• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 7 November, 2026

দিল্লির বিষবায়ু প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক স্থায়ী উদাহরণ

দিল্লির দূষণ শুধু দিল্লির সমস্যা নয়। পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ধোঁয়া রাজধানীর বাতাসকে আরও বিষাক্ত করে তোলে। তাই কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কৃষকদের শুধু জরিমানা করলে সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁদের বিকল্প ব্যবস্থা, যন্ত্রপাতি এবং আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে কলকারখানা, নির্মাণ সংস্থা ও পরিবহণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

দিল্লির বিষবায়ু প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক স্থায়ী উদাহরণ

File Photo

দিল্লিতে শীতের আগমন মানেই এক নতুন আতঙ্কের শুরু। সেই আতঙ্কের নাম বায়ুদূষণ। প্রতি বছর শীতের আগে থেকেই রাজধানীর আকাশে দূষণের মাত্রা বাড়তে থাকে। বাতাস হয়ে ওঠে বিষাক্ত, বাড়ে শ্বাসকষ্ট ও নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার নানা জরুরি ব্যবস্থা ঘোষণা করে। কখনও গাড়ি চলাচলে বিধিনিষেধ, কখনও নির্মাণকাজ বন্ধ, কখনও স্কুল-অফিসের সময় পরিবর্তন, আবার কখনও অতিরিক্ত মেট্রো পরিষেবার ব্যবস্থা। কিন্তু কয়েক দিন পর পরিস্থিতি আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। বছরের পর বছর এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে, দিল্লির দূষণ এখন আর আকস্মিক কোনও বিপর্যয় নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক স্থায়ী উদাহরণ।

দিল্লির বায়ুদূষণের জন্য একাধিক কারণ দায়ী। গাড়ির ধোঁয়া, কলকারখানার দূষণ, নির্মাণকাজের ধুলো, আবর্জনা পোড়ানো এবং কৃষিজমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো— সব মিলিয়েই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। শীতকালে তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং বাতাসের গতি কম থাকার কারণে দূষিত পদার্থ সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। ফলে বাতাসে বিষাক্ত কণার পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু আবহাওয়াকে দোষ দিয়ে প্রশাসন নিজের দায় এড়াতে পারে না। দূষণের কারণগুলি বহুদিন ধরেই জানা। তা হলে এত বছরেও স্থায়ী সমাধান সম্ভব হচ্ছে না কেন?

অক্টোবর মাসে বৃষ্টি ও জোরালো বাতাসের কারণে দূষণের মাত্রা কিছুটা কমেছিল। কিন্তু আবহাওয়ার পরিবর্তন হতেই দূষণ আবার বেড়ে যায়। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট, প্রকৃতি সাময়িকভাবে দিল্লির বাতাস পরিষ্কার করতে পারে, কিন্তু দূষণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের। অনুকূল আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা কোনও পরিবেশনীতি হতে পারে না।

দূষণ মোকাবিলায় গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান বা গ্র্যাপের অধীনে বিভিন্ন বিধিনিষেধ জারি করা হয়। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো, নির্মাণকাজে নিষেধাজ্ঞা, অতিরিক্ত গণপরিবহণ চালু করা— এসব ব্যবস্থা পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এগুলি স্থায়ী সমাধান নয়। দূষণ যখন বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন ব্যবস্থা নেওয়ার অর্থ হল বিপদ ঘটার পর ক্ষতি সামলানোর চেষ্টা করা। অথচ প্রয়োজন ছিল বিপদ তৈরি হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা। এ বিষয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টও৷

দীপাবলির বাজি পোড়ানো নিয়েও প্রতি বছর বিতর্ক তৈরি হয়। পরিবেশের ক্ষতি কমাতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দিষ্ট শর্তে অনুমোদিত সবুজ বাজি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু সেই নিয়মের আড়ালে সাধারণ বাজি বিক্রি ও ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। প্রশ্ন হলো, আদালত নির্দেশ দিলেও যদি প্রশাসন তা কার্যকর করতে না পারে, তা হলে সেই নির্দেশের গুরুত্ব কোথায়? ধর্মীয় উৎসব পালনের অধিকার অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু সেই অধিকারের কারণে অন্য মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য বিপন্ন করা যায় না।

দিল্লির দূষণ শুধু দিল্লির সমস্যা নয়। পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ধোঁয়া রাজধানীর বাতাসকে আরও বিষাক্ত করে তোলে। তাই কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কৃষকদের শুধু জরিমানা করলে সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁদের বিকল্প ব্যবস্থা, যন্ত্রপাতি এবং আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে কলকারখানা, নির্মাণ সংস্থা ও পরিবহণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ কোনও রাজনৈতিক দলের কৃতিত্ব বা ব্যর্থতার হিসাব নয়। এটি মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব তাঁদের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা করা। অথচ দিল্লির মানুষকে প্রতি বছর বিষাক্ত বাতাসের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে। বর্তমান সরকারও তার পূর্বসূরিদের মতো এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি। শুধু আশ্বাস, সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আর দোষারোপের রাজনীতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। নির্মল বাতাস কোনও বিলাসিতা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার।