অদিতি কর্মকার
আরাবল্লী পর্বতমালা পৃথিবীর প্রাচীনতম পর্বতশ্রেণিগুলোর একটি। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, এর বয়স প্রায় ৩৫০ কোটি বছর। গুজরাটের পালানপুর থেকে রাজস্থান অতিক্রম করে হরিয়ানা ও দিল্লি পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পর্বতমালা কেবল ভূপ্রাকৃতিক বিস্ময় নয়, বরং উত্তর ও পশ্চিম ভারতের পরিবেশগত ভারসাম্যের এক অপরিহার্য স্তম্ভ। মরুভূমির অগ্রগতি রোধ, বর্ষার জল সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ জলস্তর বজায় রাখা এবং দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলের জন্য প্রাকৃতিক বায়ুপ্রাচীর হিসেবে কাজ করা—এই সবকিছুই যুগের পর যুগ আরাবল্লীর অবদান। অথচ আজ এই প্রাচীন পাহাড় এক গভীর সংকটের মুখোমুখি।
Advertisement
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে আরাবল্লীর ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ খননের মাধ্যমে। রাজস্থান ও হরিয়ানার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পাথর, চুনাপাথর, মার্বেল ও বালির জন্য পাহাড় কেটে নেওয়া হচ্ছে নির্বিচারে। সরকারি নথিতে বহু খনিকে বন্ধ দেখানো হলেও বাস্তবে রাতের অন্ধকারে বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পাহাড়ের বুক। ভারী যন্ত্রপাতির চাপে ভেঙে পড়ছে শিলাস্তর, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের স্বাভাবিক রূপ। বহু স্থানে আরাবল্লীর উচ্চতা কমে গেছে, আবার কোথাও পুরো পাহাড়টাই প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে সমতলে পরিণত হয়েছে।
Advertisement
এই খনন শুধু পাহাড়ের কাঠামো ধ্বংস করছে না, তার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ছে প্রাকৃতিক জলাধার ব্যবস্থাও। পাহাড়ের ফাটল ও শিলাস্তরের মধ্যে যুগের পর যুগ ধরে জমে থাকা জল খননের ফলে বেরিয়ে যাচ্ছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আশপাশের গ্রাম ও শহরের ওপর। কুয়ো ও নলকূপ শুকিয়ে যাচ্ছে, জল সংগ্রহের জন্য মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আরাবল্লী ধ্বংসের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে উত্তর ভারতের জলসংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
দ্রুত নগরায়ণ আরাবল্লীর সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। দিল্লি-এনসিআর, গুরগাঁও, ফরিদাবাদ ও আলওয়ারের মতো শহরগুলির ক্রমবর্ধমান বিস্তার পাহাড় ও বনভূমির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বহুতল আবাসন, শিল্পাঞ্চল, পর্যটন প্রকল্প ও এক্সপ্রেসওয়ের নামে আরাবল্লীর বনাঞ্চল উজাড় করা হচ্ছে। বহু ক্ষেত্রে পাহাড়ি জমিকে ‘অব্যবহৃত’ বা ‘অনাবাদি’ বলে চিহ্নিত করে নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক সবুজ আচ্ছাদন দ্রুত কমে যাচ্ছে।
এই বনাঞ্চল ছিল শুষ্ক পর্ণমোচী প্রকৃতির হলেও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। নীলগাই, চিতল, শেয়াল, বনবিড়ালসহ নানা বন্যপ্রাণী এবং অসংখ্য পাখি ও সরীসৃপের আবাস ছিল এই অঞ্চল। বন উজাড়ের ফলে প্রাণীদের চলাচলের পথ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, খাদ্যচক্রে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বহু প্রাণী বাধ্য হয়ে জনবসতিতে ঢুকে পড়ছে, যার ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাতও বাড়ছে।
আরাবল্লীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো থার মরুভূমির পূর্বদিকে অগ্রগতি রোধ করা। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এই পর্বতমালা আরও দুর্বল হলে মরুভূমি দ্রুত পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়বে। ইতিমধ্যেই রাজস্থানের বহু অঞ্চলে মরুকরণের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাটির উর্বরতা কমছে, কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে, কৃষিজ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর, বাড়ছে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকট।
বৃষ্টিপাতের ওপরও আরাবল্লীর অবক্ষয়ের প্রভাব পড়ছে। বন ও পাহাড় বর্ষার জল ধরে রেখে ধীরে ধীরে তা ভূগর্ভে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় বৃষ্টির জল দ্রুত বয়ে যাচ্ছে, নদী ও ঝরনাগুলি শুকিয়ে যাচ্ছে। দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর ইতিমধ্যেই বিপজ্জনকভাবে নেমে গেছে। বহু এলাকায় ৩০০ ফুটের নিচে জল পাওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আরাবল্লী ধ্বংসের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে দিল্লি-এনসিআরের জলসংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বায়ুদূষণ রোধেও আরাবল্লীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিম দিকের মরু অঞ্চল থেকে ধুলোঝড় ও গরম হাওয়া আটকাতে এই পর্বতমালা প্রাকৃতিক প্রাচীরের কাজ করত। পাহাড় ও বন ধ্বংস হওয়ায় সেই বাধা আজ অনেকটাই দুর্বল। এর ফলস্বরূপ দিল্লি ও আশপাশের এলাকায় ধুলিকণা ও দূষণের মাত্রা বেড়েছে। শীতকালে স্মগের সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে, বাড়ছে শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসজনিত রোগ।
আরাবল্লী সংরক্ষণের জন্য আইন ও আদালতের নির্দেশ নতুন নয়। সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার এই পর্বতমালাকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বন সংরক্ষণ আইন থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দুর্বল। প্রশাসনিক শৈথিল্য, নজরদারির অভাব এবং প্রভাবশালী মহলের চাপের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক ক্ষেত্রে জরিমানা বা কাগজে-কলমে অনুমতির মাধ্যমে পরিবেশ ধ্বংসের কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন আরাবল্লী অঞ্চলের স্থানীয় মানুষ। পাহাড় ও বননির্ভর জীবনযাপন তাঁদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জ্বালানি কাঠ, পশুচারণ, ক্ষুদ্র কৃষি ও প্রাকৃতিক জলাধারের ওপর নির্ভর করেই তাঁদের দৈনন্দিন জীবন চলে। পাহাড় ধ্বংস হওয়ায় জল ও চারণভূমির অভাব দেখা দিচ্ছে, বিপন্ন হচ্ছে জীবিকা। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে অন্যত্র পাড়ি দিতে শুরু করেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, এখনও সময় আছে আরাবল্লীকে বাঁচানোর। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। অবৈধ খনন ও নির্মাণ বন্ধ না হলে, বনায়ন ও জলসংরক্ষণ প্রকল্প কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হলে এই প্রাচীন পর্বতমালাকে আর রক্ষা করা যাবে না। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আরাবল্লী শুধু একটি পাহাড়শ্রেণি নয়, এটি উত্তর ভারতের পরিবেশগত মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ড ভেঙে পড়লে তার প্রভাব বহুগুণে পড়বে জল, বায়ু, কৃষি ও জনজীবনের ওপর। প্রশ্ন তাই শুধু প্রকৃতি সংরক্ষণের নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার। উন্নয়নের নামে যদি এই প্রাচীন পাহাড়কে আমরা হারিয়ে ফেলি, তবে তার মূল্য চুকাতে হবে আগামী দিনের সমাজকেই।
Advertisement



