যবহারের মাত্র এক-পঞ্চমাংশের কিছু বেশি বিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণ হয়। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বা আইইএ-র ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই অংশ প্রায় ২৩ শতাংশ। কপ-৩১ এর প্রস্তাবিত লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে তা বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করতে হবে।
এর অর্থ হল, আগামী এক দশকে বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। তবে শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ালেই জলবায়ু সমস্যার সমাধান হবে না। সেই বিদ্যুৎ যদি কয়লা বা গ্যাস পুড়িয়ে উৎপাদিত হয়, তাহলে নির্গমন কমানোর সুফল সীমিত থাকবে। তাই বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং অন্যান্য কম-কার্বন শক্তির উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। পরিবহণ ক্ষেত্রে পেট্রল ও ডিজেলচালিত গাড়ির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক গাড়ি, বাস ও দুই চাকার যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। রেল পরিবহণের বিদ্যুতায়নও গুরুত্বপূর্ণ।
আইইএ-র ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমানে উপলব্ধ প্রযুক্তি এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির আগের দামের ভিত্তিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের চূড়ান্ত শক্তি ব্যবহারের প্রায় ৩৩ শতাংশ বিদ্যুতের মাধ্যমে মেটানো অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব হতে পারে। ফলে ৩৫ শতাংশের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রযুক্তি, পরিকাঠামো এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন।
উন্নত দেশগুলির আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলির পক্ষে এই পরিবর্তন দ্রুত ঘটানো কঠিন। তাই কপ-৩১ এ জলবায়ু অর্থায়ন, সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির বিশেষ পরিস্থিতিকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু অর্থায়ন, ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি উত্তরণ, অভিযোজন এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলিকে সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি অর্জনই হবে কপ-৩১ এর প্রকৃত পরীক্ষা।




