• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 19 August, 2026

অ্যালগরিদমের যুগে সাহিত্যের সংকট

আজকের ডিজিটাল যুগে সাহিত্যের মূল্য শুধু লেখকের লেখা, সমালোচকের মতামত বা পাঠকের ভালো লাগার ওপর নির্ভর করছে না

অ্যালগরিদমের যুগে সাহিত্যের সংকট

pic- AI

আজকের ডিজিটাল যুগে সাহিত্যের মূল্য শুধু লেখকের লেখা, সমালোচকের মতামত বা পাঠকের ভালো লাগার ওপর নির্ভর করছে না। এর মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে আর-একটি শক্তিশালী বিষয়— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম। এই অ্যালগরিদমের প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে যত বেশি সময় সম্ভব স্ক্রিনের সামনে ধরে রাখা। আর তাই এমন বিষয়ই বেশি সামনে আসে, যা খুব দ্রুত মানুষের মনোযোগ কেড়ে নিতে পারে।
এই জায়গায় বুকফ্লুয়েন্সার বা বই-প্রভাবকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনও বই নিয়ে ১৫–৩০ সেকেন্ডের রিল, শর্টস বা ছোট ভিডিও তৈরি করে তাঁরা খুব সহজেই অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারেন। কিন্তু সমস্যা হলো, সাহিত্য সব সময় এত দ্রুত বোঝা যায় না। কিছু বই ধীরে পড়তে হয়, ভাবতে হয়, আবার পড়তে হয়। কোনও কোনও লেখার অর্থ বুঝতে সময় লাগে। জটিল চরিত্র, গভীর চিন্তা কিংবা বহুস্তরীয় বক্তব্য কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতে তুলে ধরা সম্ভব নয়।
ফলে ধীরে ধীরে এমন এক ধরনের সাহিত্য জনপ্রিয় হচ্ছে, যা খুব সহজে পড়া যায় এবং দ্রুত ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। বইয়ের সাহিত্যিক গুণের পাশাপাশি এখন তার প্রচ্ছদ কেমন, ছবিতে দেখতে কেমন লাগে, কফির কাপের পাশে বইটি কতটা সুন্দর দেখাচ্ছে, কিংবা বই থেকে ছোট ছোট আকর্ষণীয় বাক্য তুলে ধরা যায় কি না— এসবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থাৎ বই শুধু পড়ার বিষয় নয়, অনেক সময় সেটি একটি লাইফস্টাইল পণ্য হিসেবেও উপস্থাপিত হচ্ছে।
এর ফলে পাঠকের রুচিতেও পরিবর্তন আসছে। যে বই সহজে বোঝা যায় না, যে বই পাঠককে প্রশ্ন করে, অস্বস্তিতে ফেলে বা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, সেই বইকে অনেক সময় ‘কঠিন’, ‘নীরস’ বা ‘বিরক্তিকর’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সহজে প্রচার করা যায় এবং বেশি মানুষের নজর কাড়ে— এমন বই বারবার সামনে আসছে।
এখানেই সমস্যাটা তৈরি হচ্ছে। পাঠক নিজের পছন্দে বই খুঁজে নেওয়ার বদলে ধীরে ধীরে অন্যের দেখানো পথ অনুসরণ করতে শুরু করছেন। কোন বই পড়বেন, কোন লেখক ভালো, কোন বই অবশ্যই পড়তে হবে— এসব সিদ্ধান্ত অনেক সময় নিজের বিচারবোধের বদলে সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয়তা
নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
অথচ বই পড়ার আনন্দের একটা বড় অংশ হলো নিজে খুঁজে পাওয়া। কখনও ভুল বই পড়ব, কখনও অচেনা লেখক আবিষ্কার করব, কখনও এমন কোনও বই হাতে তুলে নেব যার কথা আগে কোথাও শুনিনি— এই স্বাধীন অনুসন্ধানই একজন পাঠককে প্রকৃত পাঠক করে তোলে।
অ্যালগরিদম আমাদের সামনে বইয়ের দরজা খুলে দিতে পারে, বুকফ্লুয়েন্সার বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু কী পড়ব, কেন পড়ব এবং সেই বই আমাকে কীভাবে বদলাবে— এই সিদ্ধান্তটা শেষ পর্যন্ত পাঠকের নিজের হওয়া উচিত। কারণ সাহিত্য শুধু জনপ্রিয় হওয়ার জন্য নয়। সাহিত্য আমাদের ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং কখনও কখনও নিজের বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে শেখায়।
সাহিত্যের কাজ শুধু পাঠককে আনন্দ দেওয়া বা কিছু সময়ের জন্য ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করা নয়। ভালো সাহিত্য অনেক সময় আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। আমাদের পুরোনো বিশ্বাসকে প্রশ্ন করে, পরিচিত ধারণাগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কখনও এমন কিছু দেখায়, যা আমরা দেখতে চাই না। এই অস্বস্তির মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের চিন্তাকে আরও গভীরভাবে বুঝতে শেখে।
কিন্তু এখনকার বুকফ্লুয়েন্সার-নির্ভর বইয়ের বাজারে এই ধরনের সাহিত্য অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে। যে বই নিয়ে সহজে সুন্দর ভিডিও বানানো যায়, কয়েকটি ভালো কথা তুলে ধরা যায় কিংবা খুব দ্রুত পাঠকের ভালো লাগা তৈরি করা যায়— সেই বই বেশি প্রচার পায়। অন্যদিকে যে বই পড়তে সময় লাগে, ভাবতে হয় বা মনকে নাড়া দেয়, তাকে অনেক সময় কঠিন, ভারী বা বিরক্তিকর বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে সাহিত্যের গভীরতা অনেক সময় সামাজিক মাধ্যমের সহজ আনন্দের আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
কিন্তু সাহিত্যের আসল সাফল্য সবসময় লাইক, শেয়ার বা ভিউয়ের সংখ্যায় বোঝা যায় না। অনেক ভালো বই নিঃশব্দে পাঠকের মনে জায়গা করে নেয়। সেই পাঠক বই পড়ে সঙ্গে সঙ্গে ছবি পোস্ট করেন না, পাঁচটি তারকা দেন না, কোনও রিভিউও লিখতে পারেন না। তিনি চুপচাপ বইটি পড়েন এবং তার কথাগুলো নিজের মধ্যে রেখে দেন। হয়তো বইয়ের একটি বাক্য, একটি চরিত্র কিংবা একটি ঘটনা বহু বছর পরও তাঁর মনে থেকে যায়। জীবনের কোনও এক মুহূর্তে সেই কথাটিই তাকে নতুন করে কিছু বুঝতে সাহায্য করে। তখন বোঝা যায়, বইটি আসলে তার ভেতরে কাজ করছিল।
এই প্রভাব কোনও লাইক, শেয়ার বা ভিউ দিয়ে মাপা যায় না। অ্যালগরিদম জানে কতজন মানুষ একটি বইয়ের ভিডিও দেখেছে; কিন্তু সে জানে না, সেই বইটি কতজন মানুষের চিন্তা বদলে দিয়েছে। সত্যিকারের সাহিত্য তাই সবসময় শব্দ করে নিজের সাফল্য ঘোষণা করে না। কখনও কখনও সে নিঃশব্দে মানুষের ভিতরে ঢুকে যায়— আর অনেক বছর পর তার প্রভাব দেখা যায়।