• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 7 November, 2026

নতুন ভারতের ভোট বাক্স : রাজনীতি এবং শাসকদলের অস্বস্তির কারণ

তবে কেবল ইতিবাচক দিকই নয়, এই প্রজন্মের কিছু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সমাজমাধ্যমে রাজনৈতিক সচেতনতা প্রবলভাবে দেখালেও ভোটের দিন বুথে গিয়ে ভোট দেওয়ার হার এই তরুণদের একাংশের মধ্যে এখনও শতভাগে পৌঁছয়নি। তবুও, এদের সিদ্ধান্তহীনতা এবং শেষ মুহূর্তের গতিশীল ভোটদানের প্রবণতা যে কোনও শাসকদলের সব অঙ্ক উলটে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

নতুন ভারতের ভোট বাক্স : রাজনীতি এবং শাসকদলের অস্বস্তির কারণ

File Photo

আবহমান ভারতীয় রাজনীতিতে স্থানিক মেরুকরণ, ধর্মীয় মেরুকরণের তাস কিংবা বংশানুক্রমিক পারিবারিক আনুগত্য দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনী সাফল্যের শেষ কথা বলেই এসেছে। কিন্তু ভারতীয় গণতন্ত্রের জনসংখ্যাগত সমীকরণে এক অভূতপূর্ব ও আমূল পরিবর্তন সূচিত হতে চলেছে। পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনে মূল অনুঘটক হিসেবে অবতীর্ণ হতে পারে দুটি অত্যন্ত গতিশীল প্রজন্ম— ‘জেন-জি’ (১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী) এবং ‘জেন-আলফা’ (২০১০ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে জন্মগ্রহণকারী)। এই নতুন ডিজিটাল বাসিন্দাদের যৌথ ব্যালট শক্তি আগামী দিনে দিল্লির মসনদ কার দখলে থাকবে, তা নির্ধারণের চাবিকাঠিও হতে পারে।

জনসংখ্যার পরিসংখ্যান এবং নির্বাচন কমিশনের সংগৃহীত উপাত্ত বলছে, ভারত বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে কনিষ্ঠ জনমিতির দেশ। বিগত লোকসভা নির্বাচনেই ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা ছিল ২০ কোটিরও বেশি। আগামী লোকসভা নির্বাচনে যখন ভোটগ্রহণ হবে, তত দিনে জেন-জি প্রজন্মের শত শতাংশ এবং জেন-আলফার প্রথমাংশ (যাঁরা ২০১০-এর দশকেই জন্মেছেন) দেশের নতুন ভোটার তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়ে যাবেন। ভারতে এই জেন-জি ও জেন-আলফার সম্ভাব্য মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩৩ থেকে ৩৫ কোটিতে, যা দেশের মোট ভোটাধিকারপ্রাপ্ত জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের থেকেও অনেকটাই বেশি। এই বিশাল এবং অপ্রতিরোধ্য তরুণ জনসংখ্যাই দিল্লির শাসনক্ষমতার কৌশলগত হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন এই জেন-জি ও জেন-আলফা ভোটারদের নিয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শিবিরের অন্দরে এত উদ্বেগ এবং অস্বস্তি কাজ করছে?

প্রথম কারণটি হল, তথ্য সংগ্রহ এবং তা প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে এই প্রজন্মের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। এই দুটি প্রজন্মই মূলত ‘ডিজিটাল নেটিভ’। পূর্ববর্তী প্রজন্ম যেখানে মূলধারার সংবাদমাধ্যম, রাজপথের রাজনৈতিক সভা কিংবা নির্দিষ্ট কোনও দলীয় ইস্তেহার থেকে তথ্য সংগ্রহ করত, এই তরুণেরা তথ্যের জন্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সমাজমাধ্যম, নির্দলীয় ইউটিউব কনটেন্ট এবং স্বাধীন তথ্য যাচাইয়ের প্ল্যাটফর্মগুলির উপর। ফলে প্রচারমাধ্যম বা দলীয় আইটি সেলের নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক বয়ান দিয়ে এদের সহজে প্রভাবিত করা যাচ্ছে না। চিরাচরিত ‘একতরফা প্রচার’-এর বদলে এরা শাসকদলের কাছে কঠিন নীতিগত উত্তর এবং জবাবদিহি চায়।

দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল কারণটি হল এই প্রজন্মের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার। গতানুগতিক ধর্মীয় আবেগ, মেরুকরণ কিংবা অতীতের কৃতিত্বের ফানুস উড়িয়ে তরুণদের মন জয় করা আজকের দিনে অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক সমীক্ষা এবং সাম্প্রতিক প্রবণতা বলছে, জেন-জি ও জেন-আলফার মূল উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে চরম বেকারত্ব, পাবলিক সার্ভিস কমিশন বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তন, গুণগত শিক্ষা এবং তথ্য সুরক্ষা। বহু ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ কষ্ট করে শিক্ষা অর্জনের পরেও উপযুক্ত কাজের সুযোগ না থাকা এই প্রজন্মকে শাসকদলের নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ এবং সোচ্চার করে তুলেছে।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলেই এই তরুণ ক্ষোভের একটি বাস্তব, রাজ্যভিত্তিক এবং তথ্যসমৃদ্ধ চিত্র অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে—

১. উত্তরপ্রদেশ ও হিন্দি বলয়:
ভারতের সবচেয়ে বেশি লোকসভা আসনবিশিষ্ট রাজ্য উত্তরপ্রদেশে ঐতিহাসিকভাবে জয়ের প্রধান ভিত্তি ছিল ধর্মীয় মেরুকরণ ও জাতপাতের সমীকরণ। কিন্তু উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের লক্ষ লক্ষ জেন-জি পরীক্ষার্থী যখন প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ দুর্নীতি বা অগ্নিবীর প্রকল্পের মতো অনিয়মিত চাকরির ইস্যুতে রাস্তায় নেমেছেন, তখন শাসনকালের পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ থমকে গিয়েছে। যুব সমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের ফলেই বিগত লোকসভা নির্বাচনে ওই হিন্দি বলয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলকে বড় ধাক্কা খেতে হয়েছে।

২. পশ্চিমবঙ্গ:
পশ্চিমবঙ্গের তরুণ ভোটারদের মনোভাবও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনমুখী। এ রাজ্যে কেবল রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক অনিয়ম বা নিয়োগ দুর্নীতি নয়, জাতীয় স্তরের কর্মসংস্থানের অভাব এবং ডিজিটাল তথ্য সুরক্ষার সংকট নিয়েও জেন-জি সরব।
আর জি কর কাণ্ড থেকে শুরু করে সরকারি চাকরির দাবিতে রাজপথে নেমে আসা— পশ্চিমবঙ্গের তরুণ প্রজন্ম কোনও ঐতিহ্যবাহী দলীয় পতাকার তোয়াক্কা না করে স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে সরকারকে বেশ কোণঠাসা করার ক্ষমতা দেখিয়েছে।

৩. দক্ষিণ ভারত (তামিলনাড়ু ও কর্ণাটক):
ভারতের দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে জেন-জি ও জেন-আলফার প্রধান অগ্রাধিকার হল আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান এবং কেন্দ্র-রাজ্য অর্থনৈতিক সাম্য। সরকারের চাপিয়ে দেওয়া একক ভাষা বা সংস্কৃতির নীতিকে এই অঞ্চলের তরুণ ভোটারেরা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের উপর সরাসরি আক্রমণ হিসেবে দেখেন, যা শাসক শিবিরকে গভীর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

৪. মহারাষ্ট্র:
মহারাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ভাঙাগড়া ও মতাদর্শগত অস্থিতিশীলতায় জেন-জি ও জেন-আলফা তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করেছে। সেখানকার তরুণদের প্রধান মূল্যায়নের মানদণ্ড হয়ে উঠেছে পুণে বা মুম্বাইয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদন শিল্পে নতুন কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় যুব সমাজের ভবিষ্যৎ।

তৃতীয়ত, এই নতুন প্রজন্ম রাজনৈতিক দলীয় আনুগত্যের দিক থেকে চরম ‘নমনীয়’ বা ফ্লুইড। তারা কোনও একটি রাজনৈতিক পতাকার নিচে আজীবন চোখ বন্ধ করে বসে থাকার পুরনো প্রথা ভাঙছে। যে দল গতকাল পর্যন্ত এদের প্রিয় ছিল, নীতিগত বিচ্যুতির কারণে আজই তারা সেই দলের বিরুদ্ধে ​নির্বাচনে রায় দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে না। ‘হ্যাশট্যাগ মুভমেন্ট’ বা অনলাইন নাগরিক নজরদারির ক্ষমতার কারণে শাসকদলের নীতিগত ভুলভ্রান্তি এদের নজর এড়াচ্ছে না।

তবে কেবল ইতিবাচক দিকই নয়, এই প্রজন্মের কিছু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সমাজমাধ্যমে রাজনৈতিক সচেতনতা প্রবলভাবে দেখালেও ভোটের দিন বুথে গিয়ে ভোট দেওয়ার হার এই তরুণদের একাংশের মধ্যে এখনও শতভাগে পৌঁছয়নি। তবুও, এদের সিদ্ধান্তহীনতা এবং শেষ মুহূর্তের গতিশীল ভোটদানের প্রবণতা যে কোনও শাসকদলের সব অঙ্ক উলটে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

পরিশেষে বলা যায়, পরবর্তী লোকসভা নির্বাচন কোনও সাধারণ ক্ষমতা ধরে রাখা বা দখলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি হতে চলেছে পুরনো অনুগত রাজনীতি ও নতুন যুগের ডিজিটাল আকাঙ্ক্ষার এক তুমুল সংঘাত। ধর্ম, জাতি বা অতীতের স্মৃতি বেচে আর এই তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা যাবে না। যে রাজনৈতিক দল কেবল স্লোগান না দিয়ে জীবিকা, আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কাজের বাস্তব নিশ্চয়তা দিতে পারবে, রাজদণ্ড থাকবে অবধারিতভাবে তাদেরই হাতে। আর ঠিক এই জায়গাতেই লুকিয়ে রয়েছে বর্তমান শাসকের সবচেয়ে বড় এবং গভীর আশঙ্কা।