• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 4 September, 2026

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পিপাসায় শুকিয়ে যাচ্ছে ধরণী

সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। এআই মডেলকেও আরও দক্ষ করে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে জলসংকটপূর্ণ অঞ্চলে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের আগে স্থানীয় জলসম্পদের বহনক্ষমতা বিচার করা জরুরি। কারণ প্রশ্নটি কেবল প্রযুক্তির নয়। প্রশ্নটি আমাদের সভ্যতার অগ্রাধিকারের।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পিপাসায় শুকিয়ে যাচ্ছে ধরণী

প্রতীকী চিত্র

একদিন নদীর তীরবর্তী স্থানে সভ্যতার প্রথম বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল। মানুষ জানত, জলই জীবন। তাই নদী, পুকুর, কুয়ো, সরোবর, বাঁধ কিংবা সিঁড়িঘাটগুলিকে ঘিরে ধীরে-ধীরে গড়ে উঠেছিল মানুষের সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্কের এক বিস্তৃত জগৎ। জলের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিল গভীর প্রয়োজনের; তারসঙ্গে মিশেছিল শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার। মানুষ জল সঞ্চয় করতে শিখেছে। বিপুল জনসংখ্যার তৃষ্ণা নিবারণ ও অন্যান্য ব্যবহারের জন্য জলকে ভাগ করে নিতে শিখেছে। আবার অনেক সময় জলকে ঘিরে সংঘাতের মুখোমুখি হয়েছে। কালের প্রবাহে জলকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য উৎসব, আচার ও লোকসংস্কৃতি। অর্থাৎ জল মানুষের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের নীরব সঙ্গী। তার হাত ধরেই একসময় গড়ে উঠেছিল বসতি, কৃষি, জীবিকা ও সংস্কৃতির পথ; মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে উৎসব ও সামাজিক সম্পর্ক— সবকিছুর গভীরে মিশে আছে জলের স্নিগ্ধ উপস্থিতি।

সময়ের স্রোত বহুদূর এগিয়েছে। সেই মানুষ আজ এমন এক প্রযুক্তির যুগে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ভাষা বুঝতে পারছে, প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, ছবি ও লেখা সৃষ্টি করছে, বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করছে, এমনকি জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও সহায়তা করছে। মানুষের মেধার এক নতুন দিগন্ত যেন খুলে গেছে। কিন্তু এই বিস্ময়কর অগ্রগতির দীপ্তির আড়ালে ধীরে-ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক গভীর অস্বস্তি— বুদ্ধিমান যন্ত্র নির্মাণের এই যাত্রায় প্রকৃতির কাছ থেকে আমরা আসলে কতটা মূল্য আদায় করে নিচ্ছি? মানুষের কৃত্রিম বুদ্ধির বিকাশ যদি পৃথিবীর স্বাভাবিক জলভাণ্ডারের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করে, তবে সেই অগ্রগতির প্রকৃত মূল্য কোথায় গিয়ে জমা হচ্ছে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৃশ্যমান মুখটি আমাদের মোবাইলের পর্দায় কিন্তু তার আসল পরিকাঠামো রয়েছে বিশাল তথ্যকেন্দ্রে। সেখানে হাজার হাজার শক্তিশালী সার্ভার দিনরাত কাজ করে চলেছে। প্রতিটি সার্ভারের কর্মক্ষমতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে বিপুল বিদ্যুৎ-চাহিদা। সার্ভার যত বেশি কাজ করে, তার যন্ত্রাংশ তত বেশি উত্তপ্ত হয়। সেই তাপ সামলাতে প্রয়োজন হয় শক্তিশালী শীতলীকরণ ব্যবস্থার এবং তার জন্যও খরচ হয় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ এবং শীতলীকরণ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জল। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিটি উত্তর ও প্রতিটি গণনার পেছনে থাকে বিদ্যুতের এক অদৃশ্য হিসাব।

ফলে আমরা যখন এআই-এর কাছে একটি প্রশ্ন রাখি, তখন তার উত্তর তৈরির পেছনে অদৃশ্যভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে এক বিশাল যন্ত্রসভ্যতা। তার জন্য দরকার বিদ্যুৎ, জল, জমি এবং বিপুল পরিমাণ পরিকাঠামো। ভারতও এই পরিবর্তনের বাইরে নেই। দেশ দ্রুত এআই-নির্ভর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। ভারত সরকারের ইন্ডিয়া এআই মিশনের অধীনে দেশের নিজস্ব কম্পিউটিং পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলছে। হাজার-হাজার জিপিইউ-সমৃদ্ধ কম্পিউটিং ক্ষমতা গবেষক ও সংস্থাগুলির জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। দেশীয় ভিত্তিমূলক এআই মডেল তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য কেবল বিদেশি প্রযুক্তির ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। ভারতের বহুভাষিক সমাজ, প্রশাসনিক কাঠামো, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার নিজস্ব চাহিদাকে সামনে রেখে এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গড়ে তুলতে হবে, যার প্রযুক্তি ও প্রয়োগ ভারতীয় বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানুষের ভাষা, জীবনযাত্রা ও সামাজিক বৈচিত্র্যকে বুঝে যে প্রযুক্তি দেশের নিজস্ব সমস্যা সমাধানে কাজে লাগবে, সেই আত্মনির্ভর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই হতে পারে ভারতের ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। এটি নিঃসন্দেহে বড় অগ্রগতি। ভারতের হাতে রয়েছে বিপুল সংখ্যক প্রযুক্তিবিদ, বিশাল ডিজিটাল বাজার এবং বহু ভাষায় সমৃদ্ধ একটি সমাজ। কিন্তু এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একটি দায়িত্বও এসে পড়ছে। এআই যত বাড়বে, তথ্যকেন্দ্রের প্রয়োজন তত বাড়বে এবং তথ্যকেন্দ্র মানেই শুধু সার্ভার নয়—তার সঙ্গে যুক্ত জল, বিদ্যুৎ, শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং জমি।

সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় যখন এই জলচাহিদার সঙ্গে পৃথিবীর বর্তমান জলসংকটকে পাশাপাশি রাখা হয়। বিশ্বের বহু অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নেমে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টির স্বাভাবিক ছন্দের বদল ঘটছে। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘ খরা। ভারতের বহু শহরে গ্রীষ্ম এলেই পানীয় জলের জন্য মানুষকে ট্যাঙ্কারের অপেক্ষায় থাকতে হয়। গ্রামে শুকিয়ে যাচ্ছে পুকুর, ক্ষীণ হচ্ছে কুয়োর জল, কৃষকের সেচের খরচ বাড়ছে। এমন সময়ে বিশাল তথ্যকেন্দ্রের জন্য বিপুল জল ব্যবহার ভবিষ্যতের একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনে দেয়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির তথ্যকেন্দ্রে বিপুল জল ব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছে। কোথাও একটি বড় তথ্যকেন্দ্র বছরে কোটি-কোটি গ্যালন জল ব্যবহার করছে। কোথাও একটি সংস্থার সামগ্রিক জলব্যবহার কয়েক বিলিয়ন লিটারে পৌঁছেছে। প্রযুক্তির পরিধি যত বাড়ছে, এআই-এর ব্যবহার যত সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠছে, ততই বাড়ছে এই পরিকাঠামোর চাহিদা। আজ যে জলব্যবহার তুলনামূলকভাবে দূরের কোনও শিল্পের সমস্যা বলে মনে হচ্ছে, আগামী দিনে তা বহু অঞ্চলের পরিবেশ ও জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারে।

অবশ্য এআই-এর প্রতিটি প্রশ্নের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জল খরচ হয়— এমন সরল হিসাব সর্বত্র প্রযোজ্য নয়। তথ্যকেন্দ্রের অবস্থান, আবহাওয়া, ব্যবহৃত শীতলীকরণ প্রযুক্তি, সার্ভারের দক্ষতা, বিদ্যুতের উৎস এবং কাজের চাপের উপর জল ও শক্তির ব্যবহার নির্ভর করে। ফলে কোনও একটি সংখ্যাকে সর্বজনীন সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু বৃহত্তর বাস্তবতাটি অস্বীকার করার উপায়ও নেই— এআই-এর বিস্তারের সঙ্গে তার পরিবেশগত পদচিহ্নও বাড়ছে।

জলের পাশাপাশি রয়েছে বিদ্যুতের প্রশ্ন। এআই-এর শক্তিশালী মডেল প্রশিক্ষণ এবং পরিচালনার জন্য বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা দরকার। সেই ক্ষমতার জন্য প্রয়োজন বিপুল বিদ্যুৎ। বিদ্যুতের উৎস যদি জীবাশ্ম জ্বালানি হয়, তাহলে প্রযুক্তির এই প্রসারের সঙ্গে কার্বন নিঃসরণও যুক্ত হয়। অর্থাৎ যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জলবায়ু পরিবর্তনের তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস উন্নত করতে পারে, কৃষিতে জলের অপচয় কমানোর উপায় খুঁজে দিতে পারে, তার নিজের পরিকাঠামোকেও পরিবেশের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
এখানেই উন্নয়নের প্রচলিত ধারণাটিকে একটু থামিয়ে দেখা দরকার। উন্নয়ন মানে আরও বড় সার্ভার, আরও দ্রুত প্রসেসর, আরও শক্তিশালী অ্যালগরিদম— এতটুকুতে হিসাব শেষ হতে পারে না। উন্নয়নের সঙ্গে প্রশ্ন জুড়তে হবে, তার পরিবেশগত মূল্য কত? একটি প্রযুক্তি কতটা জল ব্যবহার করছে? কতটা বিদ্যুৎ নিচ্ছে? সেই বিদ্যুতের উৎস কী? স্থানীয় মানুষের জীবন ও পরিবেশের উপর তার প্রভাব কতটা?

ভারতের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও জরুরি। কারণ আমরা একই সঙ্গে জলসংকটের দেশ এবং দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতিতে প্রবেশ করা দেশ। যে দেশে একদিকে এআই-এর জন্য উন্নত কম্পিউটিং পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বহু অঞ্চলে মানুষ এখনও পানীয় জলের নিশ্চয়তা থেকে দূরে, সেখানে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও জলনিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়।

সমাধানের পথ অবশ্য আছে। তথ্যকেন্দ্রে জলের পুনর্ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। কম জলনির্ভর শীতলীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। শক্তি দক্ষতা বাড়িয়ে একই কাজ কম বিদ্যুতে করার চেষ্টা করা যায়। সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। এআই মডেলকেও আরও দক্ষ করে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে জলসংকটপূর্ণ অঞ্চলে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের আগে স্থানীয় জলসম্পদের বহনক্ষমতা বিচার করা জরুরি। কারণ প্রশ্নটি কেবল প্রযুক্তির নয়। প্রশ্নটি আমাদের সভ্যতার অগ্রাধিকারের।